দীর্ঘ দেড় দশক পর পাবনার চরাঞ্চল ও প্রত্যন্ত জনপদগুলোতে আবারও উঁকি দিচ্ছে পুরোনো সেই বিভীষিকা। গত ১৫ বছর চরমপন্থিদের অস্তিত্ব অনেকটা স্তিমিত ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। আত্মগোপনে থাকা চরমপন্থি সদস্যরা আবারও প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছেন। বিশেষ করে পাবনার আমিনপুর থানার দুর্গম চরাঞ্চল ‘ঢালারচর’ আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। আত্মসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার অঙ্গীকার করা অনেক সদস্য আবারও আত্মগোপনে যাওয়ার পথ ধরেছেন। সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ, জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে দেখা দিয়েছে চরম আতঙ্ক।
সম্প্রতি জেলার আটঘরিয়া, ফরিদপুর, সাঁথিয়া ও বেড়া উপজেলার একদন্ত, লক্ষ্মীপুর, বৃহস্পতিপুর, ভুলবাড়িয়া, বনগ্রাম, মাধপুর, তেবাড়িয়া, শ্রীপুর, শিবপুর, শরৎগঞ্জ, ধানুয়াটা, বালুঘাটা, আয়েনগঞ্জ, হাদল, ধূলাউরী এবং ঢালারচরসহ জেলার বিভিন্ন বাজারে ও গ্রামে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন ‘পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এমএল-লাল পতাকা)’ পোস্টার ও দেয়াল লিখন দেখা গেছে।
পোস্টারগুলোতে কার্ল মার্কস, লেনিন ও মাও সেতুংয়ের ছবির পাশাপাশি ‘ভোটের বাক্সে লাথি মারো, সমাজতন্ত্র কায়েম করো’ এবং ‘বন্দুকের নলই সব ক্ষমতার উৎস’–এমন স্লোগান দেখা গেছে যা স্থানীয়দের মনে পুরোনো স্মৃতি জাগিয়ে তুলছে।
সাঁথিয়া উপজেলার ভুলবাড়িয়া এলাকার একজন জনপ্রতিনিধি জানান, আগে বিচ্ছিন্নভাবে পোস্টারিংয়ের কথা শোনা যেত। কিন্তু এখন ব্যাপকভাবে পোস্টারিং দেখা যাচ্ছে, যা দেখে জনসাধারণ আতঙ্কিত। গত দেড় দশকে তা দেখা যায়নি। একই এলাকার তেবাড়ীয়া ও হরিপুর গ্রামের কিছু বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাতের অন্ধকারে বিভিন্ন এলাকায় চরমপন্থিরা গোপন মিটিং করছে। একদন্ত বাজারের একজন ব্যবসায়ী বলেন, আগে সকালে ঘুম থেকে উঠলেই দেয়ালে দেয়ালে চরমপন্থিদের সাঁটানো ‘খতম করা হইল’ লেখা খুনের ঘোষণার পোস্টার দেখতে হতো। অনেক বছর পর আবার যেন তাদের পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। আতাইকুলা থানার ধানুয়াটা ও ধূলাউরী বাজারের ব্যবসায়ীরাও তাদের আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন।
পাবনার ফরিদপুর উপজেলার দুর্গম এলাকা ধানুয়াঘাটা, হাদল, গয়েশবাড়ি এলাকার বাসিন্দাদের কণ্ঠে এখন শুধুই আতঙ্কের সুর। স্থানীয় এক বাসিন্দা সে সময়ের ভয়াবহ ঘটনার স্মৃতিচারণ করে বলেন, এক সময় এ এলাকায় মোবাইল ফোন ব্যবহার করাও ছিল মানা। রাস্তাঘাটে কেউ মোবাইল বের করার সাহস পেত না। রাতে চলাচলের সময় টর্চলাইট জ্বালানো ছিল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, এমনকি বাড়ির বাইরের লাইট পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখা যেত না। চরমপন্থিদের কঠোর নিয়ন্ত্রণে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে দিন কাটাতে হতো এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে। এখন আবার তাদের আগমনধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
সদর উপজেলার দুবলিয়া এবং চরতারাপুর এলাকা এক সময় চরমপন্থিদের অভয়ারণ্য হিসেবে পরিচিত ছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ওই সময়ে এ অঞ্চলে চরমপন্থিদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কয়েকজন শীর্ষ নেতা ও ক্যাডার নিহত হন। পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপের ফলে গত দেড় দশকে এ অঞ্চলে চরমপন্থিদের প্রকাশ্য আনাগোনা ছিল না। দীর্ঘ এই সময় এলাকার মানুষ শান্তিতে ও স্বস্তিতে বসবাস করে আসছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে নিষিদ্ধ সংগঠনের পোস্টার সাঁটানোর ঘটনায় সেই পুরোনো আতঙ্ক আবারও ফিরে এসেছে।
