অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বলেছেন, ‘আগামীতে এনবিআরভুক্ত রাজস্ব আদায়ের সব সেক্টর শতভাগ ডিজিটালাইজ করা হবে। নিজের দপ্তরে বসেই সরকারি সব ধরনের রাজস্ব জমা দেওয়া যাবে। এতে অনিয়ম, ব্যবসায়ীদের হয়রানি ও দুর্নীতি কমবে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম চেম্বারের আয়োজনে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রাক বাজেট মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আবদুর রহমান খান বলেন, ‘দেশে ব্যবসাবন্ধব পরিবেশ সৃষ্টির জন্য কাজ করে যাচ্ছে এনবিআর। বন্ধ কলকারখানাগুলো চালুর ব্যাপারেও সরকার উদ্যোগ নিচ্ছে। কাস্টম হাউস, কর, ভ্যাটে ব্যবসায়ীরা যাতে হয়রানির স্বীকার না হন, সে জন্য ব্যবসায়ীদেরও সচেতন হতে হবে। কোনো কর্মকর্তা হয়রানি করলে তার বিরুদ্ধে আপনারা ব্যবস্থা নিতে পারেন। ওই কর্মকর্তা কীভাবে সরকারি চাকরি করে বেতন ভাতা খান সেই প্রশ্ন তুলতে পারেন ব্যবসায়ীরা।’
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এ আলোচনা সভায় ব্যবসায়ীরা করনীতি সহজীকরণ, ভ্যাট ব্যবস্থার সংস্কার এবং শিল্পবান্ধব নীতি প্রণয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। চেম্বারের প্রশাসক মো. মোতাহার হোসেনের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় চট্টগ্রাম ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কথা তুলে ধরেন।
চেম্বারের প্রশাসক মো. মোতাহার হোসেন বলেন, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখতে হলে ব্যবসা-বাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নির্ধারণ, করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানোর আহ্বান জানান। এ বছর চিটাগং চেম্বারের সদস্য প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে আয়কর বিষয়ক ৩৩টি, ভ্যাটবিষয়ক ৩৬টি ও শুল্ক বিষয়ক ৬৭টি প্রস্তাবনা পেশ করেন।
প্রশাসক আরও বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় যেমন বাড়াতে হবে তেমনি যারা রাজস্ব জোগান দেন অর্থাৎ শিল্পপতি, ব্যবসায়ী ও করদাতাদের বিষয়টিও মাথায় রেখে নিয়মনীতি মেনে যারা নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করছেন তাদের ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে করের পরিসর বৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ব্যবসায়ীরা বলেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে টিকিয়ে রাখতে বিশেষ প্রণোদনা ও কর রেয়াত প্রয়োজন। একই সঙ্গে ডিজিটাল কর ব্যবস্থার বাস্তবায়নে বিদ্যমান জটিলতা দূর করার ওপর জোর দেন তারা। এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, কাস্টমস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা বৃদ্ধির দাবি জানান ব্যবসায়ী নেতারা। ব্যবসায়ীদের কিছু প্রস্তাবনা লিখিত আকারে এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান ব্যবসায়ীদের প্রস্তাবগুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে বলেন, একটি ব্যবসাবান্ধব, স্বচ্ছ ও আধুনিক কর ব্যবস্থা গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য। আসন্ন বাজেটে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন উৎসাহিত করার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হবে।
ব্যবসায়ীদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারের সভাপতি খলিলুর রহমান, উইমেন চেম্বারের সভাপতি মিজ আবিদা মোস্তফা, এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ফরিদুল আলম, চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক আমিরুল হক, বিজিএমইএ সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাছির উদ্দিন, জিপিএস ইস্পাতের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমাস শিমুল, মহি উদ্দিন চৌধুরী প্রমুখ। এতে আরও উপস্থিত ছিলেন, এনবিআর সদস্য (আয়কর নীতি) ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, সদস্য (কাস্টমস নীতি ও আইসিটি) মুহাম্মদ মুবিনুল কবীর ও সদস্য (মূসক নীতি) মো. আজিজুর রহমান প্রমুখ।
চিটাগাং চেম্বারের সাবেক সভাপতি আমির হুমায়ুন মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যেকোনো পণ্য আমদানিকালে ভ্যাট কেটে রাখা হয়। পরে পণ্য তৈরি করে বিক্রির সময় ওই ভ্যাট ফেরত দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু পণ্য বিক্রির পরও ফেরতযোগ্য ভ্যাট আর পাওয়া যায় না। ভ্যাট ফেরত পেতে অনেক খড়কুটা পোড়াতে করতে হয়। এই হয়রানি বন্ধ করা হোক।
বিজিএমইএ সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাছির উদ্দিন বলেন, রপ্তানির ক্ষেত্রে সরকার ইনসেনটিভ দেয়। সেই টাকা পেতে ওই ইনসেনটিভের অর্ধেক টাকা স্পিরিট মানি হিসেবেও চলে যায়। নানা তদন্ত করে এরপর দেওয়া হয় টাকা। এ ক্ষেত্রে রপ্তানি ডকুমেন্ট দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক এক ক্লিকেই টাকা আমদানিকারককে দিয়ে দিতে পারে। এ রকম সহজ পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে এনবিআরকে।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক পরিচালক আমিরুল হক বলেন, ‘আমি একটি পণ্যের কাঁচামাল আমদানি করলাম ৪০ টাকা কেজি হিসেবে। কিন্তু কাস্টমস ওই চালানকে ৬০ টাকা কেজি হিসেবে এসেসমেন্ট করল। ওই টাকা হিসেবে আমাকে শুল্ককর আদায় করতে হয়েছে। এতে পণ্যেটি তৈরি করে আবার বাজারে বিক্রিকালে দাম বেড়ে যায়। এ বিষয়গুলো চাইলে এনবিআর সহজ করতে পারে।’
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি ফরিদুল আলম বলেন, ‘আগে আমার ব্যবসা ছিল। এখন সব হারিয়েছি। কিন্তু আমার পরিবারের চলাচলের জন্য একটি গাড়ি রয়েছে। সেই গাড়িতে আয়কর দিতে হয় অনেক টাকা। আমি তো এখন শূন্য। আমার আয় বলতে কিছুই নেই। কিন্তু পরিবারের চলাফেরার জন্য একটি গাড়ির তো প্রয়োজন রয়েছে।’ বছর শেষে গাড়ির জন্য এত টাকা কেন পরিশোধ করতে হবে জানতে চান তিনি।