আকাশে বিদ্যুৎ চমকালেই এখন বুক কাঁপে। প্রকৃতি যেন হঠাৎ ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। গত কয়েক বছরে বজ্রপাত এক ‘নীরব মহামারিতে’ পরিণত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অসচেতনতার কারণে বজ্রপাত আজ বড় দুর্যোগ। ২০২৫ সালের প্রথম আট মাসেই দেশে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। চলতি বছরের শুরুর চিত্র আরও উদ্বেগজনক। কেন এই মৃত্যু? কেন কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষই এর প্রধান শিকার হচ্ছেন? বজ্রপাতে কেন অরক্ষিত প্রান্তিক জনজীবন? এখন এই উত্তর খোঁজা জরুরি।
দুর্যোগব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত ৩ হাজার ৪৮৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। গণমাধ্যমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। ২০২৫ সালে ৩৫০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। চলতি ২০২৬ সালের চিত্রও উদ্বেগজনক। বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি থেকে এপ্রিল) মৃত্যু হয়েছে অন্তত ৮৩ জনের।
এপ্রিল মাসেই প্রাণ গেছে ৩৭ জনের। এর মধ্যে ১৮ এপ্রিল ছয় জেলায় ১২ জন মারা যান। এর আগে ১৬ এপ্রিল মৃত্যু হয় দুজনের। ২৬ এপ্রিল সাত জেলায় শিশু ও নারীসহ অন্তত ১৪ জন প্রাণ হারান। ২৭ এপ্রিল নিহত হয়েছেন নয়জন। এ ছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দুই ছাত্রীসহ সারা দেশে অসংখ্য মানুষ আহত হয়েছেন। এগুলো একেকটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের করুণ আখ্যান।
বজ্রপাতে মৃত্যুর প্রধান কারণগুলো মধ্যে দেখা গেছে, ধান কাটা, ঘাস কাটা, মাছ ধরা ও হাঁস চরানো অন্যতম। চা-পাতা সংগ্রহ বা গবাদি পশু আনতে গিয়েও অনেকে মারা যাচ্ছেন। রান্নার সময় বা বৃষ্টির ভেতর রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাও বিপজ্জনক। এমনকি নামাজ পড়ে বাড়ি ফেরার পথেও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। মূলত মাঠকর্মী, দিনমজুর ও মৎস্যজীবীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের কাজের ক্ষেত্র প্রকৃতির কাছাকাছি। খোলা মাঠ, নদীর চর বা ফসলি জমিতে তাদের অবস্থান। বজ্রপাতের সময় উঁচু স্থান ও পানির কাছে থাকা প্রাণঘাতী হতে পারে। পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী। নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সুযোগ না মেলায় মাঠের মানুষগুলো সহজেই বিদ্যুৎ-আঘাতের শিকার হন।
আবহাওয়াবিদরা জানান, বজ্রবাহী মেঘে প্রচুর স্থির বিদ্যুৎ জমা হলে বজ্রপাত হয়। মেঘের ভেতর বরফকণা ও শিলাবৃষ্টির সংঘর্ষে আধান পৃথক হয়ে যায়। পজিটিভ চার্জ মেঘের ওপরে থাকে। নেগেটিভ চার্জ জমা হয় নিচে। মেঘের এই নেগেটিভ আধান ভূপৃষ্ঠের ইলেকট্রন সরিয়ে দেয়। ফলে ভূমি পজিটিভ চার্জযুক্ত হয়। বৈদ্যুতিক বিভেদ যখন বায়ুর রোধ ক্ষমতা ছাড়িয়ে যায়, তখন মেঘ থেকে নেগেটিভ চার্জের অদৃশ্য আলোকরেখা নিচে নেমে আসে। একে স্টেপড লিডার বলা হয়। একই সঙ্গে ভূমি থেকে পজিটিভ বিদ্যুৎ-প্রবাহ ওপরে ওঠে। দুইয়ের মিলনে বৈদ্যুতিক বর্তনী সম্পন্ন হয়। তখন ভূমি থেকে মেঘের দিকে তীব্র গতির রিটার্ন স্ট্রোক ধাবিত হয়। এটিই আমাদের চোখে দৃশ্যমান বজ্রপাত। এ প্রক্রিয়ায় চারপাশের বাতাস প্রায় ৫০ হাজার ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উত্তপ্ত হয়। প্রচণ্ড উত্তাপে তৈরি হওয়া শকওয়েভ আমরা বজ্রধ্বনি হিসেবে শুনি। এটি পদার্থবিজ্ঞানের এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হলেও অসতর্কতায় তা মানুষের জন্য ঘাতক হয়ে দাঁড়ায়।
