ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দিলেন এমপি রেহানা রানু টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলছে: ত্রাণমন্ত্রী এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী ফ্যান্টাসী কিংডম-খবরের কাগজ প্রতিদিনের অনলাইন কুইজ বিজয়ী ডিজিটাল নকল প্রতিরোধে কঠোর নজরদারির আহ্বান শিক্ষামন্ত্রীর শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে সাত দশকের অগ্রগতির দাবি প্রশ্নবিদ্ধ: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি ও সংসদ কক্ষের শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বিরোধীদলীয় নেতার পোশাক ছাড়া গোসল করলে ওজু থাকবে কি? গুজব ও বিচারাধীন ইস্যুতে সংসদের সময় নষ্ট না করার আহ্বান স্পিকারের চালের বাজারে কারসাজি ঠেকাতে কঠোর নজরদারি চলছে: খাদ্য প্রতিমন্ত্রী

সাক্ষাৎকারে সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা সুশাসন

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৫০ পিএম
আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০২৫, ০১:৫২ পিএম
ব্যাংক খাতের মূল সমস্যা সুশাসন
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন অভিজ্ঞ ব্যাংকার সৈয়দ মাহবুবুর রহমান। এর আগে তিনি ঢাকা ব্যাংকে একই পদে কাজ করেছেন। সেই সঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি)-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ব্যাংকিং খাতের নানা সংকট, উত্তরণের উপায়সহ বিভিন্ন বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মৃত্তিকা সাহা। 

খবরের কাগজ: ব্যাংক খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছু বলুন
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: বর্তমানে একটা ক্রান্তিকাল চলছে। এই পরিস্থিতিতে বেশ কিছু ব্যাংকের অবস্থা খারাপ। একটি ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হলে আরেকটি ব্যাংকে তার প্রভাব পড়বে- এটাই স্বাভাবিক। রাতারাতি এই পরিস্থিতি থেকে বেরোনো যাবে না। আমাদের ব্যাংক খাতের জন্য আশীর্বাদ হচ্ছে, গভর্নর ও অর্থ উপদেষ্টা দুজনেই এই খাতবিষয়ক জ্ঞানী। অর্থ উপদেষ্টা নিজেও একসময় গভর্নর ছিলেন। খেলাপি ঋণের নীতিমালা পরিবর্তন হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে মিল রেখে করা হয়েছে। এটা ভালো হয়েছে; আমাদের অবশ্যই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে যেতে হবে। এতদিন আমাদের ব্যালান্স শিট দেখে আন্তর্জাতিক ব্যাংকগুলো বলত, খেলাপি ঋণ আরও অনেক বেশি হবে। সে জন্য অনেক কাগজপত্র জমা দিতে হতো। এখন সেই সমস্যা হবে না। নিয়ম পরিবর্তনের ফলে আগের সরকারের যারা ঘনিষ্ঠ ছিল এবং তাদের যারা সহযোগী ছিল, তারা ঋণ খেলাপি হবে। সে জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক আগে থেকেই তা বলে আসছে। তাদের হিসাবে, আমাদের ২৫ শতাংশ ঋণই খেলাপি। আমরা সেদিকেই যাচ্ছি বা পরিস্থিতি তারচেয়ে খারাপ হতে পারে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও এক ধরনের শঙ্কা আছে, বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। সম্প্রতি এই পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পটপরিবর্তনের পর বেশ কিছুদিন কারখানা বন্ধ ছিল, শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছে। এসব কারণে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থায় কিছুটা চিড় ধরেছে। যদি দেখা যায়, সুরক্ষা নেই- তাহলে বিনিয়োগ হবে না। বিনিয়োগকারীরা প্রথমেই দেখবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। আবার এটাও ঠিক, জঞ্জাল রাতারাতি দূর করা যায় না। গত ১৫ বছরে কয়েকটি ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ব্যাংকের টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। বাস্তবতা হলো, এখন তা বন্ধ হয়েছে। তার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে; রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ে তা দেখা যাচ্ছে। বহিঃস্থ খাতের ভারসাম্য অনেকটা ভালো হয়েছে। রপ্তানিও ভালো। বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, আমরা ব্যাংক খাতের সংকট উত্তরণের দিকে যাব; সেই সময় পর্যন্ত আমাদের ধৈর্য ধরতে হবে। 

খবরের কাগজ: নতুন নিয়ম কার্যকর হলে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। এতে ব্যাংকগুলোর কী অবস্থা হবে?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: অবস্থা আরও খারাপ হবে। খেলাপি ঋণ বাড়লে ঋণমানে প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া আপনার ঋণের টাকা ফেরত আসুক বা না আসুক, আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতেই হবে। তখন আরেকজনের কাছ থেকে নিয়ে সেই টাকা ফেরত দিতে হবে। মেয়াদি ঋণ দেওয়া আমাদের কাজ না হলেও দিয়েছি। ফলে সম্পদ ও দায়ের মধ্যে সব সময় এক ধরনের অসামঞ্জস্য দেখা গেছে। টাকা যেহেতু আসছে না, সেহেতু আমরা চাপে পড়ে যাচ্ছি। তাতে সংকট হচ্ছে। ঋণ খেলাপি হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ে মূলধনে। সেই সঙ্গে তারল্য প্রবাহে আরও বড়ধরনের চাপ পড়বে। কারণ ব্যাংক সময়মতো টাকা না পেলেও আমানতকারীকে অবশ্যই চাহিদা অনুযায়ী টাকা সরবরাহ করতে হবে। আর খেলাপি ঋণ বাড়লে প্রভিশনের পরিমাণও বাড়বে, যা মুনাফায় প্রভাব ফেলবে। 

খবরের কাগজ: এই মুহূর্তে কি খেলাপি ঋণের নিয়ম বদল করার প্রয়োজন ছিল? নাকি কিছুদিন সময় নেওয়া উচিত ছিল?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: সময় বাড়ানোর বিষয়টি ঠিক নয়। ২০১২ সালের আগ পর্যন্ত আমরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে খেলাপি ঋণ নির্ধারণ করতাম। পরে সেখানে ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে ছাড় দেওয়ায় কী লাভ হয়েছে! ২০০৯ সালে আমাদের খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার কোটি টাকা। এখন তা বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা। ফলে আলটিমেটলি আমাদের কোনো লাভ তো হয়ইনি বরং ক্ষতি হয়েছে। 

খবরের কাগজ: মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক বাজারে ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত। একটি ব্যাংক কীভাবে ভালো বা মন্দ হয়। 
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে সুশাসন। আমাদের খাতে যত সমস্যা হয়েছে তার মূল কারণ হলো সুশাসনের অভাব; প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে, কোথাও সুশাসন ছিল না। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে কিছু ব্যাংক ঋণ দিয়েছে। কাকে দিতে হবে বলে দেওয়া হয়েছে, তারা সেটা দিয়েছে। যারা ওই সব ঋণের প্রক্রিয়াকরণ করেছে, তারা এখন ভুক্তভোগী হচ্ছে। অনেকেই হয়তো ইচ্ছা করে করেননি। মালিকের নির্দেশ অমান্য করলে চাকরি ছাড়তে হবে। কিন্তু চাকরি ছাড়া তো মুখের কথা নয়। যেকোনো ব্যাংকের জন্য পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা মুখ্য। তাদের কাজ হচ্ছে নীতিনির্ধারণ ও তা ঠিকঠাক পালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করা। আর ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ অন্যদের দায়িত্ব হচ্ছে কাজগুলো ঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা। পর্ষদ যেসব নির্দেশ দিয়েছে, সেগুলো ঠিকঠাকমতো বাস্তবায়ন করা। প্রয়োজন অনুযায়ী পর্ষদের সঙ্গে সমন্বয় করা। এ ক্ষেত্রে দুদিকের দায়িত্ব-কর্তব্য যদি ঠিকঠাক থাকে, তাহলেই একটি ব্যাংক ভালো হতে পারে। মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে আমরা এই কাজটিই সঠিকভাবে করছি। আমাদের মূল শক্তি হচ্ছে পরিচালনা পর্ষদ। তারা যথাযথভাবে নীতিনির্ধারণ ও তত্ত্বাবধান করছে এবং ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নিয়ম পালন করছে। এখানে কেউ কারও কাজে হস্তক্ষেপ করে না। অর্থাৎ এখানে সর্বোচ্চ সুশাসন বজায় রয়েছে। 

খবরের কাগজ: ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভূমিকা কেমন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: কেন্দ্রীয় ব্যাংক হচ্ছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একজন মানুষের মাথায় পচন ধরলে যেমন তা পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি আমরা দেখেছি, পত্রপত্রিকায়ও লেখালেখি হয়েছে, আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে কিছু সমস্যা ছিল। যার প্রমাণ দেখা যায় গভর্নরের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায়। এমন ঘটনা হয়তো পৃথিবীর কোনো দেশেই ঘটেনি। 

