বরিশালে নির্মাণাধীন নভোথিয়েটারের কাজ দুই দফা সময় বাড়ানোর পরও সঠিক সময়ে শেষ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে ১২ শতাংশ ব্যয় বেড়ে পুরো প্রকল্পটির খরচ দাঁড়িয়েছে ৪৬০ কোটি টাকা। সর্বশেষ নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। সংশ্লিষ্টরা এখন পর্যন্ত ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্নের দাবি করেছেন। তবে গণপূর্তের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত কেবল অবকাঠামোগত ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তারা বলেছেন, অবকাঠামোগত কাজ অনেকাংশে শেষ হলেও নভোথিয়েটারের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন ডিভাইস স্থাপনসহ অনেক কাজ এখনো বাকি রয়েছে। এসব যন্ত্র দেশের বাইরে থেকে আমদানি করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে সময়মতো আমদানি নিয়ে আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্পটি সম্পন্ন করতে আরও দেড় থেকে দুই বছরের বেশি সময় লাগতে পারে। যদিও গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর দাবি, নদী তীরবর্তী জায়গা হওয়ায় সাইট তৈরি করতে দুই বছর সময় লেগেছে। বাকি কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০২০ সালে তৎকালীন সরকার বরিশালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নভোথিয়েটার নামে প্রকল্পটি হাতে নেয়। কাজ বাস্তবায়নের জন্য জায়গা নির্ধারণ করা হয় সদর উপজেলার দক্ষিণ চরআইচা মৌজার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীর তীরের ১০ একর জমি। কন্ট্রা ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড ও ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড নামে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২০২৩ সালের মধ্যে কাজ শেষ করার চুক্তি হয়। প্রথমে ৪১২ কোটি টাকা ব্যয় ধরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে বরিশাল বিভাগীয় গণপূর্ত অধিদপ্তর অবকাঠামোর নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন শুরু করে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে বরিশাল নভোথিয়েটার রাখা হয়।
সূত্র আরও জানায়, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রথম দফায় সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এর পরও কাজ সম্পন্ন না হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করা হয়। দুই দফায় সময় বৃদ্ধির সঙ্গে প্রায় ৪৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে। বর্তমানে এর ব্যয় নির্ধারিত হয়েছে ৪৬০ কোটি টাকা।
প্রকল্পের নকশা অনুযায়ী, নভোথিয়েটারে থাকবে প্ল্যানেটরিয়াম, অফিস ভবন, প্লাজা, ডরমেটরি, দুটি ডোমসহ মোট ২৬টি অবকাঠামো। এতে ১৭৫টি গাড়ির পার্কিং, ৩০৪ আসনের গ্যালারি ও ১৭৫ আসনের অডিটোরিয়াম থাকবে। শিশুদের জন্য থাকবে ছয়টি শিশুপার্ক, ছয়টি ভাস্কর্য এবং আধুনিক শিশু রাইড।
বরিশাল গণপূর্ত দপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী ইব্রাহীম হোসাইন বলেন, ‘ডোম ও টেলিস্কোপের মাধ্যমে মহাকাশ গবেষণা করা যাবে। শিশুদের জন্য রয়েছে প্লেয়িং ফিল্ড, রঙিন ফোয়ারা ও ভাস্কর্য। এটি মেধা চর্চা ও বিনোদনের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করবে।’
গণপূর্ত বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম বলেন, ‘প্রকল্পের ৮০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আশা করছি ডিসেম্বর নাগাদ সব কাজ সমাপ্ত হবে। কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী হওয়ায় সাইট প্রস্তুত করতে দুই বছর লেগেছে। এখন ভেতরের কাজ শেষ এবং বাইরের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পের ব্যয় প্রথমে ধরা হয়েছিল ৪১২ কোটি টাকা, পরে ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল সরঞ্জামের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬০ কোটি টাকা। নভোথিয়েটারটি চালু হলে দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে এবং শিশুদের মেধা চর্চার নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক খোরশেদ আলম বলেন, ‘নভোথিয়েটার দক্ষিণাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য মহাকাশ গবেষণার নতুন দ্বার খুলবে। ডিজিটাল প্রদর্শনী ও আধুনিক যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তারা জ্ঞান সম্প্রসারণের সুযোগ পাবে। ৫-ডি এডুটেইনমেন্ট সিমুলেটর, ডিজিটাল এক্সিবিশন গ্যালারি ও ৫-ডি মুভি থিয়েটারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা সরাসরি আধুনিক প্রযুক্তির সংস্পর্শে আসবে।’
খেলাঘর বরিশাল জেলা কমিটির সভাপতি ও সাবেক জেলা শিশুবিষয়ক কর্মকর্তা পঙ্কজ রায় চৌধুরী বলেন, ‘বিশেষজ্ঞরা আশা করছেন নভোথিয়েটার কেবল শিক্ষার্থীদের নয়, গোটা দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে শিক্ষা, বিনোদন ও গবেষণার নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্তের সূচনা করবে এবং শিশু-কিশোরদের মধ্যে অনুসন্ধিৎসা ও বিজ্ঞানচর্চার আগ্রহ বাড়াবে।’