শরীয়তপুর। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা, সমাজ সংস্কারক এবং ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে জেলাটির নামকরণ করা হয়েছে। সরকারি-বেসরকারি কিংবা ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান সব খানেই শরীয়তপুর নামের বানানের ক্ষেত্রে ‘ঈ’ কার (শরীয়তপুর) ব্যবহার হয়।
তবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এর ব্যত্যয় ঘটিয়ে ‘ই’ কার (শরিয়তপুর) ব্যবহার করছে। তাও এক যুগের বেশি সময় ধরে। জেলার নামে এমন ভুল থাকা সত্ত্বেও বিষয়টি এতদিন কারও নজর আসেনি। প্রতিষ্ঠানটির এমন ভুলে ক্ষুব্ধ জেলার সচেতন মহল। দ্রুত এই ভুল সংশোধনের দাবি তাদের।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, শরীয়তপুর ঢাকা বিভাগের একটি প্রশাসনিক জেলা। ফরায়েজী আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা হাজী শরীয়ত উল্লাহর নামানুসারে ১৯৭৭ সালের ৩ নভেম্বর এ অঞ্চলের নামকরণ করা হয়। ১৯৭৯ সালে মাদারীপুরের পূর্বাংশ নিয়ে শরীয়তপুর মহকুমা গঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস হলে ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
জেলা বিআরটিএ সূত্র জানায়, ২০১২ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিআরটিএ ডিজিটাল নম্বর প্লেট (রেট্রো-রিফ্লেকটিভ নম্বর প্লেট) দেওয়া শুরু করে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেড। সেই থেকে শুরু হয়ে জেলায় এখন পর্যন্ত ডিজিটাল নম্বর প্লেটের আওতায় আনা হয়েছে ২৫ হাজার মোটরসাইকেল, ২৩টি বাস, ২১টি পিকআপ, দুটি প্রাইভেটকার, দুটি ট্রাক, ৯টি অ্যাম্বুলেন্স ও সরকারি দপ্তরের ২৪টি যানবাহন।
জেলার বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে দেখা যায়, প্রতিটি গাড়ির নাম্বার প্লেটে ‘ই’ কার ব্যবহার করা হয়েছে। এমন ভুল এর আগে চালকদের চোখে পড়েনি। হঠাৎ ভুল ধরিয়ে দেওয়ার পর তারা হতবাক।
সাইফুল ইসলাম নামে এক বাইকচালক বলেন, ‘আমি এর আগে বিষয়টি লক্ষ্য করিনি। আজ দেখলাম, আসলেই জেলার নামে ভুল ডিজিটাল নম্বর প্লেট সরবরাহ করছে বিআরটিএ। বিষয়টি নিন্দনীয় ও দুঃখজনক।’
ইমরান আল নাজির নামে এক তরুণ বলেন, ‘এটি অবশ্যই দুঃখজনক। তারা (বিআরটিও) দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি ভুল করে আসছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসকসহ সবার নজরে আসা দরকার ছিল। আমার মনে হয় তারা বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘শরীয়তপুর জেলার ডিজিটাল নম্বর প্লেটের গাড়িগুলো বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। সেখানে আমাদের জেলার নাম ভুলভাবে উপস্থাপন হচ্ছে। আমাদের সব কাগজ-দলিলে ‘ঈ’ কার ব্যবহার হচ্ছে। বিআরটিএ কেন এবং কাদের অনুমতি নিয়ে এটি করছে তা জানা জরুরি। আগামীতে যেসব প্লেট দেওয়া হবে সেগুলো যেন সঠিক বানানে দেওয়া হয়– এটাই প্রত্যাশা।’
স্থানীয় সমাজকর্মী ও আইনজীবী নুরুজ্জামান শিপন বলেন, ‘একজন সনামধন্য মানুষের নামানুসারে এই জেলার নামকরণ করা হয়েছে। তারা (বিআরটিএ) কীভাবে নিজেদের মতো করে এখানে বানান পরিবর্তন করতে পারে? এটি নিশ্চয়ই আপত্তিকর। দ্রুত বিষয়টি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টিগোচর হওয়া দরকার।’
এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করে শরীয়তপুরের ঐতিহাসিক তথ্য অনুসন্ধানবিদ শ্যামসুন্দর দেবনাথ বলেন, ‘পুরাতন বই-পুস্তক, ইতিহাস এবং বাংলা একাডেমি থেকে যেসব বই বের হয়েছে সবখানেই হাজী এবং শরীয়ত উল্লাহর নামে ‘ঈ’ কারের ব্যবহার হয়ে আসছে। ১৯৭৭ সালে যখন এই মহকুমা সৃষ্টি হয় তখন এই নাম ‘ঈ’ কার দিয়েই রাখা হয়েছে। সেই থেকে জেলার প্রত্যেক দপ্তরে ‘ঈ’ কার ব্যবহৃত হচ্ছে।
একমাত্র বিআরটিএর কর্তৃপক্ষ ‘ই’ কার ব্যবহার করছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তির নাম যদি বিকৃত অবস্থায় চলে, আমি এটার ঘোর বিরোধিতা করি এবং তীব্র নিন্দা জানাই।’
বিষয়টি নিয়ে শরীয়তপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিন) নাজমুল হাসান বলেন, ‘এটি আসলে আমার জানা ছিল না। এই জেলায় আমি সম্প্রতি যোগদান করেছি। আপনার মাধ্যমে বিষয়টি জানলাম। আমি এখনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে বিষয়টি জানাব। আশা করছি আগামীতে এটি সংশোধন করা হবে।’
এদিকে বিষয়টি নিয়ে অতি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম বলেন, ‘আমরা আগামী মিটিংয়ে বিআরটিএকে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করব, কেন তারা এ ধরনের ভুল করছে। পাশাপাশি জেলার নাম নির্ভুল করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’