দেখার চোখ থাকলে সবই সুন্দর। প্রকৃতির রূপ-লাবণ্যের নির্যাস পেতে হলে চাই অন্তরদৃষ্টি। কবিগুরু এজন্যই লিখেছিলেন, ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া, ঘর হতে দুই পা ফেলিয়া, একটি ধানের শিষের ওপরে একটি শিশিরবিন্দু।’ কবিতার কথাগুলো আমাদের দে-ছুট ভ্রমণ সংঘের ভ্রমণ বন্ধুরা প্রচুর ঘোরাঘুরির পরও এখনো কিছুই দেখতে পারিনি এই ভেবে, প্রতিনিয়ত অনুভব করার করার জন্য ছুটে চলে যাই নয়নাভিরাম কোনো প্রকৃতির সান্নিধ্যে। সেই টানেই হুট করেই আমি আর বন্ধু সাঈদ দে-ছুট। এক বাইকে দুজন ছুটছি ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে। ফিটনেসবিহীন দানবদের ‘অটোরিকশা’ হুংকার ছাড়া মোটামুটি বেশ নিরাপদেই ছুটে চলছি।
যেতে যেতে ময়মনসিংহ ব্রেক। ব্রিজের গোড়ায় থাকা ঝুপড়ি হোটেলে বসে গরম গরম চা, পরোটা ও ডিম ভাজা পেটে পুরলাম। এরপর সোজা নেত্রকোনা। শহরের বড়বাজার এলাকায় থাকা হাজী আশ্রাফ আলীর মেহমানখানায় গাট্টিবোচকা রেখেইে চলে যাই বালিশ খেতে। পাঠক ভ্রু কুচকাবেন না প্লিজ। এই বালিশ কিন্তু সেই কোল বালিশ নয়। এটা হলো নেত্রকোনার বিখ্যাত বালিশ মিষ্টি। সাইজ যেমন বালিশের মতো। খেতেও দারুণ স্বাদ। ইতোমধ্যে স্থানীয় যুবক ভরা জোছনার আলো দেখানোর জন্য শহর থেকে প্রায় দুই কিলো দূরে কংশ নদীর তীর বড়াইল ব্রিজে নিয়ে গেল। জোছনার আলো পুরোপুরি উপভোগ করতে পারিনি।

তবে আসমানে সেদিন কালো মেঘের ঘনঘটা আর ভরা চান্দের যৌবন ঠেলা আলোর খুনসুটি চরমভাবে জমেছিল। কংশ নদী ও এর দুকূলও বেশ চমৎকার। খ্যাতিমান লেখক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ স্যারও কংশ নদী নিয়ে অনেক উচ্ছ্বসিত ছিলেন। রাত প্রায় দেড়টা। যাই এবার ঘুমাতে মেহমানখানায়। সুন্দর পরিপাটি বিছানায় শুয়ে পড়ি। কিন্তু! কিন্তু কী? নাহ সারা রাতেও চোখে ঘুম এল না। ফজর পড়ে নেত্রকোনা শহরে হাঁটলাম। এরপর গয়নাথের নাশতা সেরে ছুটলাম পাতলাবন।
জেলা সদর থেকে পাতলাবন কয়েকটি পথেই যাওয়া যায়। তাই আমরা তুলনামূলক ভালো সড়ক ঠাকরুকোনা হয়ে এগোতে থাকলাম। যেতে যেতে চাঁনপুর ব্রেক। ওয়াও! অবিশ্বাস্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চাঁনপুর গ্রামটাকে ঘিরে রেখেছে। লোভ সামলাতে না পেরে পথের পাশেই থাকা পুকুরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মোটরবাইকে ভ্রমণের মজাটা ঠিক এই জায়গাতেই। হুটহাট যখন খুশি তখন ব্রেক মেরে ঘোরাঘুরির আনন্দের মাত্রা বাড়ানো কমানো যায়। ইচ্ছামতো ডুবাডুবি করে আবারও ছুটে চলা। কয়েক কিলো গিয়েই পেটের টানে পাঁচগাও ব্রেক। ক্ষুধা পেটে ছালাদিয়া রেস্তোরাঁর (নিম্নমানের খাবার হোটেল) ভাত-তরকারি সবই ভালো লাগল।
