বরেন্দ্র অঞ্চলের মাটি ফেটে চৌচির, পুকুরে পানি নেই, খালে স্রোত নেই, গভীর নলকূপে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মোটর চালিয়েও উঠছে না পর্যাপ্ত পানি। কোথাও ১০০ ফুট, কোথাও ২০০ ফুট নিচেও মিলছে না পানির স্তর। একসময় দেশের শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত উত্তরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ এখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে ভয়াবহ মরুকরণের দিকে।
রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর ও জয়পুরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় পানি সংকট এখন আর মৌসুমি সমস্যা নয়—এটি রূপ নিয়েছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ ও মানবিক সংকটে। জলবায়ু পরিবর্তন, কমে যাওয়া বৃষ্টিপাত, ফারাক্কা বাঁধের প্রভাব এবং অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এ অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি ও জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।
সংকটাপন্ন ঘোষণা, তবু থামছে না পানি উত্তোলন
সরকার গত বছরের ৬ নভেম্বর গেজেট প্রকাশ করে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৫ জেলার ২৫টি উপজেলার ২১৫টি ইউনিয়নের ৪ হাজার ৯১১টি মৌজাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পানিসংকট এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৫০৩টি মৌজা চিহ্নিত হয় অতি উচ্চ সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে।
গেজেট অনুযায়ী, আগামী ১০ বছর এসব এলাকায় খাবার পানি ছাড়া অন্য কোনো কাজে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ। নতুন নলকূপ স্থাপন, সেচ বা শিল্পকারখানায় ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, কিন্তু বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ মানছে না কেউ।
তানোর, গোদাগাড়ী, নাচোল কিংবা নিয়ামতপুর—প্রায় সব এলাকাতেই আবাসিক বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে অবাধে সাবমারসিবল পাম্প চালিয়ে সেচ দেওয়া হচ্ছে। প্রশাসনের নজরদারি থাকলেও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
তানোর উপজেলার নারায়ণপুর মৌজার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বাড়ির দেয়াল ভেদ করে পাইপ বের করে ধানের জমিতে পানি দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় এক কৃষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জমি পড়ে থাকলে খাব কী? বাঁচার জন্যই পানি তুলছি।
পানির স্তর নেমেছে ভয়াবহভাবে
গবেষণা ও সরকারি তথ্য বলছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে গত চার দশকে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। ১৯৮৫-৯০ সালে যেখানে পানির স্তর ছিল ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে, সেখানে বর্তমানে তা ৮০ থেকে ৯০ ফুটে পৌঁছেছে। অনেক এলাকায় ১১৩ ফুটের বেশি নিচে গিয়েও মিলছে না পর্যাপ্ত পানি। কোথাও কোথাও ২০০ ফুট নিচেও শুকিয়ে গেছে পানিধারক স্তর।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের (আইবিএস) গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সালে পানির স্তর ছিল ৩৯ ফুট নিচে। ২০১৬ সালে তা নেমে যায় ১১৮ ফুটে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বিচারে পানি উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তর বা অ্যাকুইফার ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। ফলে বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে আর পানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
কমছে বৃষ্টি, বাড়ছে তাপমাত্রা
পরিবেশবিদদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চল এখন দেশের সবচেয়ে উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা প্রায়ই ৪০ থেকে ৪৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়। গত কয়েক দশকে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে, বিপরীতে কমেছে বৃষ্টিপাত।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৬৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত বরেন্দ্র অঞ্চলে বার্ষিক বৃষ্টিপাত কমেছে ৩ দশমিক ৭৪ থেকে ৬ মিলিমিটার হারে। ২০০০ সালের পর থেকে বৃষ্টিপাত কমেছে ৩ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত।
গবেষকদের আশঙ্কা, ২০৫০ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত আরও ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এতে বর্তমান পানি সংকট ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
কৃষি উৎপাদনে বাড়ছে খরচ
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ধান চাষে সেচ খরচ বেড়ে গেছে কয়েকগুণ, অনেক জমি অনাবাদি হয়ে পড়ছে।
গোদাগাড়ী উপজেলার সুন্দরপুর মৌজায় বিএমডিএর গভীর নলকূপের অপারেটর সাত্তার আলী বললেন, ‘তিন বছর থেকে এই ডিপে (নলকূপে) পানি উঠছে, আবার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এই ডিপে আগে ৪০ থেকে ৫০ বিঘা জমিতে বোরো ধান করা হয়েছে। এখন সম্ভব হচ্ছে না। পানির স্তর দিন দিন নিচে নেমে যাচ্ছে। দু-পাঁচ বছরের মধ্যে যত ডিপ টিউবওয়েল আছে সব নষ্ট হয়ে যাবে।’
গোদাগাড়ীর সুন্দরপুর গ্রামের কৃষক সাহানারা বেগম বলেন, এক বিঘা জমিতে পানি দিতে চার ঘণ্টা লাগে। শুধু সেচের পেছনেই ৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হচ্ছে।
বিএমডিএ সূত্র জানায়, সরকারের নির্দেশনা ছিল সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ গভীর নলকূপ বসানোর। কিন্তু বর্তমানে ব্যক্তিমালিকানায় চলছে প্রায় ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ, যার সক্ষমতা আরও ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান।
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ মাত্র ২৭ শতাংশ পানি তোলে। বাকি পানি তুলছে ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প। এগুলো কার্যত নিয়ন্ত্রণের বাইরে। ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের মাধ্যমে সেচ সম্প্রসারণে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে বিএমডিএ ২২ শতাংশ ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করছে। ২০৫০ সালের মধ্যে সেটি ৫০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিকল্প সেচ ব্যবস্থা গড়ে না তুলে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়।
বিএমডিএর প্রকল্প পরিচালক নাজিরুল ইসলাম বলেন, সেচ কাজে পানি ব্যবহারে বিকল্প ব্যবস্থা না করে দেশে এভাবে কৃষিকাজ বন্ধ করা অসম্ভব। গেজেটে শুধু খাওয়ার পানি ছাড়া ১০ বছরের জন্য অন্য কোনও কাজে এই অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছে। ইতোমধ্যে বিএমডিএ সংকটাপন্ন এলাকায় গভীর নলকূপের সংখ্যা, কৃষিজমির পরিমাণ, ফসলের শ্রেণির বিষয়ে মাঠপর্যায়ের তথ্য নিয়েছি। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন।
নাঈম/