ইয়াবার চেয়ে ভয়ানক মাদক ‘এমডিএমএ’, যার বাণিজ্যিক নাম এক্সটাসি, মলি বা হ্যাপি। এই মাদক ডিজে পার্টিতে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে। বিশেষ উত্তেজনার এই মাদক সেবন করলে শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে অনেক সময় ধরে ড্যান্স বা নাচানাচি করা যায়।
এমনই ভয়ানক মাদক মলি ব্যবহার হচ্ছিল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন অভিজাত এলাকার ডিজে পার্টিতে। সেখানে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ এমডিএমএ বা মলি জব্দসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে বেশ কয়েকবার এই মাদক ধরা পড়লেও এবারের পরিমাণটি অনেক বেশি।
গতকাল সোমবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হাসান মারুফ। তিনি জানান, ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করে চকলেটের প্যাকেটের মাধ্যমে বিশেষ কায়দায় দেশে মাদক সরবরাহ করত একটি চক্র। সেগুলো পোস্ট অফিস ও বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হতো। এমন একটি চক্রের পাঁচ সদস্যকে নানা রকম বিদেশি মাদক, টাকা ও সরঞ্জামসহ গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। তারা হলেন জুবায়ের, জি এম প্রথিত শামস, আসিফ মাহবুব চৌধুরী, অপূর্ব রায় ও সৈয়দ শাইয়ান আহমেদ।
ডিএনসি সূত্র জানায়, এমডিএমএ মূলত ইউরোপের মাদক। তবে যুক্তরাজ্যে এই মাদক খুবই জনপ্রিয়। এই মাদক রেভ পার্টি মাদক হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। এটি খুবই যৌন উত্তেজনামূলক ট্যাবলেট হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা খেলে দীর্ঘ সময় ড্যান্স করা যায়। এই মাদকের দাম ইয়াবার চেয়ে বেশি। প্রতি পিস মলি বা এমডিএমএ ডলারে বেচাকেনা হয়। তবে বাংলাদেশে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
ডিএনসির মহাপরিচালক বলেন, কর্মকর্তারা রাজধানীর মোহাম্মদপুর, সেগুনবাগিচা, পল্টন এলাকায় অভিযান চালিয়ে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি করা ভয়ংকর মাদকদ্রব্য এমডিএমএসহ প্রথমে তিনজনকে গত রবিবার গ্রেপ্তার করে। তাদের দেওয়া তথ্যমতে, আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তাদের কাছ থেকে ৩১৭ পিস এমডিএম ট্যাবলেট, ১ কেজি ৬৭৬ গ্রাম কুশ, ৫০ মিলি কিটামিন ও ২৫০ গ্রাম গাঁজা জব্দ করা হয়। এ ছাড়া ৬টি মোবাইল ফোন ও ১টি ল্যাপটপ এবং নগদ ৭ লাখ ১১ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।
যেভাবে অভিযান চালানো হয়
গোপন সংবাদে ডিএনসির কর্মকর্তারা জানতে পারেন, জুবায়েরসহ (২৮) স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া প্রযুক্তি-দক্ষ, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির আরও বেশ কয়েকজনের একটি চক্র গাঁজা, কুশ, এমডিএমএ, কিটামিনসহ অন্যান্য আধুনিক মাদক পার্সেলযোগে উন্নত দেশ থেকে আমদানি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরে পার্টি ড্রাগ হিসেবে ডিজে পার্টিতে এবং অভিজাত সোসাইটিতে সরবরাহ করছেন।
ডিএনসির মহাপরিচালক এ বিষয়ে বলেন, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ও মাঠপর্যায়ে আসামিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, মাদকের একটি চালান ডাকযোগে যুক্তরাজ্য থেকে বাংলাদেশে আসবে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে গত রবিবার পল্টনের পুরোনো ডাক ভবনের বৈদেশিক ডাক শাখা থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আসা এয়ার পার্সেল তল্লাশি করে কাগজের কার্টনের ভেতর বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের চকলেটের নিচে লুকানো অবস্থায় একটি বাবল পেপারে মোড়ানো লালচে বর্ণের এমডিএমএ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। এ পার্সেলের মালিক মাদক চক্রের অন্যতম হোতা মো. জুবায়েরের অবস্থান শনাক্ত করে তাকে মোহাম্মদপুরের ঢাকা উদ্যান এলাকা থেকে আটক করা হয়। এরপর জুবায়েরের দেওয়া তথ্যমতে, মাদক চোরাকারবারি চক্রের অন্যতম হোতা জি এম প্রথিত সামসকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে এমডিএমএ ট্যাবলেট, গাঁজা ও কিটামিন নামক মাদকদ্রব্য জব্দ করা হয়। জুবায়েরের দেওয়া তথ্যমতে, অপূর্ব রায়কে (২৫) গাঁজাসহ গ্রেপ্তার করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য-প্রমাণাদি জব্দ করা হয়। অপূর্বর দেওয়া তথ্যমতে সৈয়দ শাইয়ান আহমেদকে (২৪) গাঁজা ও এমডিএমএ চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণাদি জব্দ করা হয়। এ চারজনের দেওয়া তথ্যে আসিফ মাহবুব চৌধুরীকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা এসব মাদক সরবরাহ করেন। বিশেষ করে কয়েকজন ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষে সেখান থেকে এগুলো সরবরাহ শুরু করেন।
মানবদেহে যেভাবে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে
এমডিএমএ বা মলি একটি কৃত্রিম সাইকোঅ্যাকটিভ ড্রাগ, সাধারণত ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলে পাওয়া যায় এবং এটি একই সঙ্গে উত্তেজক ও ভ্রমসৃষ্টকারী প্রভাব সৃষ্টি করে। এ ছাড়া দ্রুত ‘সেরোটোনিন’, ‘ডোপামিন’ ও ‘নর-অ্যাড্রেনালিন’ মুক্ত করে ব্যবহারকারীকে ইউফোরিয়া, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি দেয় এবং আলো-সংগীত-সংযোগকে তীব্রভাবে অনুভব করায়। ফলে এই মাদক পার্টিতে বা ডান্স ক্লাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, এর সংক্ষিপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি গুরুতর। যার মধ্যে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, অতিরিক্ত উত্তাপে ডিহাইড্রেশন বা ইলেকট্রোলাইট ভ্রান্তি হতে পারে, যা প্রাণঘাতী লিভার ও কিডনির সমস্যা, পেশির টান, খিঁচুনি ও দৃষ্টি ঝাপসা দেখা যেতে পারে; মনের ওপর প্রভাব হিসেবে ডিপ্রেশন, উদ্বেগ, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, সিজোফ্রেনিয়াসদৃশ উপসর্গ এবং স্থায়ীভাবে সেরোটোনিন সিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেখার ক্ষমতা কমে যেতে পারে। এ ছাড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল বা হৃদরোগ/স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।