চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে ছিল এক নিঝুম মায়া বন। সেই বনে হরিণ, খরগোশ, বনমোরগ, জিরাফ, হাতি, বানর, বনমানুষ, ময়ূর, বুলবুলি, কাকাতুয়া, ঈগলসহ বিভিন্ন ধরনের পশুপাখি বাস করত। ছিল অনেক রকম গাছপালাও। সেসব গাছে ধরত নানা রকম ফল পাকুড়। বনের ভেতরে ছিল ছোট-বড় বেশ কয়েকটি খাল। আর সেসব খালে ছিল প্রচুর মাছ। ফলে প্রাণীরা যার যার পছন্দমতো ফলমূল মাছ খেয়ে জীবন ধারণ করত। কখনোই একে অপরকে মেরে খেত না।
বনের মাঝখানে ছিল এক বিশাল এক ছাতিম গাছ। প্রতিদিনের কাজ শেষে সবাই বিকেলে এই গাছের তলায় আড্ডা দিতে আসত। গল্প-গুজবের সঙ্গে চলত নাচ, গান, ছবি আঁকা, দরাজ গলায় কবিতা আবৃত্তিসহ আরও অনেক কিছু। প্রতিদিনের আড্ডায় ও চর্চায় মেতে তারা সবাই সাহিত্য ও শিল্পকলায় দক্ষ হয়ে উঠেছিল। যেমন ময়ূর খুব ভালো নাচতে পারত, বুলবুলি পারত গাইতে আর ছবি আঁকায় বানর ভায়ার ছিল দারুণ হাত।
এভাবেই তাদের জীবন কাটছিল। একদিন পথ ভুলে পাশের বন থেকে এল এক বাঘ। বাঘ এসে এ বনের বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ দেখে তো খুব অবাক। তার ভালো লেগে গেল। সে সবার সঙ্গে ছাতিম তলায় আড্ডা দিতে লাগল। হাসি, গান আর মজায় মেতে সে প্রায়-ই হো হো করে হেসে উঠত। ক্ষুধা লাগলে খাল থেকে ধরে খেত নানা রকম মাছ। কিন্তু কিছুদিন যেতেই মাছ খাওয়া আর তার ভালো লাগছিল না।
তার মন ছুটে যাচ্ছিল সুস্বাদু মাংসের দিকে। অবশেষে বাঘ একটা ফন্দি বের করল। প্রতিদিন যখন বনের প্রাণীরা কাজে বের হতো, তখন সে তাদের কোনো একজনের বাসায় হানা দিয়ে গোপনে একটা করে বাচ্চা ধরে নিয়ে যেত এবং গভীর জঙ্গলের একটা গুহায় বসে তাদের খেত।
বাচ্চাদের এভাবে নিখোঁজ হয়ে যাওয়ায় বনের পশুপাখিরা চিন্তিত হয়ে পড়ল। কিন্তু কেউ কিছু বুঝতে পারল না। পশুপাখিদের মধ্যে একটা খরগোশ ছিল খুব বুদ্ধিমান। তার বাঘকে সন্দেহ হলো। কারণ, বাঘ আসার আগে কখনো এমন হয়নি। আর বাঘ যে হিংস্র প্রাণী, এটা তো জানা কথাই।
খরগোশ মৃত পশুদের হত্যা রহস্য উদঘাটনে তদন্তে নামল। খুঁজতে খুঁজতে বাঘের গুহাটি সে পেয়ে গেল। গুহার মেঝেতে পেল রক্তের দাগ। বাইরে বেরিয়ে কিছুটা এগোতেই পেয়ে গেল হাড়গোড়। যা বোঝার বুঝে গেল খরগোশ। সে কাউকে কিছু না বলে প্রথমে গেল ভাল্লুক মামার চকলেটের ফ্যাক্টরিতে। সেখানে সে অর্ডার দিয়ে বানাল চকলেটের লাড্ডু। সেগুলো সঙ্গে নিয়ে সে গেল জলহস্তী ভাইয়ের কামারশালায়।
সেখানে একই রকম কতগুলো লোহার লাড্ডু বানিয়ে চকলেটের লাড্ডুর মতো রং করিয়ে নিল। তারপর বিকেলে এসে হাজির হলো ছাতিম গাছ তলার আড্ডাখানায়। কথায় কথায় সে বাঘকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি তো অনেক শক্তিশালী। তুমি কি সবকিছু চিবিয়ে খেতে পারবে?
বাঘ গর্বের সঙ্গে বলল, নিশ্চয়ই। কত শক্তিশালী প্রাণীর মাথা আমি চিবিয়ে খেয়েছি।
খরগোশ হাতে একটা লাড্ডু নিয়ে বলল, আরে ধ্যাত, তুমি তো এই লাড্ডুগুলো খেতেই পারবে না। লাগবে বাজি?
বাঘ রাগে অন্ধ হয়ে বাজি ধরে এক থাবায় লাড্ডুর জারটা কেড়ে নিয়ে বলল, এই দেখো, কেমন খাচ্ছি।
প্রথমদিকে আসল চকলেটের লাড্ডুগুলো সে আরাম করে খেল। এরপর সে জারের নিচের দিকে থাকা লোহার লাড্ডুগুলো মুখে নিয়ে সজোরে চিবাতে লাগল। আর যায় কোথায়? লোহার লাড্ডু খেতে গিয়ে তার দাঁতগুলো সব ভেঙে গেল।
দাঁতের ভাঙা টুকরোগুলো মাড়ির চিপায়-চাপায় আটকে ব্যথা শুরু হলো। খরগোশ বলে উঠল, এই সেই বাঘ, যে আমাদের বাচ্চাগুলোকে হত্যা করে খেয়েছে। তারপর সব ঘটনা খুলে বলল। তারপর উপস্থিত সব পশুপাখি দাঁতহীন বাঘকে খুব করে মেরে বন থেকে তাড়িয়ে দিল।