গল্প : অপরিচিতা
অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন: ভালো মানুষ হওয়ার কোনো ঝঞ্ঝাট নাই। কেন?
উত্তর: সংসারের কোনো ধরনের দায়িত্ব কাঁধে না নিয়ে আপাত নির্বিঘ্ন ও নির্ঝঞ্ঝাট জীবনযাপনকে ব্যঙ্গ করে অনুপম এ কথা বলেছে।
দায়িত্ববান সামাজিক মানুষ হিসেবে সমাজে বসবাস করতে গেলে মানুষকে সৎকাজে সহযোগিতা এবং অসৎ কাজে বিরোধিতা করতে হবে। অপরিচিতা গল্পে কথক যেহেতু শিশুকাল থেকে কোলে কোলেই মানুষ এবং যৌবনেও তিনি তেমনটি রয়েছেন তাই তাকে সংসারের দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট হতে হয়নি। আর বিরোধ বিপত্তিমূলক কোনো কাজে না থেকে তথাকথিত ভালো মানুষ হওয়াটাকে কথক ওপরের বাক্যে ব্যঙ্গ করে বলেছেন।
প্রশ্ন: অপরিচিতা গল্পের মামা অনুপমদের সংসারে গর্বের সামগ্রী কেন?
উত্তর: অনুপমদের মামা তাদের সংসারের গর্বের সামগ্রী কারণ তিনি আশ্চর্য রকম পাকা লোক।
অনুপমের যেখানে কোনো সম্পর্ক আছে সেখানে সর্বত্রই মামা বুদ্ধির লড়াইয়ে জিতবেন এ যেন একেবারে ধরা কথা। অন্যপক্ষ বাঁচুক বা মরুক মামা অনুপমদের পক্ষকে জিতাবেনই। বস্তুত সংসারের স্বার্থরক্ষায় এবং অন্যপক্ষকে যেকোনো প্রকারে হারিয়ে সর্বদা জয়ের মালা অর্জন করার কৌশল ও দক্ষতার জন্য ‘অপরিচিতা’ গল্পে অনুপমের মামা সংসারের প্রধান গর্বের সামগ্রী হিসেবে বিবেচিত।
প্রশ্ন: বাংলাদেশের মধ্যে আমিই একমাত্র পুরুষ যাহাকে কন্যার বাপ বিবাহ আসর হইতে নিজে ফিরাইয়া দিয়াছে, বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
উত্তর: বাংলাদেশের মধ্যে আমিই একমাত্র পুরুষ যাকে কন্যার বাপ বিবাহ আসর থেকে নিজে ফিরাইয়া দিয়াছে, বলতে বরের অসহায়ত্বকে বোঝানো হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন বিয়েতে প্রায়শই এমন ঘটনা দেখা যায় যে, পণের কারণে বরের বাবা বিয়েতে অসম্মতি জানায়। কিন্তু অপরিচিতা গল্পের অনুপমের ক্ষেত্রে এর বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। বরপক্ষের পণগ্রহণের প্রবণতা, লোভ এবং হীন মানসিকতার পরিচয় পেয়ে কনের বাবা সম্ভুনাথ যেন বর অনুপমকেই বিয়ের আসর থেকে ফিরিয়ে দিয়েছেন। আলোচ্য বাক্যে অনুপমের অসহায় অবস্থাকেই বোঝানো হয়েছে।
প্রশ্ন: অনুপমের নিজেকে ‘গজাননের ছোট ভাইটি’ বলার কারণ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের কথক অনুপম আত্মসমালোচনায় নিজেকে ‘গজাননের ছোট ভাইটি’ বলেছে তার অকর্মণ্যতা ও পরনির্ভরশীল মানসিকতার জন্য।
পৌরাণিক দৃষ্টিতে গজাননের ছোট ভাইটি কার্তিকের মা দুর্গার অতি আদরের অতিমাতৃভক্ত সন্তান। তার মাতৃনির্ভরতা এক ধরনের পরনির্ভরশীলতারই নামান্তর। অনুপম শেষ পর্যন্ত নিজেকে এমন অকর্মণ্য হিসেবেই আবিষ্কার করে। ছেলেবেলা থেকে অতি আদরে কোলে কোলে মানুষ হওয়ায় মা আর মামার কথার বাইরে তার জীবন ছিল না। এমএ পাস যুবক হয়েও সত্য এবং ন্যায়ের পক্ষে মা ও মামার মতের বাইরে কিছু না বলতে পারার আক্ষেপেই সে নিজেকে ‘গজাননের ছোট ভাইটি’ বলেছে।
প্রশ্ন: ‘বংশে তো কোনো দোষ নাই?’ উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে মামার অভিমতে অনুপমের জন্য নির্বাচিত কনের বেশি বয়স প্রসঙ্গে এ কথা বলা হয়েছে।
বন্ধু হরিশের ঘটকালিতে অনুপমের বিয়ের কথা চলছিল। কনের পরিবার মামার পছন্দমতোই ছিল। কিন্তু বিপত্তি ঘটে যখন মামা শোনেন কনের বয়স ১৫। তখনকার দিনে এ বয়স বেশিই ছিল। এ কারণেই মামা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, বংশের বা মেয়ের পরিবারের কোনো সমস্যার জন্য এতদিন মেয়ের বিয়ে হয়নি, নাকি! ‘অপরিচিতা’ গল্পে মামার সন্দেহবাতিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় ঘটেছিল এভাবে।
প্রশ্ন: ‘বাপ কেবলই সবুর করিতেছেন, কিন্তু মেয়ের বয়স সবুর করিতেছে না।’ ব্যাখ্যা করো।
উত্তর: ‘অপরিচিতা’ গল্পের এ উক্তিতে অনুপমের বিয়ের জন্য নির্বাচিত কনের বয়স সেকালের পরিপ্রেক্ষিতে বেশি হওয়ার কারণ প্রসঙ্গে মেয়ের বাবার ভূমিকা সম্পর্কে এ কথা বলা হয়েছে।
অনুপমের বিয়ের জন্য হরিশের প্রস্তাবিত কনের বয়স ১৫ হলে মামা মেয়ের বংশের দোষ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। আসলে দোষ বংশের নয়, সমস্যা ছিল সমাজব্যবস্থায়। মেয়ের বাবা উচ্চমূল্যের পণ দিতে পারছিলেন না; আবার তিনি মেয়ের জন্য যোগ্য বরও চাইছিলেন। ফলে মেয়ের বিয়ে দেরিতে হচ্ছিল এবং মেয়ের বয়সও বাড়ছিল। বাবা তার মেয়ের কল্যাণের জন্যই সৎপাত্র খুঁজছিলেন, আর ওদিকে মেয়ের বয়স ক্রমেই বাড়ছিল।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
রাজউক উত্তরা মডেল কলেজ, উত্তরা, ঢাকা
কবীর