দেশের বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চল হিসেবে- শ্রীমঙ্গল, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ ও গাইবান্ধা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আর্দ্র ও শুষ্ক বাতাসের সংঘর্ষে ক্যুমুলোনিম্বাস মেঘের সৃষ্টি হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বেড়েছে। বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বল্প সময়ে অতি তীব্র বজ্রঝড় তৈরি হচ্ছে। আগে কেবল এপ্রিল-মে মাসে বজ্রপাত হতো। এখন মার্চ থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এর বিস্তার বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গাছপালা কমে যাওয়া। খোলা মাঠে নিরাপদ আশ্রয় নেই। মানুষ যখন মাঠে থাকে, তখন কাছাকাছি কোনো উঁচু দালান বা ঘন বন থাকে না। মাঠের মাঝে একক কোনো উঁচু গাছ থাকলে তার নিচে আশ্রয় নেওয়া আরও ভয়াবহ। গাছের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দ্রুত মাটিতে প্রবাহিত হয়। সচেতনতার অভাবও এখানে বড় ফ্যাক্টর। বজ্রপাতের সময় করণীয় সম্পর্কে সাধারণ মানুষ এখনো অন্ধকারের ভেতর আছে। ভেজা মাঠে শুয়ে পড়া বা পানির নিচে আশ্রয় নেওয়া মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়। মোবাইল ফোন বা ধাতব বস্তুর ব্যবহারও এ বিপদ বাড়ছে।
আধুনিক প্রযুক্তি এখন ২০ থেকে ৩০ মিনিট আগেই বজ্রপাতের পূর্বাভাস দিতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর লাল সতর্ক সংকেত বা মোবাইল বার্তার ব্যবস্থা করেছে। এ তথ্য প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছায় না। এতে প্রাণহানি কমানো যাচ্ছে না। বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠে থাকা, দৌড়ানো বা ধাতব সরঞ্জাম ব্যবহার করা ঠিক নয়। অনেকে ধান ঘরে তোলার তাড়ায় জীবনের ঝুঁকি নেন। নদী বা খালে নামা বজ্রপাতকালে চরম বিপজ্জনক। লোহার ফ্রেমের ছাতা ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ।
বজ্রপাত প্রতিরোধে বাস্তবমুখী সমাধান প্রয়োজন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সস্তা বজ্রপাত শনাক্তকারী যন্ত্র লাগানো যেতে পারে। প্রতিটি ফসলি মাঠের পাশে নির্দিষ্ট দূরত্বে বজ্রনিরোধক পাকা ঘর নির্মাণ করা দরকার। এসব ঘরে অবশ্যই মেটাল রড ও সঠিক গ্রাউন্ডিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিক্ষা পাঠ্যক্রমে বজ্রপাতের ঝুঁকি ও সুরক্ষা নিয়ে পৃথক অধ্যায় রাখা জরুরি। পরীক্ষা পদ্ধতিতে এ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করলে সচেতনতা বাড়বে। কৃষি ও মৎস্যজীবীদের সংগঠনের মাধ্যমে কাজের সময় পরিবর্তন করা যেতে পারে। বিকেলের ঝুঁকিপূর্ণ সময়টুকু কাজ এড়িয়ে চলা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সরকারি ভবন, স্কুল ও বড় মার্কেটে বজ্রনিরোধক দণ্ড স্থাপন বাধ্যতামূলক করা উচিত। বজ্রপাত কোনো অভিশাপ নয়। এটি প্রকৃতির এক বিজ্ঞানসম্মত আচরণ। অভিশাপ হলো আমাদের অজ্ঞতা ও প্রস্তুতির অভাব। প্রতি বছর বিভিন্ন সময় বজ্রপাতের খবর সংবাদপত্রের শিরোনাম হয়। কিছুদিন পর মানুষ সব ভুলে যায়।
কৃষকের কাছে সুরক্ষা প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। খোলা জায়গা, উঁচু গাছ আর পানি এড়িয়ে চলার শিক্ষা সবার থাকা চাই। সঠিক পরিকল্পনা ও সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এ মৃত্যুর মিছিল থামাতে। সচেতনতাই হোক আমাদের একমাত্র রক্ষাকবজ। নিরাপদ থাকুক বাংলার মাঠ আর মেহনতি মানুষ।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী ও আহ্বায়ক, মুভমেন্ট ফর নেচার