পাবনা জেনারেল হাসপাতালে এক-তৃতীয়াংশের বেশি চিকিৎসক পদ শূন্য রয়েছে। নার্সসহ জনবলসংকট, শয্যাসংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব ও অকেজো যন্ত্রপাতির কারণে সেবাকার্যক্রম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় দুই হাজার রোগী এলেও অধিকাংশই কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
জানা গেছে, প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো ২৫০ শয্যার এই হাসপাতালে চিকিৎসকের মোট ৮৩টি পদের বিপরীতে ৩০টি পদ দীর্ঘদিন ধরে ফাঁকা। নার্সের ৮টি পদও শূন্য রয়েছে। এখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৬০০ রোগী ভর্তি থাকেন। এ ছাড়া বহির্বিভাগসহ বিভিন্ন সেবা নিতে প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার মানুষ হাসপাতালে আসেন।
সম্প্রতি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, রোগীদের অনেককেই শয্যা না পেয়ে মেঝে, বারান্দা ও করিডরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। শিশু ওয়ার্ডের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। ৩৬ শয্যার ওয়ার্ডে প্রতিদিন ২৫০ থেকে ২৬০ শিশু ভর্তি থাকছে। একটি শয্যায় দুই থেকে তিনজন রোগীকে রাখতে হচ্ছে। অনেক শিশু এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে থাকলেও শয্যা পাচ্ছে না।
হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ড ঘুরে দেখা যায়, মেঝে, করিডর, এমনকি পাশের গাইনি ইউনিটের করিডরেও শিশুরোগী ভর্তি। রোগীর স্বজনরা মেঝেতে বিছানা পেতে সন্তানদের চিকিৎসা করাচ্ছেন। সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের পাঁচ মাস বয়সী শিশু তালহা আট দিন ধরে হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অথচ তারা কোনো শয্যা পায়নি। শিশুটির মা মিম বলেন, ‘ভর্তির পর থেকে কোলে নিয়েই থাকতে হয়েছে। একটু জায়গা পাওয়াও কঠিন ছিল।’
পাবনা সদর উপজেলার দুবলিয়া গ্রামের আ. খালেক খান জানান, তার নবম শ্রেণিপড়ুয়া মেয়েকে নিয়ে পাঁচ দিন হাসপাতালে ছিলেন। কিন্তু শয্যা মেলেনি। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে নিয়ে খুব কষ্টে দিন কেটেছে। সরকারি হাসপাতালে এসেও ঠিকমতো জায়গা পর্যন্ত পেলাম না।’
চিকিৎসাসংকট শুধু শয্যা বা জনবলেই সীমাবদ্ধ নয়। হাসপাতালের এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান বিভাগও কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। প্রায় একবছর ধরে হাসপাতালে এক্স-রে ও সিটি স্ক্যান মেশিনের ফিল্ম নেই। ফলে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে। হাসপাতালের তিনটি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে দুটি ডিজিটাল ও একটি অ্যানালগ হলেও ফিল্মসংকটে সবই অকেজো। প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি ফিল্মের প্রয়োজন হলেও দীর্ঘদিন সরবরাহ না থাকায় শত শত রোগীকে বাইরে পরীক্ষা করাতে হচ্ছে।
একই অবস্থা প্যাথলজি বিভাগে। পরীক্ষা সুবিধা থাকলেও প্রয়োজনীয় উপকরণের সংকটে প্রতিদিন মাত্র ২০ শতাংশ রোগী সেবা পাচ্ছেন। বাকি রোগীদের বাইরে ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেকেই দালাল চক্রের খপ্পরে পড়ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সাঁথিয়া উপজেলার কুমিরগাড়ী গ্রাম থেকে শিশু নাতনিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা রাবেয়া খাতুন বলেন, ‘কোনো পরীক্ষা হাসপাতাল থেকে করতে পারলাম না। ওষুধও বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। সব বাইরে থেকে করতে হলে সরকারি হাসপাতালে এসে লাভ কী?’
অবকাঠামোগত সংকটও কম নয়। ২০১৬ সালে উদ্বোধন করা হাসপাতালের আইসিইউ (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ইউনিট দীর্ঘ ৯ বছরেও চালু হয়নি। লোকবল, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশের অভাবে ইউনিটটি এখনো তালাবদ্ধ। একইভাবে সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট) ও পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটও সীমিত সক্ষমতায় চলছে। সিসিইউতে ২০ শয্যা বাড়ানো হলেও যন্ত্রপাতির অভাবে মাত্র আটজন রোগীকে কার্যকর সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। মনিটরসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র নষ্ট হয়ে পড়ে আছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থা হাসপাতালের জেনারেটর ব্যবস্থার। বিদ্যুৎ চলে গেলে অপারেশন থিয়েটারের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে জরুরি অস্ত্রোপচার ব্যাহত হয়। চিকিৎসকদের অভিযোগ, সীমিত জনবল ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অভাবের মধ্যেই অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলাতে হচ্ছে। বিদ্যুৎবিভ্রাট হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে পড়ে।
মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত রোগ নির্ণয়ে সিটি স্ক্যান অত্যন্ত জরুরি হলেও ফিল্মসংকটে সেটিও প্রায় অচল। বিশেষ করে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণসহ জটিল রোগীদের দ্রুত পরীক্ষা সম্ভব না হওয়ায় অনেক রোগীকে রাজশাহী বা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করতে হচ্ছে।
পাবনা জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘৩৬ শয্যার শিশু ওয়ার্ডে প্রতিদিন দুই শতাধিক রোগী ভর্তি থাকে। শয্যাসংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝে বা করিডরে রাখতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও জনবলসংকটের মধ্যেই সেবা চালিয়ে যেতে হচ্ছে।’
হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. রফিকুল হাসান বলেন, ‘সংকটের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। সীমিত সক্ষমতায় সেবা চালিয়ে নিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’