সেই রক্তাক্ত জনপদ: ঢালারচর
পাবনা শহর থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরে পাবনা, রাজবাড়ী ও মানিকগঞ্জ জেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা ঢালারচর। বর্ষায় ট্রলার আর শুকনো মৌসুমে খেতের আলপথই এখানে চলাচলের একমাত্র ভরসা। যাতায়াতব্যবস্থা দুর্গম হওয়ার কারণে চরমপন্থিরা একসময় এলাকাটিকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করত। একসময় এটি ‘রক্তাক্ত জনপদ’ হিসেবে পরিচিত ছিল। এখন সেখানে বিভিন্ন উপদলের সৃষ্টি হয়েছে। তারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের তোয়াক্কা না করে নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। সম্প্রতি এ অঞ্চলে আব্দুর রশিদসহ বেশ কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তিকে অপহরণ করে চাঁদা দাবি করা হয়েছে।
চরাঞ্চলের কৃষকরাও এখন দিশেহারা। বিস্তীর্ণ চরের কলা চাষিদের ওপর নেমে এসেছে চরমপন্থিদের ‘কালো থাবা’। তারা বাগান থেকে জোরপূর্বক কলা কেটে নিয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। চরের বাসিন্দা ও ঠিকাদার আনোয়ার হোসেন (ছদ্মনাম) বলেন, চরমপন্থিরা বিভিন্ন জায়গায় অপকর্ম করে এখানে এসে লুকিয়ে থাকে। স্থানীয় গডফাদাররা তাদের আশ্রয় দেন। প্রতিবাদ করলে টার্গেট হতে হয়।
ঢালারচরের প্রবীণ কৃষক আব্দুল কুদ্দুস (ছদ্মনাম) দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, ২০০৭ সালে শামসুর রহমানকে, ২০০২ সালে নূরুলকে আর ২০০১ সালে আব্দুল মান্নানকে চরমপন্থিরা খুন করেছিলেন। ২০১০ সালে তো তিন পুলিশ সদস্যকেও মেরে ফেলা হয়। সেই আতঙ্ক কি কোনোদিন যাবে না?
বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার ঢালারচরের কিছু বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১৯ সালের ৯ এপ্রিল পাবনার শহিদ আমিনউদ্দিন স্টেডিয়ামে প্রায় ৬০০ চরমপন্থি সদস্য আত্মসমর্পণ করেছিলেন। তাদের মধ্যে অনেকেই পুনর্বাসনের সুবিধা পান। তার পরও এখন আবার তাদের অনেকেই অন্ধকার জগতে ফিরতে শুরু করেছেন। এদের মধ্যে অন্যতম কুখ্যাত নেতা ‘দোলনা’।
দোলনা একসময় স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য সরকারি অনুদান নিয়েছিলেন। এখন তিনি আবার নিজস্ব বাহিনী গড়ে তুলেছেন। ঢালারচর ও আশপাশের এলাকায় দোলনা বাহিনীর সদস্যরা চাঁদাবাজি করছেন। এই দুর্ধর্ষ চরমপন্থি নেতার মূল বাড়ি রাজবাড়ী জেলায়। তিনি দীর্ঘদিন ধরে সীমান্ত এলাকা হিসেবে ঢালারচরের রামকৃষ্ণপুরে আত্মগোপন করে ছিলেন। সেখান থেকেই সে সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া ঢালারচর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামের বাসিন্দা জাহিদ, একই গ্রামের বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন, সাদ্দাম হোসেন এবং কোরবান নামের তিনজন চরমপন্থি নেতা এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত ও প্রভাব বিস্তার করছেন। পার্শ্ববর্তী মাসুন্দিয়া ইউনিয়নের শ্যামপুরচর গ্রামের বাসিন্দা জুলহাস (যিনি এলাকায় জুলহাস জুনিয়র নামে পরিচিত) চরমপন্থিদের কার্যক্রমে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ঢালারচর ইউনিয়নের রামকৃষ্ণপুর গ্রামটি চরমপন্থিদের অন্যতম আস্তানায় পরিণত হয়েছে।