খবরের কাগজ: আপনি তো দীর্ঘদিন ব্যাংকিং পেশায় আছেন, সেই সঙ্গে এবিবির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এসব ক্ষেত্রে আপনার ভূমিকা কেমন ছিল? 
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: রাষ্ট্রযন্ত্র যদি বিকল হয়ে যায়, সেখানে আসলে কারোরই তেমন কিছু করার থাকে না। দেশে এতদিন আয়নাঘর ছিল বা অনেক মানুষ হারিয়ে গেছে। পরিস্থিতি এমন ছিল যে, হয় আপনাকে আঁতাত করতে হবে, না হয় সংগ্রাম করে টিকে থাকতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমি সংগ্রাম করার পক্ষেই ছিলাম। যে কারণে আমাকে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কয়েকবার ফোন করে বলা হয়েছে, আমি যেন সব বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে সব কিছু না বলি। আমি আমার জায়গা থেকে সাধ্যমতো চেষ্টা করেছি। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থা কারও কথাই আমলে নেয়নি। কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রেই যে সমস্যা ছিল। 

খবরের কাগজ: নতুন গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। সেগুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: নতুন গভর্নরকে দেখে আমাদের আশা অনেক বেড়েছে। যেহেতু তিনি একজন বিজ্ঞ অর্থনীতিবিদ, সেই সঙ্গে দীর্ঘদিন আইএমএফে কাজ করেছেন, তিনি নিজেও একটা থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রধান, সব মিলিয়ে তার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তিনি এতদিন বাইরে থেকে অনেক কিছু দেখেছেন, এখন নিজেই সেগুলো দেখভাল করছেন। অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন। তবে এটা তো ঠিক, তার একার পক্ষে সবকিছু করা সম্ভব নয়। এটা একটা টিম ওয়ার্ক। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সবাইকে মিলেই সেই কাজটা করতে হবে। এখন পর্যন্ত তিনি যেসব উদ্যোগ নিয়েছেন, সেগুলোর কিছু প্রভাব ইতোমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে, ব্যালেন্স অব পেমেন্টেও ইতিবাচক বার্তা দেখা যাচ্ছে। তবে যেসব সংস্কার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে নিশ্চয়ই ব্যাংক খাতেও আবার সুদিন ফিরবে। 

খবরের কাগজ: নতুন বছরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের নতুন কোনো সেবা বা পণ্য আসছে কিনা?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: আমরা অনেক বড় ব্যাংক না। তবে ভালো ব্যাংক হিসেবে সব গ্রাহক আমাদের যেভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এটাই আমাদের বড় অর্জন। আমরা সব সময়ই গ্রাহকদের সর্বোচ্চ মানের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি। অন্য অনেক ব্যাংক থেকে আমাদের সেবার মান অনেক ভালো। নতুন বছর আরও উন্নত সেবা দেওয়ার চেষ্টা করছি। এ জন্য তরুণ প্রজন্মের আগ্রহের জায়গা থেকে আমরা ডিজিটাল ট্রান্সফরমেশনে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ তারাই আজকে দেশটাকে নতুন করে বিনির্মাণের স্বপ্ন দেখিয়েছে। আমরা সেই পরিবেশটা তৈরি করতে চাই, তরুণরা তাদের পছন্দ অনুযায়ী সেবা পাবে। এ জন্য আমরা সম্প্রতি একটা ডিজিটাল ওয়ালেট চালু করেছি, যেখানে এমন কিছু নেই, যা আপনি পাবেন না। এটা পুরোপুরি হয়ে গেলে বড় ঋণের লেনদেন ছাড়া দিনের যাবতীয় সব কাজই এখান থেকেই করতে পারবেন ভোক্তারা। সেই সঙ্গে দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে জনগণের কাছে কীভাবে এই ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে পৌঁছানো যায়, সেই চেষ্টাও করছি। 

খবরের কাগজ: বর্তমান নানামুখী সংকটে ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থা কমছে। তার ওপর সরকার সঞ্চয়পত্রের সুবিধা বাড়িয়েছে। এতে ব্যাংকের আমানতে কোনো প্রভাব পড়বে কিনা?
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: ব্যাংকের প্রতি গ্রাহকের আস্থাহীনতা তো এক দিনে তৈরি হয়নি। এখন যেমন প্রকাশ্যে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, এতদিন সেগুলো লুক্কায়িত ছিল। যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, তা এক দিনে ফিরে আসবে না। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে ব্যাংকগুলোকে নিয়ে কাজ করছে, তাতে আশা করা যায়, আগামীতে ভালো কিছু হবে। ভালো কাজ হলেই গ্রাহকের আস্থা ফিরে আসবে। এখনই যার কিছু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। এরই মধ্যে ব্যাংকের বাইরে থাকা টাকা আবার ব্যাংকে ফিরছে, আমানতও কিছুটা বেড়েছে। তবে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাড়ানোর একটা প্রভাব তো অবশ্যই ব্যাংকে পড়বে। ব্যাংকের বাইরে পড়ে থাকা বিপুল পরিমাণ টাকার একটা অংশ যদি ব্যাংকে ফেরত আসে, সংকট কেটে যাবে। 

খবরের কাগজ: এই মাসের শেষ দিকেই মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে। সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবারের মুদ্রানীতি কেমন হওয়া উচিত? 
সৈয়দ মাহবুবুর রহমান: এবারের মুদ্রানীতিতে- নীতি সুদহারে হয়তো কোনো পরিবর্তন আসবে না। গভর্নর বলেছেন, আমাদের মূল্যস্ফীতি যদি আর না বাড়ে তাহলে এখন আর তিনি নীতি সুদহার বাড়াবেন না। আর যদি মূল্যস্ফীতি বাড়ে তাহলে হয়তো কিছুটা বাড়াবেন। ডলারের দর নির্ধারণের ক্ষেত্রেও তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো দর ঠিক করবে না। ব্যাংকগুলো প্রতিদিন দুবার করে যে দর পাঠাবে সেটার গড়ের ওপর ভিত্তি করেই একটা দর ঠিক করা হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা। সেই লক্ষ্যেই এবারের মুদ্রানীতিও সংকোচনমূলকই করা হবে।

আমাদের স্যার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ২৩ জুন ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
আমাদের স্যার

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের দোতলার পশ্চিম দিকটার নির্ধারিত কক্ষে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের ক্লাস। ক্লাসটা আমাদের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের। বিষয় শেক্‌সপিয়রের নাটক হ্যামলেট। স্যার পড়াচ্ছেন না বলে বলা ভালো, সেমিনারে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কক্ষ-করিডর ভরে গেছে অন্য বিভাগের অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের ভিড়ে, হাজিরা খাতায় থাকা নাম ডাকার সুযোগ নেই। বক্তৃতার বিষয় হ্যামলেট, শেক্‌সপিয়রের কালজয়ী বিয়োগান্তক নাটক। এলসিনরের প্রাসাদে যুবরাজ হ্যামলেট তার মায়ের দ্বিচারিতায়, তার চাচা ক্লডিয়াসের চাতুর্যে প্রাসাদ দখল দ্বিমুখীনতায় ত্যক্তবিরক্ত, বিব্রত ও বিভ্রান্ত। তার সামনে ওফেলিয়ার প্রেম। সংশয় সন্দেহ। ‘ফ্রেইলটি দ্যাই নেম ইজ ওম্যান’–হ্যামলেট তার মা কুইন গার্টুডের ওপর ক্ষোভ ও হতাশা থেকে এই স্বগতোক্তিটি করেছিলেন। মানসিক দ্বন্দ্ব। টু বি অর নট টু বি দ্যাট ইজ দ্য কোশ্চেন। হ্যামলেটের এ প্রশ্ন তাবৎ দুনিয়ার সব সম্ভাবনাময় মানুষের সামনে। বইয়ের পাতা থেকে প্রসঙ্গ চলে এল সমাজ, সংসার রাজনীতি এমনকি পুঁজিবাদের মধ্যকার অসঙ্গতিগুলোর ক্ষেত্রেও। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছে সবাই। স্যারের একক সেমিনারে হ্যামলেট নাটকের সেই সর্বজনীন স্বগোতোক্তি টু বি অর নট টু বির ব্যাখ্যা ডালপালা ছড়াচ্ছে। আপাতত সে সময় আমাদের ক্লাসে। বর্তমানে বিশ্ব সংসারে। 

