দেশে এইচআইভি আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে দেশে এইডসে আক্রান্ত ও মৃত্যু বাড়তে থাকায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। সামাজিক কুসংস্কার ও লোকলজ্জার ভয়ে বিষয়টি অনেকে গোপন রাখেন, চিকিৎসা করাতে চান না। ফলে ক্রমেই এ সংক্রমণ অজান্তে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এইচআইভি এখন শহরেই শুধু সীমাবদ্ধ নেই, এর বিস্তার ঘটেছে গ্রাম পর্যায়েও। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এইচআইভি এমন একটি ভাইরাস, যা মানব দেহের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে আক্রমণ করে। চিকিৎসা না নিলে সংক্রমণের চূড়ান্ত পর্যায়ে এইডস দেখা দেয়। বর্তমানে এ রোগের কোনো স্থায়ী নিরাময় নেই। চিকিৎসার মাধ্যমে এর বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং আক্রান্ত ব্যক্তিও দীর্ঘদিন সুস্থ জীবনযাপন করতে পারেন।
চলতি বছর দেশে জেলা পর্যায়ে সমকামী তরুণদের কথা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে বিষয়টি নজরে আসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। খবরের কাগজের জেলা প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে দেখা যায় এইডস সংক্রমণের ভয়াবহ চিত্র। খবরের কাগজের বরিশাল প্রতিবেদক জানান, জেলার শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে ৩ হাজারের বেশি মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ২০ জনের শরীরে এইচআইভি ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে ১১ জনই উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। হাসপাতালের চিকিৎসকদের মতে, তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সংক্রমণের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় সতর্কসংকেত।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন আক্রান্তদের মধ্যে অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের হার দ্রুত বাড়ছে। ২০২৪ সালে নতুন শনাক্তদের মধ্যে অবিবাহিতের হার ছিল ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে এই শ্রেণিতে সংক্রমণের হার ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এই হার চলতি বছর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও সেক্সুয়ালি ট্রান্সমিটেড ডিজিজ (এসটিডি) কন্ট্রোল প্রোগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে ১ হাজার ৪৩৮ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত হয়। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৯১ জনে, যা উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নির্দেশ করে। ২০২৫ সালে এইডসে ২৫৪ জন মারা যান। অন্যদিকে চলতি বছরও সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। বছরের মাঝামাঝি আক্রান্তের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়েছে। সংক্রমিতদের বড় অংশের বসবাস ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, খুলনা ও সিলেট অঞ্চলে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে অনুমিত এইচআইভি আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৫০০। এর মধ্যে শনাক্ত হয়েছে ১৪ হাজার ৩১৩। শনাক্ত রোগীদের মধ্যে ৮ হাজার ৫৭৫ জন চিকিৎসার আওতায় এসেছেন। অর্থাৎ শনাক্ত রোগীদের প্রায় ৭৪ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছেন। এখনো ২৬ শতাংশ রোগী চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সচেতনতার অভাব, সামাজিক লজ্জা ও কলঙ্ক, পর্যাপ্ত পরীক্ষা সুবিধার সংকট এবং ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের কারণে পরিস্থিতি দিন দিন জটিল হয়ে উঠছে। অন্যদিকে বিদেশগামী ও প্রবাসী জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। যা সংক্রমণ শনাক্তকরণকে আরও কঠিন করে তুলছে।
দেশে এইচআইভি সংক্রমণের হার বর্তমানে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় অনেকের মধ্যে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শুধু চিকিৎসা দিলেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি। এ ছাড়া গণমাধ্যমে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করতে হবে, যাতে সব ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ গোষ্ঠী এইডসের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবগত হতে পারে।