দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে।
বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।
কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।
ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।
NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।
শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।
ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।
এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।
রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।
রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।
ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন