কোরবানির হাট কাঁপাবে ‘সম্রাট’, টাঙ্গাইলে প্রস্তুত ২৭ মণের ‘রাজাবাবু’, বরিশালের 'লাল মিয়া' কিংবা কোরবানিতে প্রস্তুত ৩৩ মণের ‘বাংলার ডন’- এমন অসংখ্য শিরোনামে ভরেছে পত্রপত্রিকা, অনলাইন, ইউটিউব কিংবা ফেসবুকের পেজ। বোঝা যাচ্ছে, ঈদুল আজহা সন্নিকটে। কোরবানির এই ঈদে পশুর নানাবিধ নামের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের দুটি মহিষের নামকরণ দেখে অনেকেই হয়তো একটু নড়েচড়ে বসেছেন। একটির নাম 'ডোনাল্ড ট্রাম্প' আর অপরটি 'নেতানিয়াহু'। নেতানিয়াহুর নাকি খুব রাগ সেজন্যেই এ নাম রাখা আর গোলাপি মহিষের সাথে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পেরও নাকি ভীষণ মিল! ব্যস! গোগ্রাসে সবাই মিলে গিলে খেলাম বিষয়টি। বহুবার শতবার ক্লিক। চলল শেয়ার। অটোমেটিক ভাইরাল। হালকা সুড়সুড়িও লাগল বোধ হয়। কোরবানির মূল উদ্দেশ্যটাই যেন ফিকে হয়ে গেছে এসবের ভিড়ে। টের পেলাম, দিন দিন কোরবানির নামে বেশ উন্মাদনায় মেতে উঠেছি আমরা।
অথচ ত্যাগের অন্যতম শিক্ষা দেয় কোরবানি। গরুর এলোমেলো নাম রাখা, চটকদার উপস্থাপনে ভাইরাল আর সেই ভাইরালের মণ্ডে নিজেরাও হাবুডুবু খাওয়াটা যেন এখন খুব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। ফলে হবিগঞ্জে হাট কাঁপাবে ‘পুষ্পা’, দাম হাঁকছে ১০ লাখ টাকা, বাগেরহাটের মামা-ভাগ্নে, শেরপুরের ৩২ মণ ওজনের 'লায়ন', সিরাজগঞ্জের ১৪ মণের 'যুবরাজ', রাজশাহীর 'সিমবা' ও 'লালু', দিনাজপুরের 'রংবাজ', পাবনার 'ব্ল্যাক ডায়মন্ড' কিংবা কুমিল্লার 'সুলতান' নামের গরুগুলোর কসরত আর অসুস্থ প্রতিযোগিতা নিয়ে বুঝে না বুঝে আমরাই যেন দিন-রাত 'হাম্বা হাম্বা' করেই যাচ্ছি!
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত ফুটবলার মেসি-রোনালদোও রেহাই পাননি গরুর এমন নামকরণ থেকে। নাম এসেছে জায়েদ খানেরও; সেই গরু নাকি ডিগবাজিও খায়! এমনকি কোরবানির হাটে যশোরের সীতারামপুরের এক গরুর নাম রাখা হয়েছে ‘বিসিএস ক্যাডার’! দাম নাকি হাঁকা হয়েছে ১৪.৫ লাখ! ওদিকে পত্রপত্রিকায় প্রকাশ, এরই মধ্যে ৬ লাখে নাকি বিক্রি হয়েছে ‘নেতানিয়াহু’ নামের গরুটি আর ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ বিক্রয় হয়েছে কেজিপ্রতি ৫৫০ টাকা দরে।
প্রশ্ন হচ্ছে, ওই নামের পশুটি যিনি কিনেছেন; তিনি কী ওই নামের ব্যক্তিকে ঘৃণা কল্পনা করতে করতে জবাই করবেন? আচ্ছা তা না হয় এ পৃথিবীতে হলোও। ওপারে ওই মহিষ যদি স্রষ্টার কাছে জানতে চায়, মৃত্যুর সময় আমাকে মহিষ নয়, মানুষের নামে কেন জবাই করা হলো! জবাবটা কী প্রস্তুত রয়েছে? ভেবে দেখার সুযোগ আছে আমাদের।
কোনো কোরবানির পশুর নাম যখন ‘ট্রাম্প’, ‘নেতানিয়াহু’, জায়েদ খান বা নেইমার নামক ব্যক্তির নামে রাখা হয় তখন তো সেই ইবাদত অজ্ঞাতসারে একটি তামাশার বস্তুতে পরিণত হয়। পশুর নাম নিয়ে হাস্যরস বা ভাইরাল হওয়ার প্রচেষ্টা আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনেরই নামান্তর। আবার কোনো ব্যক্তির প্রতি ঘৃণা প্রকাশের মাধ্যমে করা এমন ইবাদতও নিশ্চয়ই শরিয়তসম্মত নয়। আপাতদৃষ্টিতে এটি ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ বা হাস্যরসের ছলে করা হলেও গভীর ভাবনায় এটি ইবাদতের মর্যাদা ও আকিদাগত চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। কোরবানির মতো পবিত্র এমন একটি ইবাদতের সাথে গরুর নামকরণজনিত এমন হাস্যোরস বা ভাইরালি কর্মকাণ্ড মূলত এ দিনের পবিত্রতাকেই কলুষিত করে দেয় না?
