ত্রিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশের বিনোদন ও নাট্য জগতে নিরলস কাজ করে যাওয়া নির্মাতা ও চিত্রনাট্যকার মাতিয়া বানু শুকু এখন লড়ছেন এক ভিন্ন মঞ্চে—জীবনের জন্য। ক্যান্সারের সঙ্গে তার এই লড়াই চলমান। ক্যামেরার পেছনে যিনি গল্প বুনেছেন, আজ তার নিজের জীবনই যেন এক গভীর, কঠিন কাহিনি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই যাত্রায় তিনি একা নন। তার পাশে আছেন স্বামী, বিকল্প ধারার নির্মাতা নূরুল আলম আতিক। আছেন তাদের তিন সন্তান—নিঃশব্দ কিন্তু অটল শক্তি হয়ে। পরিবারটি যেন একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘ পরীক্ষার সামনে, যেখানে প্রতিটি দিন নতুন করে ধৈর্যের সংজ্ঞা লিখছে।
ঢাকায় একাধিক ধাপে চিকিৎসা নেওয়ার পর সম্প্রতি ভারতের চেন্নাইয়ে তার একটি বড় ধরনের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। চিকিৎসকরা বলছেন, সামনে আরও কয়েক দফা চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যেতে হবে তাকে। পথটি সহজ নয়, তবে থেমে যাওয়ারও নয়।
নূরুল আলম আতিক গণমাধ্যমকে জানান, ‘আমরা নাটকের মানুষ। আমরা যাঁরা নাটক ও চলচ্চিত্রে কাজ করি, তাঁদের তো আলাদা কোনো সুযোগ–সুবিধা বা কোনো পেনশন নেই। কাজটাই আমাদের ভরসা। হঠাৎ আমাদের মধ্যে কেউ ক্যানসারে আক্রান্ত হলে পরিবারের জন্য সেটা অনেক বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি তাঁর পাশে থাকতে। কিন্তু ব্যয়বহুল চিকিৎসার ব্যয় আমাদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।’
সহকর্মীরা বলছেন, শুকু সবসময়ই ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। পর্দার আড়ালে থেকে তিনি যে গল্পগুলো নির্মাণ করেছেন, সেগুলোতে মানুষের ভেতরের শক্তি, ভাঙন আর ফিরে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা বারবার উঠে এসেছে। চড়াই উতরাই এর এই সময়েও তিনি যেন সেই একই মানুষ—সংগ্রামী, সংযত, এবং অদম্য।
আতিক আরও বলেন, ‘শুরু থেকেই আমাদের পরিবারের দুজনই আমরা নাটক ও সিনেমা পরিচালনা করে আসছি। এটাই আমাদের আয়ের উৎস। গত বছর ক্যানসার ধরা পরার পরে থেকে আমরা কেউই কাজে নিয়মিত নই। এদিকে চেন্নাইতে এর চিকিৎসা খরচ অনেক। এ ছাড়া চিকিৎসা দীর্ঘদিন ধরে করে যেতে হবে। এই অবস্থায় আমরা সরকারের কাছে সহযোগিতা কামনা করছি।’
সবশেষে তিনি বলেন, ‘মানুষের কাছে শুকুর জন্য দোয়া চাই। ভালোবাসা চাই। সবার ভালোবাসায় যেন সবকিছু ঠিক হয়ে যায়।’
জীবনের এই অধ্যায়ে মাতিয়া বানু শুকুর গল্প আর কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি হয়ে উঠেছে এক শিল্পীর দীর্ঘ পথচলার আরেকটি দৃশ্য—যেখানে লড়াই আছে, আছে প্রতীক্ষা, আর আছে ফিরে আসার নীরব প্রত্যাশা। এই লড়াই আর প্রতীক্ষা আরও সহজ হয়ে উঠবে মাতিয়া বানু শুকুর ফিরে আসার জন্য, যদি ভালোবাসার হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসেন রাষ্ট্র কিংবা সমাজের দুই এক জন ‘হৃদয়বান’।
