গত কয়েক মাস ধরে শান্তিপূর্ণভাবে ঘোরাফেরা করছিল বেওয়ারিশ চারটি ঘোড়া। রাস্তার ধারের ঘাস লতাপাতা আর মানুষের ফেলে দেয়া ফল-সবজির উচ্ছিষ্ট খেয়েই কাটছিল ওগুলোর জীবন। তবে তিন দিন আগে দুটি ঘোড়ার শরীরে গভীর ক্ষত দেখতে পান স্থানীয়রা। আক্রোশের বসে কেউ হয়তো তাদের শরীরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করেছে। বিষয়টি নজরে এলে এক যুবক এগিয়ে এসে প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তবে তাদের থেকে যথাযথ চিকিৎসা না পেয়ে ফেসবুকে পোস্ট দেন। ওই পোস্ট দেখে ঘোড়া দুটির চিকিৎসায় এগিয়ে আসেন এক বেসরকারি ভেটেনারী চিকিৎসক। ওই চিকিৎসক আর যুবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সু-চিকিৎসা পেয়ে এখন কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠছে ঘোড়াগুলো। অবলা প্রাণির সঙ্গে মানুষের এমন অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ পশুপ্রেমীরা। অভিযুক্তদের খুঁজে বের করে বিচারের দাবি তাদের।
স্থানীয় সূত্র জানায়, শরীয়তপুর সদর উপজেলার আংগারিয়া বাইপাস এলাকায় কয়েক মাস আগে চারটি ঘোড়া দেখতে পান স্থানীয়রা। ঘোড়াগুলোর মধ্যে একটি পুরুষ, একটি মাদি আর বাকি দুটি বাচ্চা। ঘোড়াগুলোর বিচরণ ছিল রাস্তার পাশে। ওই এলাকার পথে প্রান্তরে ঘুরে ঘুরে খাবার সন্ধান করতো। রাতে ওই এলাকার খোলা জায়গায় ঘুমিয়ে থাকতো। সম্প্রতি অজানা ব্যক্তিদের আক্রোশের শিকার হয় ঘোড়া দুটি। শরীরে গভীর ক্ষত নিয়েই ঘোড়াগুলো ঘুরে বেড়াতে থাকে।
বিষয়টি স্থানীয়দের মাধ্যমে গত শনিবার নজরে আসে ইমরান আল নাজির নামের এক যুবকের। সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে ঘোড়াগুলোর অবস্থা দেখে যোগাযোগ করেন জেলার প্রাণি সম্পদ বিভাগের সঙ্গে। একাধিকবার যোগাযোগ ও চেষ্টার পর সেদিন দুপুরে এক চিকিৎসক এসে শুধু নামমাত্র চিকিৎসা দিয়ে চলে যান। তবে ঘোড়াগুলোর ক্ষত ছিল গভীর। এমন অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে তিনি ঘোড়াগুলোর ক্ষতস্থানের ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপলোড করেন।
সেখান থেকে বিষয়টি নজরে আসে ডামুড্যা উপজেলার বেসরকারি ভেটেনারী চিকিৎসক সবুজ খানের। তিনি নিজ উদ্যোগে ঘোড়া দুটির চিকিৎসা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে রবিবার বিকেলে শুরু হয় চিকিৎসা। ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দেয়া হয় সেলাই ও ওষুধ। সু-চিকিৎসা পেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হতে শুরু করে ঘোড়াগুলো।
ঘোড়া দুটির চিকিৎসায় এগিয়ে আসা তরুণ ইমরান আল নাজির বলেন, ‘আমি স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পারি— এলাকায় যেই বেওয়ারিশ ঘোড়াগুলো ঘুরে বেড়াচ্ছিল সেগুলোর শরীরে আঘাতের চিহ্ন আছে। ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরছে। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করি। তারা এক সময় এসে নামমাত্র ভায়োডিন লাগিয়ে চলে যান। ক্ষতগুলো যেহেতু গভীর ছিল তাই আমার কাছে মনে হয় ঘোড়াগুলোর উন্নত চিকিৎসা দরকার। পরে ফেসবুকে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট করি।’
এদিকে অবলা প্রাণির সঙ্গে এমন অমানবিক আচরণে ক্ষুব্ধ সুশীল সমাজ ও পশুপ্রেমীরা। সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) শরীয়তপুরের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘অবলা প্রাণিগুলো কারো কোনো ক্ষতি না করেই বিচরণ করছিল। কিন্তু খারাপ মানুষ ঘোড়াগুলোকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। বিষয়টি সত্যিই অমানবিক। আমরা চাই যারা এ ধরণের কাজ করেছে তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা হোক। পাশাপাশি ঘোড়াগুলোর পুনর্বাসন করতে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে যেন ব্যবস্থা নেয়া হয়।’
যদিও এখন চিকিৎসার ভার গ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘আমাদের চিকিৎসক গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এসেছেন। প্রয়োজনে আবার গিয়ে চিকিৎসা দিয়ে আসবেন। তাছাড়া ঘটনার দিন ছিল শনিবার। ছুটির দিন থাকায় হয়তো আমরা যথাযথ চিকিৎসা দিতে পারিনি। আর ঘোড়াটি যেভাবে আহত হয়েছে তার চিকিৎসার জন্য লোকবলের প্রয়োজন ছিল। তবে আমরা এখন চিকিৎসার ব্যবস্থা নেব।’
বিষয়টি নিয়ে পালং মডেল থানার ওসি শাহ আলম বলেন, ‘গবাদিপশুর সঙ্গে নিষ্ঠুরতা সংক্রান্ত আইন রয়েছে। অভিযোগ পেলে এ ব্যাপারে আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিধান মজুমদার/এআই/