আজ ২৫ ডিসেম্বর। যিশুখ্রিস্টের জন্মদিন। শুভ বড়দিন। দিনটি খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে পরম পবিত্র, আনন্দ ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ দিন। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, যে দিন মানুষের মধ্যে বড়র আবির্ভাব ঘটে সেদিনটিই বড়দিন। বাংলায় বড়দিন শব্দটি সম্ভবত প্রথম ব্যবহার করেছিলেন কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত। একটি কবিতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘খৃস্টের জন্মদিন, বড়দিন, বড়দিন নাম।’ বড়দিনেই অনুষ্ঠিত হয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব।
মহামানব ছিলেন যিশুখ্রিস্ট। জন্মেছিলেন ফিলিস্তিনের জেরুজালেমের বেথেলহেমের এক জরাজীর্ণ গোশালায়। তিনি মানবজাতিকে পাপ হতে মুক্তির কথা বলেছেন। মানবসেবাই ছিল তার প্রধান ব্রত। ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য নির্যাতিত গরিব-দুঃখী অনাহারক্লিষ্ট মানুষের সেবা করে গেছেন আজীবন। বিশ্বজুড়ে মানবজাতির মধ্যে শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠাই ছিল তার জীবনের লক্ষ্য।
‘যারা আনন্দে থাকে, তাদের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নাও। যারা মানুষের ওপর জুলুম করে, তাদের সুপথে এনো, অমঙ্গল চেও না। যারা কাঁদে, তাদের সঙ্গে কাঁদ আর সমব্যথী হও।’ এই হচ্ছে যিশুর বাণী। ক্রুশকাঠে আত্মবলিদানের আগে এসব কথাই বলে গেছেন তিনি। মানবমুক্তিই ছিল তার লক্ষ্য। সবার ওপরে মানুষ সত্য, এই বাণীই তিনি ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন। যেখানেই মানুষ কষ্ট পেয়েছে, শোকগ্রস্ত হয়ে থেকেছে, ভুল পথে চলেছে, সেখানেই তিনি ছুটে গেছেন। মানুষকে রোগ-শোক থেকে মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষের দুঃখ-কষ্ট দেখে তার হৃদয় বেদনায় আর্দ্র হয়ে উঠেছে। মানুষকেই তিনি ভালোবেসেছেন। মানুষকেই অমৃতের সন্তান মনে করেছেন। হিংসা-বিদ্বেষ-ঘৃণা নয়, ভালোবাসাই হচ্ছে মুক্তির পথ। এই বোধই যিশুকে মহৎপ্রাণ ঐশ্বরিক মানবিক বোধে উত্তীর্ণ করেছিল।
খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে বড়দিন পরম পবিত্র উৎসবের দিন। গতকাল রাত থেকেই শুরু হয়ে গেছে এই উৎসবের আয়োজন। এই দিনটির বড় আকর্ষণ হচ্ছে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো আর সান্তা ক্লজের উপহার। সবুজ ক্রিসমাস ট্রি সাজিয়ে তোলা হয় বহুবর্ণিল আলোকসজ্জায়। সান্তার মাথায় থাকে লাল টুপি। খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা আজ মেতে উঠবেন এই উৎসবে।
আমাদের সৌভাগ্য, সমগ্র বঙ্গভূমিতে প্রথম ১৫৯৯ সালে ক্রিসমাস পালিত হয়েছিল যশোরের কালিগঞ্জের কাছে সুন্দরবন এলাকায়। ষোল শতকে পর্তুগীজরা অভিভক্ত বাংলায় খ্রিস্টধর্মের প্রচলন ঘটান। এর পর তা বাংলার নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বড়দিনে উপহার দেওয়ার প্রথা যেমন আগে ছিল, এখনও আছে। বন্ধুবান্ধব ও আত্মীয়স্বজনকে সবাই শুভেচ্ছা কার্ড পাঠায়। উপহার হিসেবে দেওয়া হয় নতুন পোশাক, পিঠা, কেক। আজ এভাবেই বাংলাদেশে দিনটি উৎসব-আনন্দে মুখর হয়ে উঠবে। খ্রিস্টানপ্রধান অন্য দেশে বড়দিনের উৎসবের মধ্যে দেশজ সংস্কৃতির সঙ্গে মেলবন্ধন ঘটে যায় বিশ্বসংস্কৃতির। গতরাতের শূন্য বা জিরো আওয়ারে বহু দেশের বহু শহর-নগর বর্ণিল আলোকচ্ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছেন খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষ। অন্য ধর্মালম্বীরাও সেই আনন্দ ভাগ করে নিয়েছেন।
দিনটি একই সঙ্গে আনন্দ আর উপলব্ধির। বাংলাদেশসহ সারা পৃথিবী আজ ঘৃণা, বিদ্বেষ আর সংঘাতে জর্জরিত। ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ও সংঘাত আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে; যদিও সব ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে সহমর্মিতা, ভালোবাসা আর মানবিকতা। বাংলাদেশ থেকে ধর্মীয় বিভেদের পরিবর্তে পারস্পরিক সংযম, সহিষ্ণুতা, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ব, উদারতা, কৃতজ্ঞতা আর অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিষ্ঠা ঘটুক, বড়দিনের অনুপ্রেরণায় সেই শুভবোধ প্রত্যাশা করছি।
দিনটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীসহ সবার জন্য শুভ হোক, আনন্দময় হোক। যিশুখ্রিষ্টের মানবিক মহিমায় সবার জীবন উজ্জ্বল হয়ে উঠুক। তার ত্যাগের শিক্ষা উজ্জীবিত করুক সবাইকে। খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী সবার জন্য বড়দিনের আন্তরিক শুভেচ্ছা।