মাতিয়া বানু শুকু ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিনের জৈষ্ঠ্য কন্যা। একটি পাখি আসবে বলে আমিও দাঁড়াই মেঘের দলে ‘শুক পাখি’ বলে বাস্তবে কোন পাখি আছে কীনা তা কেউ জানে না। এই পাখিটি সুখ ও সমৃদ্ধির গল্প বলে। জন্মান্তর থেকে জন্মান্তর ধরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষ অপেক্ষা করে থাকে এই পাখিটির জন্য। এই পাখিটি বাস করে মানুষের নিবিড় কল্পনায়। এই ‘আছে’ এবং ‘নেই’ মধ্যে যে সমীকরণ সম্ভবত সেই সমীকরণের দুঃখ ও সীমাবদ্ধতা ঘোচাতেই ভাষা মতিন আর গুলবদন নেছা মনিকা তাদের প্রথম কন্যার নাম রেখেছিলেন ‘শুকু’ ...মাতিয়া বানু শুকু । অনেকেই জানে না যে নূরুল আলম আতিকের বাসায় একটা খাবারের হোটেল আছে। শিল্প সাহিত্য সিনেমার সাথে জড়িত মানুষদের নিজেদের প্রস্তুত করবার সময়কালটি যথেষ্ট কঠিন আর চ্যালেঞ্জের হয়ে থাকে। বেশিরভাগের জন্যই সেই সময়টি পার করা কঠিন হয়ে ওঠে। সবার সেই পারিবারিক সামর্থ্য ও সমর্থন থাকে না। তখন চা সিংগারা পাউরুটি খেয়ে জীবন কাটাবার একটি অভ্যাসের ভিতর দিয়ে অনেককেই যেতে হয় এবং হয়েছেও। ঢাকা কেন্দ্রিক শিল্প সাহিত্য সিনেমার আশেপাশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিনই হবে যাকে চা সিঙ্গারা পাউরুটি খেয়ে জীবন কাটাতে হয় নি। নূরুল আলম আতিক আর তার স্ত্রী মাতিয়া বানু শুকুর বাসায় ডাল ভাতের ব্যবস্থা আছে। এমন না যে নাটক সিনেমা বানিয়ে তারা অনেক পয়সা কামিয়েছেন। হরিলুটের এই দেশে সবাই যখন যে যার পকেট ভরতে আর জীবন গোছাতে ব্যস্ত দুজন মানুষ তখন খুব নীরবে শিল্পের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছিলেন এইভাবে।
গর্বের সাথে বলা যায়, এই লেখাটি যিনি লিখছেন তার পেটেও মাতিয়া বানু শুকুর রান্নাঘরের ভাত আছে।
বলছিলাম একটি শুকপাখির গল্প। ভাষা মতিন আর গুলবদন নেছা মনিকা কীভাবে কল্পনার এক জগত থেকে একটি শুকপাখি নিয়ে আসছেন এই ধুলির ধরণীতে। আজ এই মুহূর্তে মাতিয়া বানু শুকু ছাড়া আর কোন শুকপাখি নেই। মাতিয়া বানু শুকুই আমাদের বাংলাভাষার একমাত্র শুকপাখি।
এই ধরণীতে বেদনার শেষ নাই। গৌতম বুদ্ধ অনোমা নদীর তীরে হেঁটেছিলেন যাতনার শেষ কোথায় জানতে। জানা গিয়েছিলো কীনা সেই কথা চিঠি লিখে জানাবার কথা ছিল একজন কবিকে। কবির নাম জীবনানন্দ দাশ। সেই চিঠি এই ধরণীতে আজও এসে পৌঁছায় নাই। বেদনা যতই অবধারিত হোক তাই বলে শুকপাখির ক্যান্সার হবে? শুকপাখির ক্যান্সার মানে তো রাজ্য ও প্রজাদের ভাগ্যের উপর অমঙ্গল নেমে আসার সমূহ শঙ্কা। এরকম একটা অবস্থায় আমাদের কার কী করা উচিত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদেরকেই।