ঘটনাটি ঘটেছিল স্বর্গে। চমৎকার সুন্দর একটি গাছ ছিল সেখানে। কিন্তু সুন্দর জিনিসের ভাগ্য বরাবর খারাপ হয়; সবার কুদৃষ্টি পড়ে তার ওপরে। আর শয়তানের মাথায় তো মন্দবুদ্ধি গিজগিজ করছে। সে তখন স্বর্গেই থাকত। শয়তান যখন অত সুন্দর গাছটিকে দেখল, তার গা জ্বলে উঠল। গাছটির পেছনে না লাগলে কিছুতেই শান্তি পাচ্ছিল না সে। তাই তক্কে তক্কে রইল। একদিন সুযোগ বুঝে গিয়ে গাছটিকে উপড়ে ফেলল সে। তারপর সেটাকে পৃথিবীতে এনে ডালপালা শুদ্ধ মাটির গভীরে উল্টো করে পুঁতে ফেলল। আর শিকড়গুলো রয়ে গেল মাটির ওপরে। বেচারা গাছ! তার তো আর হাত-পা নেই যে চাইলেই সোজা হয়ে যাবে। উল্টো হয়েই রইল অমন।
গল্পটি সত্য কী মিথ্যা তা কে জানে। তবে গাছটি কিন্তু সত্যি। বিশ্বাস না হলে যেতে হবে আফ্রিকার মরুভূমির বুকে। সেখানেই আছে এই বাওবাব গাছ!
নিবাস
গাছটির আদি নিবাস আফ্রিকা, আরব এবং অস্ট্রেলিয়াতে। তবে পাওয়া যায় মাদাগাস্কার এবং ভারতের কয়েকটি অঞ্চলেও। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় মেসিনা নামক অঞ্চলে। তাই মেসিনাকে বলা হয় দ্য বাওবাব টাউন। মাদাগাস্কারে বাওবাব গাছকে ‘টি পট ট্রি’ বলে, কারণ কাণ্ডের সঙ্গে চায়ের কাপের অদ্ভুত মিল। অস্ট্রেলিয়ায় একে বলে দ্য প্রিজন ট্রি, মানে জেলখানা গাছ!
গাছের কথা
বাওবাব গাছ Adansonia গণের উদ্ভিদ, জন্মে মরুভূমিতে। একহারা গড়নের গাছের কাণ্ডটি মাটি থেকে সোজা ঊর্ধ্বমুখী। ডালপালার বালাই নেই বললেই চলে। মাথায় ঝোপের মতো কয়েকটি ডাল ছাতার মতো সাজানো। দূর থেকে দেখলে কারও মনে হবে একটি গাছকে বুঝি কেউ উঠিয়ে শিকড় উপুড় করে পুঁতে দিয়েছে! সবচেয়ে বড় গাছটি আছে দক্ষিণ আফ্রিকার লিনপোপো প্রদেশের একটি খামারে। সেটার উচ্চতা ৪৭ মিটার আর বেড় ২২ মিটার। এর নাম সানল্যান্ড বিগ বাওবাব। কার্বন ডেটিং করে এই গাছটির বয়স নির্ধারিত হয়েছে ৬ হাজার বছর। অর্থাৎ গাছটির যখন জন্ম, সম্রাট অ্যালেক্সান্ডার তখনো পৃথিবীতে আসতে সাড়ে ৩ হাজার বছর দেরি। সক্রেটিসের খোঁজ নেই। পিরামিড তখনো ভবিষ্যতের গর্ভে।
শিমুল গোত্রীয় গাছটি পত্রমোচী ঘরানার। বছরের অধিকাংশ সময়ে কোনো পাতা থাকে না। তখন মৃত গাছ বলে ভ্রম হয়। গ্রীষ্ম শেষে নতুন পাতা গজায় বাওবাব গাছে। পাতা না থাকলেও এরা কাণ্ডের ভেতরে খাদ্য এবং পানি সঞ্চয় করে রাখে। খাদ্য-পানি সঞ্চিত হতে হতে কাণ্ডটি ব্যারেলের মতো মোটা হয়ে যায়। কোনো কোনো গাছ তার কাণ্ডে ১ লাখ ২০ হাজার লিটার পানি ধরে রাখতে পারে। এত পানি নিজের শরীরে ধরে রাখলেও জলাবদ্ধ জায়গায় এরা বাঁচতে পারে না। প্রাণিকুলের হাত থেকে যথেষ্ট সুরক্ষিত এরা, একমাত্র হাতিই পারে এর ক্ষতি করতে। আরেক জাতের ছত্রাক এদের জন্য প্রাণঘাতী। সব গাছের আকার এক রকম হয় না। এদের আকার নির্ভর করে এলাকা ও প্রজাতির ওপর।
মানুষের আবাস
মাদাগাস্কারের প্রকাণ্ড সব বাওবাব গাছের কোটরে একসময় সেখানকার আদিবাসীরা বসবাস করত। আর অস্ট্রেলিয়ার বাওবাবগুলো ব্যবহার হতো আরও বৈচিত্র্যময় কাজে। সেখানকার অধিবাসীরা কারাগার হিসেবে ব্যবহার করত বাওবাবের প্রকাণ্ড খোঁড়ল। কোনো কোনো কোটরে নাকি ২০-২৫ জন বন্দিও ধরে যেত! ভাবুন তাহলে কত বড় হয় বাওবাব গাছ। এজন্য এদের নাম বাওবাব প্রিজন ট্রি! অস্ট্রেলিয়ার উইন্ডহ্যাম অঞ্চলে দেখা মেলে এই বাওবাব প্রিজন ট্রির। এখন অবশ্য বন্দি রাখার বন্দোবস্ত নেই। বরং পর্যটকদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয় এক জায়গা এটি! রীতিমতো সারা বিশ্ব থেকে মানুষ আসে এই গাছগুলো দেখতে।