আমরা তখন আশির দশকের একেবারে গোড়ার বাংলাদেশে। পঁচাত্তরের পট-পরিবর্তনের পর বহুদলীয় গণতন্ত্র যাত্রার কৈশোরকাল। আমরা হতে চেয়েছিলাম ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক, ইউনিভার্সিটি কিংবা কলেজে। শিক্ষক হব তার মতো, ক্লাসে সবাইকে সম্মোহিত করব তার মতো। পারলে কলম ধরব পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে। মাইনে ছাড়া মার্কসের ভাবশিষ্য বনে যাব। স্যার উপদেশ দিলেন–‘না। তোমরা ডেপুটিদের দলে ঢুকে পড়ো’। অর্থাৎ সরকারি আমলা হও। কেননা, যুক্তি দিলেন তিনি–আসন্ন সমাজে এই শিক্ষক সেই শিক্ষক হতে পারবে না। কেননা, দূরদৃষ্টিতে দেখছেন তিনি, পুঁজিবাদের মন্ত্রতন্ত্র শিক্ষক সমাজে ঢুকে গেছে ইতোমধ্যে। নানা প্যাঁচ-পোঁচ, এগেইন টু বি অর নট টুবির ফ্যাসাদে, প্রাসাদে। শিক্ষকতার মানমর্যাদা নিয়ে মফস্বল কলেজে ইংরেজির প্রভাষক হয়ে টিকতে পারবে না। অনার্স পাস করে এমএর প্রান্তিক পর্যায়ে আমরা, ১৯৭৯ সালে, তখনো বছর বছর বিসিএস দেওয়ার চল চালু হয়নি। অতএব, অনার্স পাস করেই বিসিএস দাও, দিলাম। আমাদের ক্লাসের ৩০ জনের মধ্যে ২৯ জনই বিসিএসে প্রবেশিলাম। টু বি অর নট টুবি করতে করতে দেশের সর্বোচ্চ আমলা হলাম অনেকেই। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে গিয়ে, মব না হয়েও কলম ধরতে স্যারের সহযাত্রী হলাম। কিন্তু তেমন কিছু করতে পারলাম কই। তবে কিছু তো হয়েছে বা হচ্ছে। মার্কিনিদের মধ্যে তো অনেকে যেমন পুঁজিবাদের পোষ্যপুত্র ইলন মাস্ক দুনিয়ার সেরা ধনী হচ্ছে, মেলিন্ডা ও বিল গেটস টাকা রাখার জায়গা পাচ্ছে না। কিন্তু মার্কিনিদের মাতবরির বিশ্বব্যাপী বদনাম থামানো যাচ্ছে না। শেষমেষ ফুটবল খেলায় মাতিয়ে পুঁজিবাদের পতন কিংবা বোধন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে। ইরানি দলের সঙ্গে উপেক্ষার প্রেক্ষাপট পাল্টানো যাচ্ছে না। এদিকে পুঁজিবাদের জাত শত্রু রাশিয়া ও চীন এখন শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থানে। টু বি অর নট টু বি।

নতুন দিগন্ত পত্রিকায় স্যারের সম্পাদকীয় এখনো দৈর্ঘ্য-প্রস্থে বিশাল। আত্মজৈবনিক প্রসঙ্গ থেকে শুরু করে কত কিছু সম্পাদকীয় স্তম্ভে ভিড় জমাচ্ছে। জাতীয় দৈনিকগুলোয় স্যার বিস্তর লেখালেখি করেছেন। সেসব পুনরোক্তি হলেও তিনিই এখন একমাত্র বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর;  দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি এবং বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র মোকাবিলার ক্ষেত্রে  তিনিই এখন আমাদের বাতিঘর, মেন্টর। 

একজন সমাজসচেতন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও স্যার সক্রিয়। বিভিন্ন অন্যায় ও অসংগতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেন। একজন যথার্থ বুদ্ধিজীবীর বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে তিনি সচেতন। শুধু অবগত নন, নিজে সেই বৈশিষ্ট্যের ধারকও। 

মননচর্চার ক্ষেত্রে স্যারের ক্ষেত্র সাহিত্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ইতিহাস, সমাজ, রাজনীতি, দর্শন, সংস্কৃতি এমনকি অর্থনীতি পর্যন্ত তার কৌতূহল বিস্তৃত। লেখকজীবনের শুরু থেকেই সাম্যবাদী জীবনদর্শনের প্রতি তার আনুগত্য। এ দর্শন থেকেই তিনি সমাজদেহের বিভিন্ন রোগের অনুসন্ধান করেন। রোগের কারণ হিসেবে প্রায়ই শনাক্ত করেন পুঁজিবাদকে। রোগ নিরাময়ের পদ্ধতি নিয়ে নানা মত থাকতে পারে; কিন্তু রোগ নির্ণয়ে তার অধ্যবসায় বহমান। 

স্বতন্ত্র ভাষাশৈলীর কারণে স্যারের লেখা সহজেই শনাক্ত করা যায়, চেনা তো যায়ই। গুরুগম্ভীর, গুরুত্বপূর্ণ কিংবা জটিল কোনো বিষয়ের অবতারণা করেন গল্পের ভঙ্গিতে। বলার ভঙ্গি একই সঙ্গে সরল ও সরস। এমনকি শিরোনাম কখনো কখনো কাব্যিক ব্যঞ্জনামণ্ডিত। 

দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী জীবনদর্শনে আস্থাবান আমাদের স্যার বরাবরই তার লেখনিতে দার্শনিক গুরুত্বকে প্রাধান্য দিয়ে চলেছেন। তার সব রচনার দিকে তাকালে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তার সৃষ্টিশীল জীবন ও সামাজিক কর্মতৎপরতা এ সাক্ষ্য দেয়। 

দর্শনের অপরিহার্যতাকে স্বীকার করেন বলেই স্যার ‘সাহিত্যের দর্শনানুসন্ধান’ করে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন ‘সাহিত্যকে বাদ দিয়ে দর্শন চলতে পারে, কিন্তু দর্শনকে বাদ দিয়ে সাহিত্য চলতে পারে না।’ সাহিত্য মানুষের ভেতরে সংবেদনশীল সত্তাকে জাগিয়ে রাখে। তাই সাহিত্য শ্রেণিবিরোধী ও রাষ্ট্রবিরোধী। বিশ্বসাহিত্যের তুলনায় বাংলা সাহিত্যে রাষ্ট্রবিরোধিতার পরিচয় যৎসামান্য। ফরাসি ও রুশ বিপ্লবের পেছনে সাহিত্যের যেমন বড় ভূমিকা ছিল, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পেক্ষাপটে সাহিত্য তেমন বড় ভূমিকা পালন করেনি। রাষ্ট্রের সঙ্গে সাহিত্যের দ্বান্দ্বিক সম্পর্ক স্পষ্ট করতে না পারা সাহিত্যের একটি দুর্বলতা। এ কারণেই স্যার বরাবরই প্রাসঙ্গিকভাবে টেনে আনেন সমাজ ও রাজনীতিকে। সংস্কৃতি ও স্বাধীনতাকে তিনি পরিপূরক মনে করেন। সংস্কৃতির বিকাশ ও পরাধীনতা পরস্পরবিরোধী। সাংস্কৃতিক বিকাশের জন্য যে মূল্যবোধ ও আত্মপ্রকাশ প্রয়োজন তা স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতা ছাড়া অর্জন সম্ভব নয়। সংস্কৃতিসেবীদের মনে স্বাধীনতার অনুপস্থিতি সংকট বৃদ্ধি করে। দারিদ্র্য নিঃসন্দেহে এ দেশের বড় সমস্যা। কিন্তু দৈন্য শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, চিন্তার ক্ষেত্রেও। তাই তিনি প্রত্যাশা করেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বরাবরই নির্ণয়কের ভূমিকা পালন করেছে। তার মতে, ‘বাংলাদেশের সাহিত্য মধ্যবিত্তের দ্বারা, মধ্যবিত্তকে নিয়ে এবং মধ্যবিত্তের জন্য রচিত।’ তনি মনে করেন সমষ্টিগত জীবনকে যথার্থভাবে ধারণ করতে না পারা সাহিত্যের ব্যর্থতা। এর মূলে রয়েছে দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির সংকট।

স্যারকে ৯১তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা।

লেখক: সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক

প্রকাশ: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:০১ এএম
আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬, ১০:১১ এএম
গ্রাহক আস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় সাফল্যের চূড়ায় পূবালী ব্যাংক
খবরের কাগজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী। ছবি: খবরের কাগজ

দেশের ব্যাংক খাত যখন উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধনসংকট ও আস্থাহীনতার চাপে টালমাটাল, তখন ব্যতিক্রম হিসেবে প্রযুক্তিনির্ভর রূপান্তর, শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পথে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি খাতের পূবালী ব্যাংক। 