ঢালারচর ইউনিয়নের মিরপুর গ্রামের এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী আবু বকর (ছদ্মনাম) জানান, তার বৃদ্ধ বাবার কাছে কিছুদিন আগে এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন দোলনা। তারা ভয়ে ২০ হাজার টাকা দিয়ে রফা করেন। স্থানীয়রা জানান, কেন্দ্রীয়ভাবে তারা পরিচালিত না হলেও ‘কিশোর গ্যাং’ বা ছোট ছোট উপদল গঠন করে সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম চালাচ্ছেন। প্রায় ছয় মাস আগে বেড়ার ঢালারচর ইউনিয়নের সিদ্দিক মোড়-সংলগ্ন বাজারের পাশের বাসিন্দা ও প্রবাসী যুবক আলামিন চরমপন্থিদের হামলায় প্রাণ হারান। এলাকার একটি প্রভাবশালী চরমপন্থি গোষ্ঠী আলামিনের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করেছিল। কিন্তু তিনি সেই চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাকে টার্গেট করা হয়।
ছয় মাস আগে আলামিন বিয়ের উদ্দেশ্যে পাশের একটি গ্রামে মেয়ে দেখতে গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার পথে তাকে আটক করে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকার করায় তাকে নদীর পাড়ে নিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে তিনি নদীতে পড়ে মারা যান।
ঢালারচরের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ঢালারচর ইউনিয়নের প্রায় ৩০ হাজার মানুষ, বিশেষ করে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুরা সঠিক সময়ে চিকিৎসা পাচ্ছেন না। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভবনটি এখন পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রমে ব্যবহৃত হচ্ছে। এ ভবনের জানালাগুলো ভাঙা। বিদ্যুৎ ও পানির সংকট এখন চরমে।
এদিকে পুলিশ সদস্যরা জানিয়েছেন, এলাকাটি দুর্গম। চরমপন্থিদের দমনে এ এলাকায় পুলিশ ক্যাম্প থাকা জরুরি। তবে অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে পুলিশ সদস্যরাও সেখানে সুবিধাবঞ্চিত জীবন যাপন করছেন। অন্যদিকে, চরমপন্থিদের দমনে এই ফাঁড়িটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেখানে যানবাহন ও স্পিডবোটের অভাবে পুলিশ ঠিকমতো টহল দিতে পারছে না।
এদিকে নিষিদ্ধ সংগঠনটির এক কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, পুঁজিবাদী এ ব্যবস্থায় বর্তমানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য বিরাজ করছে। এ অবস্থায় তারা আবারও সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা বা আত্মসমর্পণকারী কয়েকজন সদস্য জানান, তারা বর্তমানে ভালো আছেন এবং সুস্থ জীবন যাপন করছেন। তারা চান আইন যেন তার নিজস্ব গতিতে চলে। এই প্রক্রিয়া চলাকালে কোনো নিরীহ মানুষ যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে তারা প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তিখাব চৌধুরী জানান, সম্প্রতি পাবনার রকিব রানা ও শুটার আলমগীরকে অস্ত্রের বড় চালানসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চরমপন্থি সংগঠনগুলো আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। আগে আত্মসমর্পণকারী চরমপন্থিদের অনেকেই আবার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছেন।
র্যাব-১২ (পাবনা)-এর কোম্পানি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, আত্মসমর্পণকারী ১৭৫ জন সদস্যের বাইরেও অনেকে আত্মগোপনে ছিলেন। এখন তারা একটু সুযোগ পেলে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করছেন। চরমপন্থিদের পোস্টারিংয়ের ঘটনাটি আমাদের নজরে এসেছে। আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি এবং কাউকে সহিংসতা ঘটাতে দেওয়া হবে না।
আতাইকুলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মজিবুর রহমান বলেন, পোস্টারিংয়ের নমুনা আমরা সংগ্রহ করেছি। এলাকায় তাদের প্রকাশ্য কোনো তৎপরতা নেই। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কঠোর অবস্থানে আছি।
পাবনার পুলিশ সুপার আনোয়ার জাহিদ আশ্বাস দিয়ে বলেন, পুরোনো চরমপন্থিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। নতুন করে যারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াবেন, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।