প্রবন্ধ রচনা : বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ
ভূমিকা : ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি
সকল দেশের রাণী সে যে আমার জন্মভূমি।’
কবির এই অমর বাণী কখনো কখনো মিথ্যা মনে হয়। যখন নানা প্রকার প্রাকৃতিক দুর্যোগ সর্বগ্রাসী শক্তি নিয়ে আমাদের ওপর চেপে বসে, তখন নিজেদের বড় অসহায় মনে হয়। সবুজ-শ্যামলে, হরিতে-হিরণে সুন্দর একটি দেশ–বাংলাদেশ এই পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, লাল-সবুজের দেশটি সম্প্রতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের লীলভূমি হিসেবে আখ্যায়িত। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিপ্রবণ দেশ। বঙ্গোপসাগরের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত এই দেশটি ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, ভূমিকম্প এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই দুর্যোগগুলো জনজীবন, কৃষি, অবকাঠামো এবং অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েছে। তবে আধুনিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম গ্রহণ করার ফলে ক্ষয়ক্ষতি কমেছে। সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দেশের সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও সক্ষম হতে পারে।
বাংলাদেশের অবস্থান এবং দুর্যোগ: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি সমতল ও নিম্নভূমি দেশ, যা বঙ্গোপসাগরের উত্তরে অবস্থিত। এর ভৌগোলিক অবস্থান দেশটিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপ্রবণ করেছে। হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে এবং বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি থাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের শিকার হতে হয়। পদ্মা, মেঘনা, যমুনার মতো বড় নদীগুলো বন্যা ও নদীভাঙন সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অতিরিক্ত বৃষ্টির কারণে এ দেশে দুর্যোগের তীব্রতা বেড়েছে। উপকূলীয় অঞ্চলগুলো লবণাক্ততার সমস্যায় ভুগছে। এই অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। তবে সরকার ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টায় দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষমতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনসচেতনতা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।
দুর্যোগ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ: দুর্যোগের সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বিশেষজ্ঞরা জানান, Disaster is an event, natural or man made, that seriously disrupts the normal functions of the civil society, thereby causing material and human losses of such severity that the affected community has to respond by taking exceptional measures nationally and internationally. মোট কথা, প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট যেসব ঘটনা মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে ব্যাহত করে, মানুষের সম্পদ ও পরিবেশের এমনভাবে ক্ষতিসাধন করে যার ফলে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হয়, তা-ই দুর্যোগ। আর প্রাকৃতিক কারণে যেসব দুর্যোগ সংঘটিত হয় সেগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগ। যেমন- বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, খরা, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততা সাধারণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এগুলো দেশের অর্থনীতি, কৃষি ও জনজীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে, যখন বন্যা ও নদীভাঙন নিম্নাঞ্চলকে ধ্বংস করে। ভূমিকম্প শহরাঞ্চলে ঝুঁকি সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এই দুর্যোগগুলোর তীব্রতা বাড়ছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং আশ্রয়কেন্দ্র তৈরির কারণে ক্ষয়ক্ষতি কমেছে। সরকার ও বেসরকারি সংস্থাগুলো দুর্যোগ মোকাবিলায় কাজ করছে। জনসচেতনতা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দুর্যোগের প্রভাব কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ : পরিবেশ দূষণে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীর বহু দেশে সৃষ্টি হচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। তবে শতকরা ২০ থেকে ২৫ ভাগ প্রাকৃতিক দুর্যোগ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হতে পারে। তবে বেশির ভাগ পরিবর্তন হচ্ছে মনুষ্য সৃষ্ট। বিশেষজ্ঞরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী শিল্পোন্নত দেশগুলো। এদের ভোগবিলাসিতা ও যন্ত্রনির্ভরশীলতার জন্য পৃথিবীতে গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। এসব দেশের কলকারখানা ও গাড়ি থেকে অতিমাত্রায় কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের ফলে বায়ুমণ্ডলের ওজোন স্তর ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে তাপমাত্রা, তাতে মেরু অঞ্চল ও বিভিন্ন পর্বতে জমে থাকা বরফ গলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। সমুদ্র ও নদীর পানির স্রোত ও ঢেউ বাড়ছে ফলে নদী ও সমুদ্রের উপকূলে ভাঙনের হারও বেড়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের বেশির ভাগ নদী শুকিয়ে যাচ্ছে। পলি জমে বেশকিছু নদী দেশের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। দেশের প্রধান নদীগুলো বিভিন্ন স্থানে এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মাধ্যমে হিমালয় থেকে ভারত হয়ে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানি এলেও এগুলোর স্রোতধারা অনেকটা কমে গেছে। ব্রহ্মপুত্রের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পদ্মার বুকেও বিভিন্ন স্থানে চর পড়ে নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফারাক্কার প্রভাবে গত তিন দশকে বাংলাদেশের ৮০টি নদীর ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। এক সময়ের খরস্রোতা নদী হিসেবে পরিচিত দেশের ১৭টি নদী মরা নদীতে পরিণত হয়েছে। আরও আটটি নদী মৃতপ্রায়। এসব নদী ড্রেজিং করে সচল করারও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ফলে বর্ষাকালে নদীর উপচে পড়া পানি প্লাবিত করে ফসলের মাঠ, জনবসতি। প্রতি বছরই বন্যা এ দেশের নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বন উজাড় করাও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আরেকটি কারণ। প্রত্যেক দেশের মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ বনাঞ্চল যেখানে থাকা প্রয়োজন সেখানে বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে মাত্র ১৬ ভাগ বনাঞ্চল রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের নাম: বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস, খরা, লবণাক্ততা, কালবৈশাখী, টর্নেডো, বজ্রপাত, তাপপ্রবাহ, শিলাবৃষ্টি, ঘন কুয়াশা, বায়ু দূষণ, পানি দূষণ, ভূমিধস এবং তুষারপাত। এই দুর্যোগগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন তীব্রতায় আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় অঞ্চলে, বন্যা ও নদীভাঙন নিম্নাঞ্চলে এবং ভূমিকম্প শহরাঞ্চলে বেশি প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই দুর্যোগের তীব্রতা বাড়ছে। তবে, প্রতিটি দুর্যোগের জন্য অনেক দেশের পৃথক মোকাবিলা কৌশল রয়েছে। পূর্বাভাস, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন এই দুর্যোগ মোকাবিলায় সহায়ক। জনসচেতনতা ও টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ দুর্যোগের প্রভাব কমাতে পারে।
(বাকি অংশ ২য় পর্বে প্রকাশ করা হবে)
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, ঢাকা
কবীর