চ্যালেঞ্জপূর্ণ বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও ২০২৫ সালে শক্তিশালী আর্থিক প্রবৃদ্ধি, সুদৃঢ় সম্পদমান, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণ এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকটি। বর্তমানে ব্যাংকটির পরিশোধিত মূলধন ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের নিচে, কোনো ধরনের প্রভিশন ঘাটতি নেই, মূলধন পর্যাপ্ততা দেশের অন্যতম শক্তিশালী অবস্থানে এবং ধারাবাহিকভাবে ভালো মুনাফা ও লভ্যাংশ প্রদান–এসব সূচকে ইতিবাচক ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে ব্যাংকটি। সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমেই এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ আলী।

খবরের কাগজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলনের ফলে গত তিন বছরে পূবালী ব্যাংক শুধু ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিই অর্জন করেনি, বরং শেয়ারহোল্ডারদের জন্যও উল্লেখযোগ্য মূল্য সৃষ্টি করেছে। ২০২২ সালে যেখানে ব্যাংকের শেয়ারদর ১৬ থেকে ২০ টাকার মধ্যে অবস্থান করছিল, বর্তমানে তা ৩৭ টাকারও ঊর্ধ্বে উন্নীত হয়েছে। একইসঙ্গে ধারাবাহিক স্টক ডিভিডেন্ডের মাধ্যমে ব্যাংকের পরিশোধিত মূলধন প্রায় এক হাজার কোটি টাকা থেকে প্রায় ৫৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে এক হাজার ৫৬০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে, যা শেয়ারহোল্ডারদের অংশীদারত্বের মূল্য বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাংকের মূলধনী ভিত্তিকেও আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে ২০২২ সালের তুলনায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের বাজারমূল্য তিন গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা, সুশাসন, গ্রাহকের আস্থা এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির প্রতিফলন।

তিনি বলেন, বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও পূবালী ব্যাংক সুশাসন, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবনের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে শেয়ারহোল্ডারদের জন্য মূল্য সৃষ্টি করে যাচ্ছে।

মোহাম্মদ আলী বলেন, পরিবর্তনশীল অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পূবালী ব্যাংক শুধু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং প্রযুক্তি, ডিজিটাল ব্যাংকিং এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে একটি দীর্ঘমেয়াদি রূপান্তর কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছে। শাখাভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সমন্বয়ে ব্যাংকটি একটি শক্তিশালী ‘ফিজিটাল ব্যাংকিং ইকোসিস্টেম’ গড়ে তুলছে, যেখানে গ্রাহক তার পছন্দের মাধ্যমে, সুবিধাজনক সময়ে এবং নিরাপদ উপায়ে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ করতে পারছেন।

ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা পিআই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ২০২৫ সালের শেষে ৫ লাখ ২৮ হাজার ২৭৬ জন সক্রিয় ব্যবহারকারী অর্জন করেছে। প্ল্যাটফর্মটির মাধ্যমে মোট ১ দশমিক ৮৬ কোটি লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। বছরওয়ারি হিসাবে ব্যবহারকারী বৃদ্ধি পেয়েছে ৭৮ শতাংশ এবং লেনদেন বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৫ শতাংশ, যা ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান আস্থার প্রতিফলন।

ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো সম্প্রসারণেও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে ব্যাংকটি। ২০২৫ সালে মার্চেন্ট পিওএস টার্মিনাল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫ হাজার ৫২৫-এ এবং ১ দশমিক ৪৫ লাখেরও বেশি বাংলা কিউআর স্থাপনের মাধ্যমে নগদহীন লেনদেনকে আরও সহজ, নিরাপদ ও বিস্তৃত করা হয়েছে। এর ফলে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, খুচরা বিক্রেতা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার বেড়েছে।

পূবালী ব্যাংকের বিস্তৃত নেটওয়ার্কও এই রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের ৫১৭টি শাখা, ২৭৪টি উপশাখা, ২২টি ইসলামিক ব্যাংকিং উইন্ডো এবং ৯০১টি এটিএম/সিআরএম কার্যকর ছিল। সেল্ফ সার্ভিস ব্যাংকিং ও ডিজিটাল অনবোর্ডিং সুবিধা গ্রাহকদের জন্য ব্যাংকিংকে আরও দ্রুত, সহজ ও স্বনির্ভর করেছে।

আর্থিক সূচকেও ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে বলে জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, ২০২৫ সালে ব্যাংকের মোট সম্পদ ২০ দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ লাখ ১৮ হাজার ১৩ কোটি ৬৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়েছে। আমানত দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৫১৯ কোটি ৪৯ লাখ টাকা এবং ঋণ ও অগ্রিম বেড়ে হয়েছে ৭১ হাজার ১৪০ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। একই সময়ে একীভূত পরিচালন মুনাফা ২ হাজার ৯০৭ কোটি টাকা এবং কর-পরবর্তী নিট মুনাফা ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। শেয়ারহোল্ডার ভ্যালুর ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের ন্যূনতম সীমার চেয়ে অনেক বেশি এবং ব্যাংকের মূলধনী শক্তি ও স্থিতিশীলতার পরিচায়ক।

শুধু তা-ই নয়, অ্যাসেট কোয়ালিটির ক্ষেত্রেও পূবালী ব্যাংক শিল্প খাতের তুলনায় ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল মাত্র ২ দশমিক ২০ শতাংশ, যেখানে খাতভিত্তিক গড় খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে। ডাটা-নির্ভর মনিটরিং, বিচক্ষণ ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী পুনরুদ্ধার কার্যক্রমের মাধ্যমে এই সাফল্য অর্জিত হয়েছে।

বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স প্রবাহেও পূবালী ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকের মাধ্যমে পরিচালিত রপ্তানি ব্যবসা ৩৮ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা, আমদানি ব্যবসা ৪৭ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক রেমিট্যান্স ১১ হাজার ৩৬২ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে রেমিট্যান্স প্রবাহে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি ব্যাংকের সেবার মান, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং গ্রাহক আস্থার প্রতিফলন বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ আলী। 

তিনি বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংয়ের পাশাপাশি ইএসজি ও টেকসই উন্নয়নেও গুরুত্ব দিচ্ছে পূবালী ব্যাংক। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকের মোট ঋণ ও অগ্রিমের প্রায় ৩০ শতাংশ টেকসই অর্থায়নের অন্তর্ভুক্ত ছিল। 

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০২৬-২০২৮ কৌশলগত পরিকল্পনার আওতায় পূবালী ব্যাংক প্রযুক্তিনির্ভর, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই ব্যাংকিং মডেল বাস্তবায়নে কাজ করছে। ২০২৬ সালে ব্যাংকটি একটি বছরব্যাপী ব্যাংকিং ক্যাম্পেইন পরিচালনা করবে, যার মাধ্যমে রিটেইল, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং করপোরেট খাতে ডিজিটাল লেনদেন আরও সম্প্রসারিত হবে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী এখনো পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সেবার বাইরে রয়েছে। শাখার বিস্তৃতি, উপশাখা, সেল্ফ সার্ভিস পয়েন্ট, পিআই অ্যাপ এবং বাংলা কিউআরের সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা গ্রাহকদের সেবার আওতাভুক্ত করার  লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে দেশের আরও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসতে চায় পূবালী ব্যাংক। মোহাম্মদ আলীর মতে, প্রযুক্তিনির্ভর, নিরাপদ, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল ব্যাংকিংই ভবিষ্যতের পথ। ঐতিহ্য, সুশাসন, উদ্ভাবন এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার সমন্বয়ে পূবালী ব্যাংক আগামী দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা: ফরিদা আখতার

প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬, ০৮:৫৮ এএম
আপডেট: ১৭ জুন ২০২৬, ১১:১৪ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা: ফরিদা আখতার
সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। ছবি: খবরের কাগজ

নারী অধিকার, কৃষি, প্রাণবৈচিত্র্য ও খাদ্য সার্বভৌমত্বের আন্দোলনে পরিচিত মুখ ফরিদা আখতার। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের কৃষক, নারী এবং স্থানীয় উৎপাদনব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে আসছেন। ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান উবিনীগের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি বিকল্প উন্নয়ন ভাবনার অন্যতম প্রবক্তা। একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন সরকারের দায়িত্ব পালনের অম্ল-মধুর নানা অভিজ্ঞতার কথা। তার সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন খবরের কাগজের সিনিয়র রিপোর্টার শাহনাজ পারভীন এলিস

খবরের কাগজ: আপনি তো রাজনীতিক নন, একজন মানবাধিকার কর্মী। কৃষি ও নারী আন্দোলনের অগ্রভাগে থাকা সমাজকর্মী। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হওয়ার আহ্বান প্রথম কীভাবে পেলেন?

