বগুড়ার ধুনট উপজেলার ছোট একটি গ্রাম আনারপুর দহপাড়া। এই গ্রামের এক পুলিশ সদস্য ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে জমি নিয়ে দ্বন্দ্ব ও প্রভাব বিস্তারের ঘটনায় গ্রামবাসীকে একের পর এক মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব মামলায় শিশু থেকে শুরু করে গ্রামের নারী-পুরুষ সবার জীবন এখন দুর্বিষহ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ২৫ বছর আগে থেকে পুলিশ সদস্য মোস্তাফা কামাল ও তার পরিবারের সঙ্গে গ্রামবাসীর বিরোধ শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধ ভয়াবহ রূপ নেয়। গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে গুম, ধর্ষণ, মাদক ও অ্যাসিড নিক্ষেপের মতো গুরুতর অভিযোগে একের পর এক মামলা হতে থাকে। এসব মামলায় আসামির তালিকায় আছে ১২ বছর বয়সি শিশু মো. রাশেদ থেকে শুরু করে প্রায় শতবর্ষী মো. দিলবর হোসেনসহ শতাধিক মানুষ।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, কয়েক বছর আগে জনরোষের মুখে মোস্তাফা কামাল ও তার পরিবারের সদস্যরা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে গেলেও মামলা ও হয়রানি এখনো বন্ধ হয়নি। দূর থেকেই তারা বিভিন্ন মামলার মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে তদবির ও চাপ সৃষ্টি করে যাচ্ছেন।
২০২২ সালের ৫ জুন গভীর রাতে আনারপুর গ্রামের ৭৫ বছর বয়সি ঘুর্নি খাতুন নিজ বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন। এ ঘটনায় মোস্তাফা কামালের স্ত্রী উম্মে হাবিবা শিশু মো. রাশেদ ও বৃদ্ধ মো. দিলবর হোসেনসহ ১০ জনকে আসামি করে মামলা করেন। তদন্তে চার্জশিট নিয়ে আপত্তি ওঠায় মামলাটির তদন্তভার পায় সিআইডি।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মো. মোতাহার হোসেন জানান, প্রায় সাড়ে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজ ঘুর্নি খাতুনের কোনো সন্ধান মেলেনি। যদিও এলাকাবাসীর অভিযোগ, মোস্তাফা কামাল তার আত্মীয় মো. মুকুল মিয়া ও স্বজনদের সহায়তায় ঘুর্নি খাতুনকে তার ছেলের বাড়িতে লুকিয়ে রেখেছেন।
মুকুল মিয়ার স্ত্রী সুবর্ণা খাতুন মোবাইলে জানান, ঘুর্নি খাতুনকে রাতের আঁধারে মুকুল মিয়া ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ি এলাকায় ঘুর্নি খাতুনের ছেলে সোলায়মানের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। এ তথ্য তিনি তদন্ত কর্মকর্তাদের দিয়েছেন বলে দাবি করেন।
সুবর্ণা খাতুন আরও বলেন, ‘মোস্তাফা কামালের মা মোনেজা খাতুন আমাকে প্রতিবেশী বেল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধে অ্যাসিড নিক্ষেপের মামলা দিতে বলেন। আমি রাজি না হওয়ায় এখন আমার পরিবারের সবাই মামলা-হামলার আতঙ্কে আছি।’ প্রতিবেশীদের দাবি, মুকুল মিয়াও সিআইডির কাছে বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
এ বিষয়ে বেল্লাল হোসেন জানান, তার পরিবারসহ ৫৫ জনের বিরুদ্ধে গুমসহ পাঁচটি মামলা দিয়েছেন মোস্তাফা কামাল ও তার পরিবার। একবার র্যাব সদস্যরা তার স্ত্রী বিলকিস বেগমকে মাদক ব্যবসার অভিযোগে আটক করলেও পরে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে তাকে বাড়িতে রেখে যায়। বিলকিস বেগমের অভিযোগ, আটকের সময় তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়।
এর আগে ঘুর্নি খাতুনের মেয়ে মোনেজাকে ধর্ষণের অভিযোগে প্রতিবেশী মো. বাদশা প্রামাণিকের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ওই মামলায় তিনি প্রায় ২৪ বছর কারাভোগ করেন। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনার সময় ঘুর্নি খাতুনের বাড়িতে মোস্তাফা কামাল ও তার পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, মামলাগুলোর আসামিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বয়সি প্রায় শতবর্ষী মো. দিলবর প্রামাণিক এবং সবচেয়ে কম ১২ বছর বয়সি শিশু মো. রাশেদের নাম আছে। নারী আসামিদের মধ্যে রয়েছেন বিলকিস বেগম, শাপলা খাতুন, সারমিন খাতুন, রাশেদা খাতুন, মিনি বেগম ও মর্জিনা খাতুন।
নিখোঁজ ঘুর্নি খাতুনের মামলার আসামি শাপলা খাতুন বলেন, ‘প্রসবের চার দিন পর থেকেই শিশুটিকে নিয়ে আমাকে আদালতে যেতে হতো। একপর্যায়ে আমার ছেলে আলী আকবর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা যায়।’
এদিকে ঘুর্নির মেয়ে মোনেজা খাতুন প্রায় এক বছর আগে তার স্বামী বুলু মিয়ার বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও অ্যাসিড নিক্ষেপের মামলা করেন। ওই মামলায় বুলু কিছুদিন কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
আনারপুর গ্রামের বাসিন্দারা বলছেন, গত ২৫ বছরে এই পরিবারের করা মামলায় বহু পরিবার সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে। বিশেষ করে গত তিন বছরে নতুন করে অন্তত ছয়টি মামলা হওয়ায় গ্রামজুড়ে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। এলাকাবাসী হয়রানিমূলক মামলা থেকে মুক্তি পেতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।