মজার বিষয় হচ্ছে, এ লেখার মাঝামাঝি কোরবানির গরুর আরো কিছু নাম খুঁজতে গিয়ে গুগলে দেখি, গরুর তালিকায় নিজের নামটাও আছে! কিশোরগঞ্জের নিকলীতে একটি গরুর নাম রাখা হয়েছে 'মোস্তাক'। না, না, এতে আমি নিজে কিছু মনে করিনি! মনে করলে বিষয়টি এড়িয়ে যেতাম। যাই হোক, কামিনী নামের আরেক গরুর পাশাপাশি সেই গরুও এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নাকি দর্শনার্থীদের ভিড় লেগেই থাকে। সেলফি তুলতে আসছে বহু মানুষ।
সারা দেশেই কোরবানির পশু কিংবা পশুর দাম নিয়ে ভাইরালের এই যখন অবস্থা, তখন কোরবানির আসল উদ্দেশ্যকে জাগ্রত করার সময় এসেছে বুঝি। শুধু পশুর বিকৃত নামকরণই নয়, কোরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে এখনই। নিছক মাংস খাওয়া বা বিনোদন নয়, কোরবানি করতে হবে শুধুমাত্র স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্যে। আর মাংস খেতে হবে সবাইকে নিয়ে। সারাদেশে ধনী-গরীব সবাইকে নিয়ে গড়ে তুলতে হবে কোরবানির মমতাপূর্ণ সামাজিকায়ন। মাংসের সাথে সাথে প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিতে হবে কোরবানির কল্যাণ। কোয়ান্টাম শুদ্ধাচার থেকে সংগৃহীত ঈদুল আজহার ১২টি শুদ্ধাচার রইল পাঠকদের জন্যে।
ঈদুল আজহার ১২ শুদ্ধাচার
১. কারো কাছে কোরবানির পশুর দাম জিজ্ঞেস করবেন না। কোরবানির পশুর কোনো দাম হয় না। কারণ কোরবানির পশু কোনো পণ্য নয়। এটি পরম করুণাময়ের নির্দেশ পালনের একটি অনুষঙ্গ মাত্র।
২. ‘আমি ... টাকা দিয়ে কোরবানি দিলাম’−নিজেকে জাহির করার উদ্দেশ্যে এ ধরনের কথা বলা থেকে বিরত থাকুন। শুধু কোরবানির ক্ষেত্রে নয়, যাকাত/ সদকার পরিমাণ উল্লেখ করা থেকেও বিরত থাকুন।
৩. কোরবানির পশুর দাম ও আকার নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসুন। কেউ পশুর দাম জানতে চাইলে বলুন, ‘আল্লাহ যা সামর্থ্য দিয়েছেন তার মধ্যেই কেনার চেষ্টা করেছি’।
৪. কোরবানির গোশতের ওজন ও পরিমাণ নিয়ে কথা বলবেন না।
৫. আল্লাহর নির্দেশনার সাথে পূর্ণ একাত্মতার জন্যে কোরবানির পশু বাস্তবে দেখে ও ভালোভাবে বুঝে কিনুন । অনলাইনে কিনতে গেলে আপনি ঠকে যেতে পারেন।
৬. কোরবানির পশু কেনার পর বাজারদর যাচাই করে এ নিয়ে অহেতুক আলাপে যাবেন না। ‘দামে ঠকে গেছি’−এ ধরনের আফসোস করবেন না।
৭. কোরবানির গোশত যথাযথভাবে বিতরণ করুন। কোরবানির গোশত সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে ফ্রিজ কেনার ভ্রান্ত মানসিকতা পরিহার করুন।
৮. কয়দিন পর কোরবানি করব−এই ভেবে কোরবানির পশুকে অযত্নে-অবহেলায়-অনাহারে রাখবেন না।
৯. কোরবানির পশুর সাথে সেলফি তুলবেন না। এটি একটি ভ্রষ্টাচার। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ-সম্পর্কিত প্রচার থেকে পুরোপুরি বিরত থাকুন।
১০. খাদ্য-উৎসবে মেতে উঠবেন না। খাবারে পরিমিতি বজায় রাখুন।
১১. আপনার কোরবানির পশুর রক্ত ও বর্জ্য নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করুন। এ-ক্ষেত্রে নগর কর্তৃপক্ষের পরিচ্ছন্নতা বিধি মেনে চলুন ও এ কার্যক্রমে যথাসম্ভব সাহায্য করুন।
১২. ঈদের ছুটিতে পরিবারকে সময় দিন। টিভি ইন্টারনেট ফেসবুক ইউটিউব আসক্তিসহ সব ধরনের ভার্চুয়াল আসক্তি থেকে মুক্ত থাকুন।#
মোস্তাক আহমেদ : সমাজকর্মী ও লেখক।