ফরিদা আখতার: আমি দলীয় রাজনীতি করিনি, কিন্তু রাজনৈতিক প্রশ্নে সব সময় সক্রিয় ছিলাম। নারী অধিকার আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৮৭ সাল থেকে আছি। দীর্ঘদিন ধরে কৃষি আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত। ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানের সময় ছাত্রদের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। সরকারে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রথম প্রস্তাবটা ছাত্রদের কাছ থেকেই আসে। প্রথমে আমি রাজি হইনি, বলেছিলাম, আমি তোমাদের সঙ্গে রাস্তায় থাকতে চাই। পরে যখন জানতে পারি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের তালিকায়ও আমার নাম আছে, তখন দায়িত্ব গ্রহণে সম্মত হই।


খবরের কাগজ: মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

ফরিদা আখতার: এই মন্ত্রণালয়টি বরাবরই অবহেলিত। প্রথমে মনে হয়েছিল বিষয়টি আমার জন্য অপরিচিত। কিন্তু পরে বুঝলাম কৃষি, মৎস্য খাত ও প্রাণিসম্পদের বিষয়গুলো একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। স্থানীয় জাত সংরক্ষণ, কৃষকের অধিকার এবং খাদ্য সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আমি বহুদিন কাজ করেছি। মন্ত্রণালয়ে গিয়ে দেখলাম, দেশীয় জাত সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির মধ্যে এক ধরনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। একদিকে উৎপাদন বাড়াতে হবে, অন্যদিকে স্থানীয় জাত ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে। এই ভারসাম্য রক্ষার সংগ্রামেই আমার সময় কেটেছে।

খবরের কাগজ:  সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কী ছিল?
ফরিদা আখতার: অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনই ছিল না। অবৈধ জাল ব্যবহার, বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরা—এসব বন্ধ করতে আইনি কাঠামোর সীমাবদ্ধতা ছিল। আবার মৎস্যজীবীদের জন্য কার্যকর ঋণ ব্যবস্থাও ছিল না। মৎস্যজীবীদের সবচেয়ে বড় সংকট দাদন ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থার হাত থেকে জেলেদের মুক্ত করতে আমরা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলাম, যেন মৎস্যজীবীরাও নীতিগত জায়গা থেকে ঋণ পেতে পারেন। কিন্তু ওটা বাংলাদেশ ব্যাংক পর্যন্ত গিয়ে আটকে আছে। তারা ব্যাংক বাড়াতে অনীহা জানিয়েছে।

খবরের কাগজ: নারীবিষয়ক সংস্কার কমিশন নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছে। সরকারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আপনি কী বলবেন?

ফরিদা আখতার: নারী কমিশন গঠনের দাবিটা আমরা কয়েকজন উপদেষ্টাই তুলেছিলাম। কমিশনের সুপারিশগুলোও অনেক ভালো ছিল। কিন্তু কয়েকটি বিষয়ে বিতর্ক তৈরি হয়, বিশেষ করে নারীর সম্পত্তির অধিকারের প্রশ্নে। কমিশনের প্রস্তাবে অনেক ভালো বিষয় ছিল। যেমন সংসদে সংরক্ষিত যে নারী আসন, সেগুলোতেও সরাসরি নির্বাচনের প্রস্তাব এই কমিশনের ছিল। আমি মনে করি, সরকারের আন্তরিকতার অভাব ছিল না। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা ছিল। ধর্মীয় গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলোর আপত্তির কারণে অনেক বিষয় এগিয়ে নেওয়া যায়নি। নারী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে এটা নিয়ে আমার মনেও দুঃখবোধ আছে। তবে আমি দেখেছি, তাদের আন্তরিকতার অভাব ছিল না; বরং পরিস্থিতিগত সীমাবদ্ধতা ছিল।


খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ ছিল সংসদ নির্বাচন আয়োজন ও নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। কিন্তু এই নির্বাচনকে ঘিরে নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ফরিদা আখতার: একটা বিষয় পরিষ্কার করতে চাই। অন্তর্বর্তী সরকার শুধু নির্বাচন দেওয়ার জন্য গঠিত হয়নি। আমাদের তিনটি প্রধান দায়িত্ব ছিল– গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার, প্রয়োজনীয় সংস্কার এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন। দায়িত্ব গ্রহণের পর আমাদের প্রথম ছয় মাসই কেটেছে শহিদ পরিবার, আহত মানুষ এবং তাদের পুনর্বাসনের কাজ নিয়ে। হাজার হাজার আহত মানুষের চিকিৎসা ও তালিকা প্রস্তুত হয়েছে। শহিদদের পরিবারগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক রাখতে হতো। এ ছাড়া শিক্ষকদের আন্দোলন, স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্দোলন- প্রায় প্রতিদিন শাহবাগ মোড়, যমুনা ও সচিবালয় ঘেরাও অথবা বিক্ষোভ কর্মসূচি থাকত। এসবের পেছনে ফ্যাসিবাদী শক্তির অনেক ইন্ধন ছিল। সবই আমাদের সামাল দিতে হয়েছে। এরপর সংস্কার ও নির্বাচনের প্রক্রিয়া এগিয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের যে সময়টা লেগেছে, এটা কোনো কালক্ষেপণ না। 

খবরের কাগজ: বড় একটি রাজনৈতিক দলকে (আওয়ামী লীগ) বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন কতটা গণতান্ত্রিক?

ফরিদা আখতার: অবশ্যই আমি এটাকে গণতান্ত্রিক নির্বাচন বলব। কারণ আপনাকে একটা প্রশ্ন করতে চাই—যারা গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হয়েছেন, যারা আহত হয়েছেন, লাখো মানুষ যারা রাস্তায় নেমেছিলেন, তাদের কাছে আমরা কী জবাব দিতাম, যদি সেই দলকেই আবার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতাম? যে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, যাদের বিরুদ্ধে ১৫ বছর ধরে ভোটাধিকার হরণ, অর্থ পাচার, অর্থনীতি ধ্বংস এবং জনগণের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার অভিযোগ রয়েছে, সেই দলকে শুধু ‘সব দলকে নির্বাচনে আনতে হবে’–এই যুক্তিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া যায় না। শহিদদের কাছে আমাদের দায় ছিল। গণতন্ত্রের নামে সবকিছু এক কাতারে ফেলা যায় না। এ ছাড়া তাদের দলীয় কর্মকাণ্ড তখন আইনগতভাবেই নিষিদ্ধ ছিল। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত তারা বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিতে পারত না। সুতরাং ‘সব দল’ বলতে তখন যেসব দল আইনগতভাবে বৈধ ছিল, তাদেরই বোঝানো হয়েছে। আমাদের সরকারের দায়বদ্ধতা ছিল শুধু ভোটারদের প্রতি নয়; গণ-অভ্যুত্থানে শহিদ হওয়া মানুষ এবং আহতদের প্রতিও ছিল। সেই বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

খবরের কাগজ: গণভোটের প্রচার ও ভোটের ফল নিয়ে এত বিতর্ক কেন হলো?

ফরিদা আখতার: এ বিষয়ে বিতর্কের বড় কারণ ছিল মানুষের মধ্যে কিছু বিভ্রান্তি। চারটি প্রশ্ন থাকায় অনেকে বুঝতে পারেননি, একটি প্রশ্নে দ্বিমত থাকলে কীভাবে ভোট দেবেন। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থানও সবসময় স্পষ্ট ছিল না। বিশেষ করে বিএনপি একসময় ‘না’ ভোট, পরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের কথা বলায় তাদের সমর্থকদের মধ্যেও দ্বিধা তৈরি হয়। তারপরও মানুষ সংস্কারের প্রত্যাশা থেকেই ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছে। আমরা উপদেষ্টারা বিভিন্ন জেলায় গিয়ে শুধু ‘হ্যাঁ’ ভোটের অর্থ কী, সেটি ব্যাখ্যা করেছি। কাউকে ‘না’ ভোট না দিতে বলিনি। 

খবরের কাগজ: ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বিতর্ক নিয়ে অনেক বিতর্ক চলছে। সেই ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন? আপনি কি ছিলেন?

ফরিদা আখতার: আমি সেই বৈঠকের অংশ ছিলাম না। তবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ একটি পরিচিত ধারণা। আমাদের সরকারে আনুষ্ঠানিকভাবে এ নামে কোনো কাঠামো ছিল না। প্রতি বৃহস্পতিবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক করতাম এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সেখানেই নেওয়া হতো। এর বাইরে সপ্তাহের আরেকটি দিনে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন আলাদাভাবে বৈঠক করতেন। তবে এটাকে অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মূল সিদ্ধান্তগুলো উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকেই হয়েছে। হয়তো প্রধান উপদেষ্টার প্রয়োজন বা বাস্তবতার কারণেই এ ধরনের বৈঠক হয়েছে। এ নিয়ে অতিরিক্ত বিতর্ক তৈরি করা ঠিক নয়। 


খবরের কাগজ: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখেন, এ বিষয়ে আপনার অবস্থান কী ছিল?

