মো. আমানুল আলম বনফুল অ্যান্ড কোম্পানির সঙ্গে আছেন প্রায় তিন যুগ ধরে। বর্তমানে তিনি এই গ্রুপের জেনারেল ম্যানেজার। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী সেমাই ও মিষ্টান্ন তৈরির কোম্পানি বনফুলের সেমাইয়ের নানা দিক নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান ইফতেখারুল ইসলাম
খবরের কাগজ: কখন এবং কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বনফুলের যাত্রা শুরু হয়?
আমানুল আলম: একসময় ঈদ উৎসবে মানুষ বাংলা সেমাই খেতেন। স্থানীয়ভাবে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে এই সেমাই তৈরি হতো। কিন্তু সেভাবে তৈরি করা সেমাইয়ের বেশির ভাগই ছিল অস্বাস্থ্যকর। খাদ্য জগতের মানোন্নয়ন এবং ক্রেতার কাছে মানসম্পন্ন সেমাই পৌঁছে দেওয়াই ছিল আমাদের মূল লক্ষ্য। তাই বলা যায়, সেমাই ও মিষ্টির জগতে বনফুল বাংলাদেশির পথিকৃৎ। ১৯৮৯ সালে বনফুলের যাত্রা। সময়ের আবর্তে এই খাতকে আরও আধুনিকতার ছোঁয়া আমরা দিতে পেরেছি। আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে বনফুল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শহীদুল ইসলাম গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে ভালো মানের স্বাস্থ্যসম্মত সেমাই পরিবেশন করার ফলে ধীরে ধীরে ক্রেতাদের আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে বনফুল। এখন তো এই শিল্পে আমরা আরও আধুনিক মেশিন ব্যবহার করছি।
খবরের কাগজ: আপনারা কি সারা বছর সেমাই তৈরি করেন?
আমানুল আলম: আমাদের সেমাইয়ের চাহিদা সারা বছর আছে। তাই কম পরিসরে সারা বছর সেমাই তৈরি করি। তবে ঈদের সময় সেমাইয়ের চাহিদা বেড়ে যায়।
খবরের কাগজ: সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক প্রতিষ্ঠান আপনাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এসেছে। তাদের কীভাবে মোকাবিলা করছেন?
আমানুল আলম: আমরা গুণগত মান এবং স্বাস্থ্যসম্মত সেমাই উৎপাদনে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে থাকি। ভালো মানের পণ্য তৈরি করলে অন্য কোম্পানি বাজারে কী নিয়ে আসছে তা নিয়ে আর ভাবতে হয় না। এই নীতি অনুসরণের কারণে বাকিদের নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে না।
খবরের কাগজ: সেমাই শিল্পের বর্তমান পরিস্থিতি কী?
আমানুল আলম: খুব ভালো। সেমাইয়ের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। আমরা চট্টগ্রাম, ঢাকা, কুমিল্লা এবং উত্তরবঙ্গে কারখানা করেছি। বাজার প্রসার হওয়ায় ক্রেতা বেড়েছে। ক্রেতারা ভালো পণ্যের কদর করছেন। সারা দেশে আমাদের পরিবেশক রয়েছে।
খবরের কাগজ: সেমাইয়ের সরবরাহ এবং দাম কি ক্রেতাদের নাগালে আছে?
আমানুল আলম: দাম আমরা সব সময় ক্রেতা সাধারণের নাগালে রাখার চেষ্টা করি। এটা কিন্তু বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ। আমরা কম লাভ করে ক্রেতার মন জয় করার চেষ্টা করি। এই কাজ করতে গিয়ে আমাদের অনেক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়। যেমন কাঁচামালের সংকট অনেক সময় আমাদের বিপাকে ফেলে দেয়। গম আমদানি কমে যায়। অনেক সময় গমের দাম মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে যায়। মাঝে মধ্যে ঘি-এর সংকট হয়। যে কারণে অনেক সময় উৎপাদন খরচ বেড়ে যায়। কিন্তু আমরা তা ক্রেতাকে বুঝতে দিই না।
খবরের কাগজ: এই শিল্পের আরও সমৃদ্ধি অর্জনে সরকারের করণীয় কিছু আছে?
আমানুল আলম: সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কলকারখানা চালানো কঠিন। গ্যাসের অপর্যাপ্ত সরবরাহ উৎপাদন কাজে বিঘ্ন ঘটায়। পর্যাপ্ত গ্যাস পেলে আমরা আরও ভালোভাবে উৎপাদন করতে পারতাম। আর ভ্যাট ট্যাক্সের কথা বলতে গেলে, যদি সরকার তা বাড়ায় তখন আমরা পণ্যের দাম বাড়াতে বাধ্য হই।
খবরের কাগজ: বনফুলকে কি আর কোনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে?
আমানুল আলম: মাঝে মাঝে কিছু অসাধু ব্যক্তি আমাদের ব্র্যান্ড নকল করছে। যা আমাদের বিব্রত অবস্থায় ফেলে। কোনো ক্রেতা একবার নকল সেমাই কিনলে আসল সেমাইয়ের প্রতি তার আগ্রহ হারিয়ে যাবে। আমরা প্রশাসনের সহযোগিতায় নকল ব্র্যান্ড প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। তবে যেসব ক্রেতা আমাদের সেমাই নিয়মিত খান তিনি প্যাকেট ধরলেই বুঝতে পারবেন কোনটি আসল আর কোনটি নকল।
খবরের কাগজ: বনফুল এতদূর এগিয়ে যাওয়ার পেছনে আর কোনো রহস্য আছে?
আমানুল আলম: অবশ্যই আছে। আজ এই প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং প্রচার-প্রসারের ক্ষেত্রে আমাদের চেয়ারম্যান এম এ মোতালেব সিআইপির অবদান অপরিসীম। এই কারখানার মাধ্যমে আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। চেয়ারম্যানের মেধা-শ্রম এবং একাগ্রতার ফল হিসেবে আমরা এতদূর অগ্রসর হতে পেরেছি। পণ্যের মানের ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান সব সময় কঠোর। মান নিয়ে তিনি কখনো আপস করেননি।
খবরের কাগজ: ঈদ উপলক্ষে ক্রেতাদের উদ্দেশে কিছু বলবেন?
আমানুল আলম: আমরা তিন যুগ ধরে মানসম্পন্ন পণ্য সরবরাহ করে ক্রেতাদের চাহিদা মিটিয়ে আসছি। এত দীর্ঘ সময় ধরে ক্রেতা সাধারণ আমাদের ওপর আস্থা রাখার জন্য তাদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আশা করছি, ভবিষ্যতেও তারা আমাদের ওপর আস্থা রাখবেন। আমরা তাদের কাছে মানসম্পন্ন পণ্য পৌঁছে দেব।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ
আমানুল আলম: আপনাকেও ধন্যবাদ