যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ছুটির পর এ সংকট আরও বেড়েছে। রাজধানীতে তেল সংগ্রহের জন্য দেখা গেছে গাড়ির দীর্ঘ লাইন। তেল পেতে হাহাকার অবস্থা। কোথাও দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হয়েছে, আবার কোথাও পেট্রল পাম্পে তেল সরবরাহ বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। গত বুধবার রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে পেট্রোল পাম্পগুলোতে যে তেলসংকট দেখা দিয়েছে তা সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতির কারণেই হয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, ডিপোগুলোতে পর্যাপ্ত তেল আছে। সরকার তেলের দাম বাড়ায়নি। সরবরাহও কমায়নি। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার বলার পরও সরকার গ্যাস উত্তোলনে মনোযোগ দেয়নি। আমদানির দিকে বেশি নজর দিয়েছে। তাই বিশ্ব জ্বালানিসংকটের চাপ পড়েছে বাংলাদেশে। এ পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ভোগান্তির সঙ্গে জ্বালানি তেল নিয়ে দুশ্চিন্তাও বহু গুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটাই এবং অকটেনের বড় অংশ দেশেই উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের গ্যাস ক্ষেত্র থেকে পাওয়া উপজাত কনডেনসেট প্রক্রিয়াজাত করে পেট্রল উৎপাদন করা হয়। কনডেনসেট থেকে উৎপাদিত পেট্রলের পরিমাণ অনেক সময় দেশের চাহিদার চেয়েও বেশি হয়ে যায়। এ পেট্রলের সঙ্গে আমদানি করা অকটেন বুস্টার মিশিয়ে অকটেন তৈরি করা হয়। ফলে দেশে ব্যবহৃত পেট্রলের প্রায় পুরোটা দেশেই উৎপাদিত হয়। আর অকটেনের সিংহভাগও দেশে উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ পেট্রল ও অকটেনের বার্ষিক চাহিদা ৮ থেকে সাড়ে ৮ লাখ টন। দেশে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) এবং কয়েকটি বেসরকারি রিফাইনারি কনডেনসেট থেকে পেট্রল, অকটেনসহ প্রায় ৪০ ধরনের পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদন করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত উৎপাদন ক্ষমতা বছরে প্রায় ১৬ লাখ টন।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ড. এম শামসুল আলম বলেন, ফিলিং স্টেশনে চালকরা তেল পাচ্ছেন না, রাতের অন্ধকারে কালোবাজারে তা চলে যাচ্ছে। কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি করছে অসাধুচক্র। তাই জনগণের ভোগান্তি কমাতে সরকারকে আরও কঠোর ও সিরিয়াস হতে হবে। সরকার তেল বিক্রির ব্যাপারে কিছু আদেশ জারি করেছে। সেগুলোর প্রতিপালন হচ্ছে কি না তা দেখা দরকার। আমরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারকে বলে আসছি বাপেক্সকে দায়িত্বশীল করতে। গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে। কিন্তু সরকার সেদিকে নজর দেয়নি। আমদানির দিকে মনোযোগ দিয়েছে। তাই সংকট কাটছে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের যুদ্ধের পর পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসে। মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রধান এ নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় বাংলাদেশেও জ্বালানি আমদানি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা পার্শ্ববর্তী দেশের তুলনায় কম। যে কারণে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানির মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর বিগত সরকারকে তাগিদ দিয়েছেন। এর পরও তারা পরামর্শ কাজে লাগায়নি। বৈশ্বিক এ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমাসহ সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নানা বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই সরকারকে সংকট মোকাবিলায় অবশ্যই জ্বালানি তেলের মজুত সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে। জ্বালানি তেলের সংকটের অজুহাতে কেউ যাতে কৃত্রিমসংকট ও মজুত করতে না পারে সেদিকে সরকারকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। আশা করছি, সরকার সঠিক কৌশল প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের ভোগান্তি দূর করতে একটি কার্যকর সিদ্ধান্তে উপনীত হবে।