ফরিদা আখতার: একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি বলব—যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি যেটা হয়েছে, সেটা ক্ষতিকর। এতে জনগণের স্বার্থ রক্ষা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র এবং ট্রাম্পকে তো আমরা জানি। ট্রাম্প যেমন ইরানে বোমা মারতে পারে অহেতুক, এই চুক্তি এ দেশের অর্থনীতি ধ্বংসের বোমা মারার মতো সেরকমই এক ঘটনা।  

বিশেষ করে মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য আমদানির বিষয়টি আমাদের দেশীয় খামারিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা এবং জিএমও খাদ্য ব্যবহারের বিষয়েও আমার উদ্বেগ রয়েছে। এ বিষয়ে আমার মন্ত্রণালয় থেকে আপত্তি জানিয়েছিলাম। উপদেষ্টা থাকাকালে ক্যাবিনেটেও আমি এই চুক্তির বিরোধিতা করেছি এবং শেষ দিন পর্যন্ত আপত্তি জানিয়েছি, বলেছি অন্তত চুক্তির এই অংশগুলো যেন বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। 

বিরোধিতার আরও একটি কারণ যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পভিত্তিক পশুপালন ব্যবস্থা আমাদের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা জেনেটিক্যালি মডিফায়েড কর্ন ও সয়াবিন ব্যবহার করে। সেই মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্য বাংলাদেশের বাজারে অবাধে ঢুকলে স্থানীয় খামারিরা বড় ক্ষতির মুখে পড়বেন। সস্তা মাংস বাজারে এলে আমাদের লাখ লাখ গরু-ছাগল পালনকারী পরিবার ধসে পড়তে পারে। এটি শুধু প্রাণিসম্পদ নয়, কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, গার্মেন্টস—সব খাতেই দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।


খবরের কাগজ: এত বিরোধিতার পরও ভোটের মাত্র তিন দিন আগে সরকার এই চুক্তি করল। এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো কি জানত?

ফরিদা আখতার: আমাদের জানানো হয়েছিল বিএনপি ও জামায়াতসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। এ বিষয়টি আমি আগেও বলেছি। তবে এত বড় একটি চুক্তি সংসদের বাইরে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। আসলে সে সময় পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, সরকার মনে করেছিল, চুক্তি না করে উপায় নেই। আমি এখনো মনে করি, এই চুক্তির জনস্বার্থবিরোধী গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত ছিল। জনগণেরও মতামত নেওয়া উচিত ছিল। সম্প্রতি এমপি রুমিন ফারহানা সেই প্রস্তাব সংসদে দিয়েও ছিলেন। সেটাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। আমার মতে, এখনো সময় ফুরিয়ে যায়নি। এই চুক্তি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হওয়া উচিত। সরকারের পাশাপাশি আমাদের যার যতটুকু সাধ্য আছে, এই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে কথা বলা দরকার।

খবরের কাগজ: বর্তমান সরকারের যিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তিনি তো আগের সরকারের আমলে নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন। এই সরকারে তার অবস্থানকে আপনি কতটা যৌক্তিক মনে করেন?

ফরিদা আখতার: ব্যক্তিগতভাবে আমি এ সিদ্ধান্তের পেছনের যুক্তি বা প্রয়োজনীয়তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাইনি। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও ব্যাখ্যার সুযোগ রয়েছে বলে আমি মনে করি। কারণ একটি নির্বাচিত সরকারের ক্ষেত্রে সাধারণত নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্য থেকেই মন্ত্রী নির্বাচন করা হয়। সেই জায়গা থেকে দেখলে একজন সাবেক উপদেষ্টাকে সরকার গঠনের প্রথম দিনেই মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি একটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করেছে। যদি পরে টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে দায়িত্ব দেওয়া হতো, তাহলে বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যেত। কিন্তু শুরু থেকেই তাকে মন্ত্রিসভায় নেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক চর্চায় এক ধরনের নতুন সংযোজন; যে ঘটনার রাজনৈতিক ব্যাখ্যা এখনো অস্পষ্ট।

খবরের কাগজ: মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের একজন মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আপনি সুপরিচিত। কিন্তু আপনার সরকারের সময় বঙ্গবন্ধুর ৩২ নম্বরের বাড়িসহ সারা দেশে অসংখ্য মুক্তিযুদ্ধের নামফলক, স্মৃতিসৌধ ও স্মারক ধ্বংস করা হয়েছে। জাতীয় চার নেতা ও সাত বীরশ্রেষ্ঠসহ মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হয়েছে। এসব ঘটনায় এখন আপনার অনুভূতি কী?

ফরিদা আখতার: প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই—মুক্তিযুদ্ধ কোনো ব্যক্তি, পরিবার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের যুদ্ধ। আমরা সবসময় মুক্তিযুদ্ধকে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই দেখেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে একটি দলীয় ও পারিবারিক বয়ানে সীমাবদ্ধ করার চেষ্টা হয়েছে, যা মানুষের মধ্যে এক ধরনের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। আমি মনে করি, এই অতিরিক্ত দলীয়করণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। 

আমি স্পষ্টভাবে বলতে চাই, কোনো স্মৃতিসৌধ, নামফলক বা ঐতিহাসিক স্থাপনা ধ্বংস কিংবা মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মানকে আমি সমর্থন করি না। এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক এবং উদ্বেগের। জনগণের আবেগ ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কিছু ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু সেগুলোকে মুক্তিযুদ্ধবিরোধিতা হিসেবে দেখার আগে সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করা প্রয়োজন। 

অন্তর্বর্তী সরকার কখনোই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেনি কিংবা ২০২৪ সালের ঘটনাকে তার বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টাও করেনি। বরং আমরা বিশ্বাস করি, ২০২৪-এর আন্দোলনও মুক্তিযুদ্ধের গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, জাতীয় চার নেতা কিংবা বীরশ্রেষ্ঠদের অবদান বাংলাদেশের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ—এসব নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। তবে ইতিহাসকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার না করে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।

খবরের কাগজ: আপনার পরিবার সুফিবাদের অনুসারী। অথচ আপনি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে দেশের বিভিন্ন মাজার এবং সুফি-সাধকদের ওপর নৃশংস হামলা, নির্যাতন, এমনকি কাউকে কাউকে নির্যাতনের পর পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছে। নৃশংস এসব ঘটনায় আপনার কোনো দুঃখবোধ আছে কী?

ফরিদা আখতার: অবশ্যই আছে। মাজার, সুফি-সাধক কিংবা ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর যেকোনো হামলা অত্যন্ত দুঃখজনক এবং নিন্দনীয়। আমার পরিবারের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পটভূমি যেমনই হোক না কেন, এ বিষয়টি ব্যক্তিগত নয়; এটি জাতীয় ও মানবিক প্রশ্ন। সরকার কখনোই মাজার ভাঙচুর বা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতাকে সমর্থন করেনি। এ ধরনের ঘটনা নিয়ে একাধিকবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, নিন্দা জানানো হয়েছে এবং যেখানে সম্ভব সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এটাও সত্য যে, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সবসময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী ও উগ্র গোষ্ঠী পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে, যার ফলেও কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।

খবরের কাগজ: সে সময় শিল্প-সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় সহাবস্থানের ওপর আঘাত এসেছে। এসব ঘটনা প্রতিরোধে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। আপনার পর্যবেক্ষণ জানতে চাই? 

ফরিদা আখতার: এসব ঘটনা নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক এবং দুঃখজনক। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যথিত করেছে। তবে আমি মনে করি না যে সরকার এসব ঘটনার প্রতি উদাসীন ছিল বা এগুলোকে প্রশ্রয় দিয়েছে। বিভিন্ন ঘটনায় সরকারের পক্ষ থেকে আমরা নিন্দা জানিয়েছি, ক্যাবিনেটে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি এবং যেখানে সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ঘটনা প্রতিরোধ করা সব সময় সম্ভব হয়নি। বিভিন্ন উগ্র ও স্বার্থান্বেষী শক্তি পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করেছে। তারপরও আমি মনে করি, এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরও কার্যকর ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন ছিল। আশা করি ভবিষ্যতে সে বিষয়ে আরও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

খবরের কাগজ: তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের বিগত তিন মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ফরিদা আখতার: বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় অনভিজ্ঞ নয়। তবে বর্তমান বিএনপি আগের বিএনপির মতো নয় এবং বেগম খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি দলটির জন্য বড় ঘাটতি। পররাষ্ট্র ও জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে দলের অবস্থান আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। তারেক রহমান কিছু জনবান্ধব উদ্যোগ নিয়েছেন, যা প্রশংসনীয়। তবে কেবল জনতুষ্টিমূলক পদক্ষেপ নয়, রাষ্ট্রক্ষমতা ও জনগণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থের প্রশ্নে আরও দৃঢ় ও কৌশলী নেতৃত্ব প্রয়োজন।


খবরের কাগজ: সারা দেশে নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা বেড়েই চলেছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বন্ধে সরকারের প্রতি পরামর্শ কী?

