বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বিসিসি) নগর ভবন এখন নীরব ‘মৃত্যুকূপে’ পরিণত হয়েছে। এক যুগেরও বেশি আগে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করা এই ভবনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সিটি করপোরেশনের দেড় হাজারের বেশি কর্মকর্তা-কর্মচারী দাপ্তরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিনই এখানে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা ঘটছে, যা ভবনের ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে তুলছে।
সর্বশেষ মঙ্গলবার (৫ মে) একটি কক্ষের ছাদের অংশ খসে পড়ায় নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিসিসির প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহানও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, চার দশকের পুরোনো এই ভবনটি আশির দশকে পৌরসভার জন্য দোতলায় উন্নীত হয়। পরবর্তী সময়ে সিটি করপোরেশন ঘোষণার পর এটি নগর ভবন হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। শওকত হোসেন হিরন মেয়র থাকাকালে নকশা উপেক্ষা করে আরও এক তলা বাড়ানো হয়।
২০১১ সালে নগর ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়। কিন্তু বিকল্প অবকাঠামো না থাকায় বাধ্য হয়ে এই ভবনেই কার্যক্রম চলমান থাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় নগরীর সোহেল চত্বরে অবস্থিত এনেক্স ভবনে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরে ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হলে সেখানকার দপ্তরগুলোও নগর ভবনে স্থানান্তরিত হয়। ফলে মূল ভবনের ওপর চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
বর্তমানে অন্তত ১ হাজার ৬০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী এই ভবনে কাজ করছেন। অথচ ভবনটির ধারণক্ষমতা ছিল মাত্র ৪০০ জনের জন্য। এ ছাড়া প্রতিদিন গড়ে সাড়ে চার হাজারের বেশি সেবাগ্রহীতা এখানে আসেন।
নগর ভবন ঘুরে দেখা যায়, ভবনের বিভিন্ন অংশে ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়াল দিয়ে বৃষ্টির পানি ভেতরে প্রবেশ করছে। এসব সংকট ভবনটির কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিচ্ছবি হিসেবে ফুটে উঠেছে।
কর আদায় শাখায় কর্মরত বেলায়েত হোসেন বাবলু বলেন, ‘হাটবাজার শাখার একটি কক্ষে হঠাৎ ছাদের বেশ কিছু পলেস্তারা খসে পড়ে। এটি শুধু মঙ্গলবারই ঘটেছে–এমনটি নয়, প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন কক্ষে হঠাৎ করে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে তাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। সৌভাগ্যক্রমে কেউ হতাহত না হলেও বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
নগর ভবনে সেবা নিতে আসা টিপু আকন বলেন, ‘ভবনের ভেতরে ঢুকলেই মনে হয় যেকোনো সময় কিছু একটা ঘটতে পারে।’ একই তথ্য দেন রফিকুল ইসলাম শাহিন নামে এক ঠিকাদার। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয়তলায় উঠলেই আমরা দুশ্চিন্তায় পড়ে যাই। কাজের প্রয়োজনে এখানে আসতে হয়, কিন্তু ভবনের ফাটল দেখে সব সময় ভয়ে থাকতে হয়। এটি দ্রুত সংস্কার বা পরিবর্তন করা জরুরি।’
বিসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘ভবনের প্রধান কলাম ও বিমে ফাটল দেখা দিয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। নকশাসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নথিও খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা ভবনের ঝুঁকি নিরূপণকে আরও জটিল করে তুলেছে।’
তিনি জানান, নগর ভবনের অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার পাশাপাশি প্রশাসনিক চাপও এখন বহুগুণ বেড়েছে। একসময় যেখানে ৩৫টি কক্ষ ছিল, সেখানে এখন আছে ৭০টি। কিন্তু জায়গা না বাড়িয়েই কার্যক্রম বিস্তৃত করায় কর্মপরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
বরিশাল সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা আহসান উদ্দিন রোমেল বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নতুন ভবনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হলেও কার্যকর কোনো সমাধান আসেনি। সাবেক মেয়রদের সময় কিছু বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা টেকসই হয়নি। ফলে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। পুরোনো ভবনের ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়।’
বিসিসির প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, ‘বলা যায়, আমার জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এসে পৌঁছেছি। তাই নগর ভবনের কয়েকটি শাখা সদর রোডে নির্মাণাধীন সুপার মার্কেটে স্থানান্তরের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রয়োজনে হাসপাতাল সড়কে সিটি করপোরেশনের আরেকটি ভবনেও কিছু কার্যক্রম সরিয়ে নেওয়ার কথা ভাবা হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘১৫ তলাবিশিষ্ট নগর ভবন নির্মাণের জন্য একটি প্রকল্প স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এটির বাস্তবায়নে চেষ্টা চলছে। নতুন ভবন নির্মাণের প্রস্তাব দ্রুত অনুমোদন পেলে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান হবে।’