ফরিদা আখতার: নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দেশের গভীর সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতন একটি সামাজিক বিকৃতি, যা মোকাবিলায় রাষ্ট্র ও সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। কিছু নৃশংস ঘটনায় সরকারের দ্রুত বিচার উদ্যোগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই যথেষ্ট নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে ধর্ষণ ও শিশু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এসব অনাচার প্রতিরোধে রাষ্ট্রকে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা ও অপরাধের জন্য ভয় সৃষ্টি করতে হবে। মাদক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে নিরাপদ করা, সামাজিক নজরদারি ব্যবস্থা জোরদার করা এবং পরিবার ও সমাজে নৈতিক শিক্ষা বাড়ানো জরুরি। 

খবরের কাগজ: কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা ও স্থানীয় উৎপাদন নীতি নিয়ে আপনার মতামত কী?

ফরিদা আখতার: বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তার ভিত্তি হওয়া উচিত স্থানীয় উৎপাদন, কৃষকের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং খাদ্যে স্বনির্ভরতা। বিদেশি নির্ভরতা বাড়িয়ে দেশীয় কৃষি ও উৎপাদন ব্যবস্থা দুর্বল করা উচিত নয়; কৃষকবান্ধব ও টেকসই নীতিই হওয়া উচিত রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার।

খবরের কাগজ: অন্তর্বর্তী সরকারের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, তাদের ১৮ মাসের শাসনামল নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

ফরিদা আখতার: আমাদের অবশ্যই কিছু অপ্রাপ্তি আছে। সবকিছু শেষ করতে পারিনি। কারণ অত্যন্ত জটিল ও সংকটপূর্ণ সময়ে আমরা দায়িত্ব নিয়েছিলাম। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সরকার কাজ করেছে। সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব না হলেও উপদেষ্টারা আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করেছেন। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে পারি, কোনো উপদেষ্টা চেষ্টার ত্রুটি করেননি। 

খবরের কাগজ: সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আপনারা কতটা পূরণ করতে পেরেছেন?
ফরিদা আখতার: সেটা পরিমাপ করা অত্যন্ত কঠিন। সীমিত সময় ও বাস্তবতার মধ্যে যতটুকু সম্ভব সংস্কারমূলক কাজ করা হয়েছে। ফলে সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনেক ইতিবাচক সংস্কারের ভিত্তি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের উচিত, অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক সংস্কারগুলো বাতিল না করে সংরক্ষণ করা। প্রয়োজনে আরও উন্নত করে দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে নেওয়া।

খবরের কাগজ: খবরের কাগজের পাঠকদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?

ফরিদা আখতার: খবরের কাগজের পাঠক ও দর্শকদের ধন্যবাদ জানাই। আমি চাই, আপনারা ইতিবাচক কাজের মূল্যায়ন করবেন এবং একই সঙ্গে গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। গণতন্ত্রের জন্য এটিই সবচেয়ে প্রয়োজন।

সাক্ষাৎকারে রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বাজেটে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নসহ ১০ বিষয়েগুরুত্ব দেওয়া হবে

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
আপডেট: ১১ জুন ২০২৬, ০৯:০০ এএম
বাজেটে অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়নসহ ১০ বিষয়েগুরুত্ব দেওয়া হবে
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। ছবি: খবরের কাগজ

আজ ঘোষিত হবে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে দৈনিক খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ভারপ্রাপ্ত বিজনেস এডিটর ফারজানা লাবনী  

খবরের কাগজ: নতুন সরকারের প্রথম বাজেটে কোন কোন বিষয়ে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু বিষয়ের ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সে বিষয়গুলো বলার আগে তিনটি জিনিস উল্লেখ না করলেই নয়। প্রথমত: আমরা কোন পরিস্থিতিতে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি; দ্বিতীয়ত: ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এবং তৃতীয়ত: বর্তমানে সাধারণ জনগণের দৈনন্দিন বাস্তবতা। মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে, উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের পরিবর্তে অন্যান্য ব্যবসার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ক্ষয়িষ্ণু দশা। আমরা দায়িত্ব নেওয়ার ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। আমাদের তেল-গ্যাস-সারের বৃহদাংশ আমদানি করতে হয় মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি দিয়ে। একটা উদাহরণ দিলেই বোঝা যাবে পরিস্থিতিটা। যে ডিজেলের দাম ছিল ৮৮ মার্কিন ডলার, যুদ্ধ শুরুর পর সেটা দাঁড়াল ২৬৪ মার্কিন ডলারে। এলএনজির দাম হয়ে গেল দ্বিগুণেরও বেশি। 

একটা ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী ও দুর্বল অর্থনীতির মধ্যে বসবাসরত সাধারণ জনগণের ওপর যখন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাত এসে পড়ে, সেটি তাদের জীবনকে আরও দুর্বিষহ করে তোলে। তবে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার যথাসম্ভব চেষ্টা করছে জ্বালানির মূল্য মানুষের ধরাছোঁয়ার মধ্যে রাখার। এজন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে সবচেয়ে কম।

এবার আসি বাজেটের বিষয়ে: দশটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিয়ে আমরা বাজেট প্রণয়ন করছি। আমরা ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে অর্থনীতির মূলধারায় নিয়ে আসব। এ বিষয়েও বাজেটে আলোকপাত করা হবে। 

খবরের কাগজ: মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতি চাপে আছে। বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠতে বাজেটে কী থাকছে? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমাদের অর্থনীতির সমস্যাগুলো একদিনে তৈরি হয়নি, যদিও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ নতুন। এই যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত সমস্যাগুলো অর্থনীতির পুরোনো দুর্বলতাগুলোকে আরও সংকটাপন্ন করেছে। আমরা মনে করি, এসবের সমাধানও করতে হবে, তবে সময় নিয়ে। আমি আগেই বলেছি অর্থনীতির সমস্যা এবং বর্তমান মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং জনগণের দুর্দশা সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণভাবে অবগত। এ কারণে আমরা অত্যন্ত স্বল্পমেয়াদে পরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ করেছি। বর্তমান চলমান সংকট মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করার পাশাপাশি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তার আওতা বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া, জনগণের যাতে অসুবিধা না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জ্বালানির মূল্য সামান্য হারে সমন্বয় করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন ও মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যাদির ওপর কর-শুল্কের বোঝা ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হবে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশকিছু পণ্য যেমন–কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর কর হ্রাস করা হবে। 

খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে করমুক্ত আয়সীমায় কি পরিবর্তন হবে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: করমুক্ত আয়সীমা ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করা হবে।

খবরের কাগজ: রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অনেক বাড়ানো হয়েছে। চলতি অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকার বেশি। আগামীতে এত বড় অঙ্কের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে কী কৌশল গ্রহণ করেছেন? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: সরকার এ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। রাজস্ব খাতে গভীর ও বিস্তৃত সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল বেস্ট প্র্যাকটিস অনুসরণ করে রাজস্ব নীতি ও প্রশাসনকে দুটি ভাগে বিভক্ত করা হবে। শুধু জনগণের ওপর করের বোঝা চাপিয়ে নয় বরং একটি ন্যায্য, পূর্বানুমানযোগ্য, প্রযুক্তিনির্ভর ও সর্বজনীন করব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে বিনিয়োগ-উৎপাদন-কর্মসংস্থান-ভোগ-কর চক্রের মাধ্যমে সরকারের রাজস্ব আদায়ে গতি আনার পরিকল্পনা রয়েছে। 

খবরের কাগজ: আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারে সরকার কী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: এ বিষয়ে সরকারের নীতি সোজাসাপ্টা। বিনিয়ন্ত্রণ এবং Ease of doing business বা ব্যবসা পরিচালনার সহজ সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে সরকার বদ্ধপরিকর এবং এটি করতে ব্যাপক খাতভিত্তিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষতঃ বিনিয়োগ ও রাজস্ব খাতের বিভিন্ন স্তরে ব্যবসায়ী এবং বিনিয়োগকারীদের ভোগান্তি দূর করতে এবং ব্যবসার ব্যয় হ্রাস করার জন্য ওয়ান স্টপ সার্ভিস প্রতিষ্ঠা, নিরাপত্তা ছাড়পত্রসহ বিভিন্ন ছাড়পত্র এবং অনুমতি প্রদানের সময় বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। এ সময়ের ভেতর কোনো সরকারি দপ্তর ছাড়পত্র বা অনুমতি দিতে ব্যর্থ হলে আবেদনকারী স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনুমতি পেয়ে যাবেন; একই দলিল বারবার দিতে হবে না; একই দপ্তর হতে সব অনুমতি বা ছাড়পত্র পাওয়ারও ব্যবস্থা করা হবে। রাজস্ব খাতে ব্যবসায়ীদের অনলাইন রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা করা, অডিটের জন্য কর মামলা নির্বাচনে অটোমেশন ইত্যাদিসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে প্রস্তাব করা হবে।  

খবরের কাগজ: বিএনপির নির্বাচনি অঙ্গীকারের কতটা আগামী বাজেটে বাস্তবায়ন হবে? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: বিএনপির যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, সেটি স্বল্প, মধ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়ন হবে। আমরা যে অর্থনীতি পেয়েছি, দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে এই অর্থনীতি প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সময় দিতে হবে। এটি এত সহজে হবে না। আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকার এবং তার থেকে তৈরি পরিকল্পনা যা আমরা বাজেটে প্রতিফলিত করব, তা ব্যাপক এবং গভীর। এর মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কথা বলেছি, সেটি হলো বিনিয়ন্ত্রণ। এটি আপনার এই বাজেটেই দেখতে পাবেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে আমাদের যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়নের রূপরেখাও এই বাজেটে পাওয়া যাবে। ক্রিয়েটিভ ইকোনমির একটি বাস্তবসম্মত বাস্তবায়ন পরিকল্পনাও এই বাজেটের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হবে। সুতরাং, আমাদের নির্বাচনি অঙ্গীকারের স্বল্পমেয়াদি বিষয়গুলো, যা এক বছরে বাস্তবায়নের কথা, সেগুলো ইতোমধ্যেই বেশকিছু আমরা করে ফেলেছি, যেমন: ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, কৃষিঋণ মওকুফ ইত্যাদি। আমাদের ট্র্যাকরেকর্ড বলে বাকিগুলোও আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ইনশাআল্লাহ করে ফেলব।

খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে শিক্ষা খাতে কতটা গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: এই বাজেটে শিক্ষা হবে সর্বাধিক গুরুত্বপ্রাপ্ত খাত। শিক্ষা হবে জ্ঞান, দক্ষতা, নৈতিকতা, উদ্ভাবনী ও আনন্দময়। এর মানোন্নয়নে বিএনপি সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ বছর শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হবে জিডিপির ২ শতাংশ, যা গত বছর ছিল ১.৩৯ শতাংশ। টাকার অঙ্কে এ খাতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৬ কোটি টাকা, যা গত অর্থবছরে ছিল ৮৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকা।

খবরের কাগজ: আগামী বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে সরকার কতটা গুরুত্ব বাড়িয়েছে? 

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আগামী পাঁচ বছরে আমরা স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ধাপে ধাপে বৃদ্ধি করে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করব। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে জিডিপির ১.০১ শতাংশ। আমরা স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে চিকিৎসাকেন্দ্রিক ধারা থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধকেন্দ্রিক ধারায় যেতে চাই। আমরা স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকে ব্যয় না বলে বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম বিনিয়োগ হিসেবে দেখছি।

খবরের কাগজ: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারে সরকারের নীতি কী? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার কোন বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে? বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে সরকার কী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে?

রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: সাধারণ মানুষের জন্য ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে। সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার অধীনে প্রান্তিক ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তার আওতা বৃদ্ধি করা হবে। এ ছাড়া জনগণের যাতে অসুবিধা না হয়, সেদিকে লক্ষ রেখে সরকারি ভর্তুকির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়ে জ্বালানির মূল্য সামান্য হারে সমন্বয় করা হয়েছে। উল্লেখ্য, দরিদ্র জনগোষ্ঠীসহ নিম্ন-মধ্যবিত্তকে স্বস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্যে ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যদ্রব্যাদির ওপর কর-শুল্কের বোঝা ব্যাপকভাবে হ্রাস করা হবে। এ ছাড়া, স্বাস্থ্যবিষয়ক বেশকিছু পণ্য যেমন–কিডনি ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর কর হ্রাস করা হবে।

সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবির মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৩৩ এএম
মুরগির বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারি নজরদারি জরুরি
চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির

দেশের পোলট্রি খাতকে স্থিতিশীল রাখতে মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার (DOC) দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর মনিটরিং অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। এমনটাই জানিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের (CVASU) পোলট্রি রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টারের পরিচালক ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির। তার সঙ্গে কথা বলেছেন চট্টগ্রাম ব্যুরোপ্রধান ইফতেখারুল ইসলাম।

খবরের কাগজ: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার উৎপাদন খরচ কত?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এক দিন বয়সী ব্রয়লার বাচ্চা উৎপাদনের খরচ সাধারণত ৩০ টাকার বেশি। লেয়ার বাচ্চার ক্ষেত্রে তা ৩৫ টাকার ওপরে। তবে ফিডের দাম, প্যারেন্ট স্টকের মান এবং হ্যাচারির ব্যবস্থাপনার ওপর ভিত্তি করে এই খরচ কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

খবরের কাগজ: খামারিদের অভিযোগ, দেশের পোলট্রি শিল্পের নিয়ন্ত্রণ বড় কোম্পানির হাতে চলে গেছে। এর বাস্তবতা কতটুকু?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: খামারিদের এই অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বর্তমানে ফিডের দাম অনেক বেড়েছে, ভ্যাকসিনের খরচও রয়েছে। অন্যদিকে ডিম উৎপাদনের গড় খরচ এখন প্রায় ১০–১২ টাকার মধ্যে হলেও অনেক ক্ষেত্রে খামারিদের কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। বাজারে তাদের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা প্রায়ই উৎপাদন খরচের নিচে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ফলে ছোট খামারিদের টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।

খবরের কাগজ: পোলট্রি খাতের প্রধান সমস্যাগুলো কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: এই খাত এখনো অনেকাংশে আমদানিনির্ভর। ডলারের দাম বাড়ায় ভুট্টা, সয়াবিনসহ খাদ্য উপাদান আমদানিতে ব্যয় বেড়েছে। পাশাপাশি বাজারে মাঝে মাঝে কৃত্রিম সংকটও তৈরি করা হয়। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব বিপণনব্যবস্থা থাকায় তারা সহজে পণ্য বিক্রি করতে পারে, কিন্তু ছোট খামারিরা সরাসরি বাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। এটিই তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

খবরের কাগজ: দেশের অর্থনীতিতে পোলট্রিশিল্পের ভূমিকা কীভাবে দেখেন?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: ঈদুল আজহার আগে-পরে প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ডিম ও মুরগির চাহিদা কিছুটা কম থাকে, তবে বাকি সময়ে বাজার স্থিতিশীল থাকে। পোলট্রি খাত সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। গরু বা খাসির মাংসের তুলনায় মুরগির মাংস অনেক সস্তা, ফলে সাধারণ মানুষের পুষ্টি চাহিদা পূরণে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। গ্রামাঞ্চলে পোলট্রি খামার স্থাপন করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খবরের কাগজ: এ ক্ষেত্রে সরকারের করণীয় কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির এক দিন বয়সী বাচ্চার দাম নির্ধারণে সরকারের কার্যকর নজরদারি থাকা জরুরি। উৎপাদন খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি গ্রহণযোগ্য মূল্যসীমা নির্ধারণ করা গেলে বাজারে অস্থিরতা কমবে। একই সঙ্গে বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো গোষ্ঠী এককভাবে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে। এতে ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন এবং ভোক্তারাও ন্যায্যমূল্যে পণ্য পাবেন।

খবরের কাগজ: অনেকেই বলেন, বায়োসিকিউরিটি ও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে খামারিরা লোকসানে পড়েন–এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: বিদেশি জাতের মুরগি তুলনামূলকভাবে সংবেদনশীল। তাই খামার শুরু করার আগে এ বিষয়ে যথাযথ প্রশিক্ষণ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা অর্জনের পর খামার পরিচালনা করলে ঝুঁকি অনেক কমে যায়। বড় কোম্পানি, সরকারি প্রাণিসম্পদ দপ্তর এবং খামারিদের সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে পুরো খাতই উপকৃত হবে।

খবরের কাগজ: মুরগির খাদ্যের আমদানি-নির্ভরতা কমাতে কী করা যেতে পারে?
ড. এ কে এম হুমায়ুন কবির: মুরগির খাদ্যের প্রধান উপাদান ভুট্টা। দেশে ভুট্টা উৎপাদনের সম্ভাবনা অনেক বেশি। অনেক কৃষক ইতোমধ্যে ভুট্টা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন, কারণ এর উৎপাদন খরচ আমদানির তুলনায় কম। তবে বাজার নিশ্চয়তা দিলে আরও বেশি কৃষক এই খাতে আসবেন। এতে করে আমদানি-নির্ভরতা কমবে এবং উৎপাদন ব্যয়ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।