খেয়েদেয়ে আবার যাত্রা শুরু। যেতে যেতে পড়ন্ত বিকেলে ছবির মতো সুন্দর ইসলামপুর গ্রাম পেরিয়ে মহাদেও নদীর তীরে পৌঁছাই। আরে এ তো দেখছি কোনো নদী নয়। যেন কোন এক স্বপ্নপুরি থেকে পানীয় ধারা প্রবহমান। বিশ্বাস করুন আর না করুন। আমি নিজ চক্ষু দিয়া দেখিয়াই লিখিয়াছি। ভারতের মেঘালয় পর্বতমালা থেকে মহাদেও নদীর উৎপত্তি। আমাদের দেশে এর দৈর্ঘ প্রায় ১০ কিলোমিটার। নদীর পানি সীমান্তের ওপার থেকে পাথর ও কয়লা ভাসিয়ে আনে। মহাদেও নদী অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বহন করে আছে। নদীর প্রেমে মজে যাই। হুঁশ ফিরে যখন মনে পড়ে আজ সন্ধ্যায় দেখা যাবে ব্লাডমুন।
তাই আর কালক্ষেপণ না করে মোটরবাইক নিয়ে, ছোট্ট তরীতে নদী পার হয়ে ওপারে বরুয়াকোনা বাজারে গিয়ে উঠি। জনৈক দোকানির জিম্মায় ব্যাগ রেখে আবারও ছুটে যাই নদী তীরে। ততক্ষণে পুরো আকাশ কালো মেঘে ঢেকে গেছে। ইতোমধ্যে ব্লাডমুন দেখার প্রচেষ্টা। আচমকা দমকা হাওয়ার পরপরই ঝুম বৃষ্টি। আগে থেকেই ম্যাকানিজম করে রাখা গ্রামপাড়া নামক গ্রামে, মুহাম্মদ আলীর বাড়িতে রাত যাপনের জন্য আশ্রয় নিলাম। দেশি মুরগির ঝোল দিয়ে লাল চালের ভাত খেতে খেতে রাত ১১টা। লোডশেডিংয়ের গ্যাঁড়াকলে পড়ে ঘর থেকে উঠানে এসে দেখি বিদ্যুৎহীন অন্ধকার বাড়ি পূর্ণিমার আলোয় পুরোই ফকফকা।
এরকমটা সুপার মুনের প্রভাব। লোভ সামলাতে না পেরে গ্রামের মেঠোপথে হাঁটি। চকচক চাঁদের আলোয় গাছের পাতাগুলো যেন হাসে। সে এক অপার্থিব সুখ। বলে লিখে বোঝানো যাবে না। যাই এবার ঘুমাতে। ফজরের সময় উঠেই পাতলাবন যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। গ্রামের দুজনকে পথ প্রদর্শকের সঙ্গী করে বের হয়ে যাই। এবার বাইকে নয়। ইচ্ছাকরেই হাঁটা শুরু করি। শান্ত নিরিবিলি ছায়া ঘেরা গ্রামের মেঠো পথ ধরে এগোতে থাকি। পাতলাবনের দিকে যতই আগাই ততই বিলিয়ে দেওয়া প্রকৃতির মুগ্ধদা আচ্ছন্ন করতে থাকে। গাড়ো-হাজং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের হাড়ভাঙা পরিশ্রম চোখে পড়ে। ভালো লাগে তাদের হাসি।
ভালো লাগলেও এখন আর কিছু করার নেই। কারণ বয়স তো আর কুড়ির ঘরে নাই। হাঁটতে হাঁটতে পাতলাবন গ্রামের জিরো পয়েন্ট। উঁচু উঁচু টিলার ওপর উপজাতিদের খুব সুন্দর পরিপাটি ঘর। প্রতিটি বাড়ির ঘরের সামনেই ফুলের গাছ। মেঘালয় পর্বতমালার পাদদেশেই ছবির ক্যানভাসের মতো সুন্দর আমাদের পাতলাবন। সীমান্তের ওপারের গ্রামগুলোও দৃষ্টির সীমানায়। বাধা শুধু ছোট্ট ছোট্ট সিমানা পিলার। নিজেদের ভূখণ্ড থেকেই সবুজে মোড়ানো মেঘালয় পাহাড়ের সৌন্দর্য দেখে চন্দ্রডিঙ্গার পথে আগাই। গ্রামপাড়া গ্রামে ফিরে এবার ছুটলাম মোটরবাইকে। তাপপ্রবাহে শরীরের চামড়া পুরে যাওয়ার উপক্রম।
তবুও যেন জীবনে অন্যরকম ভালো লাগার আনন্দ। আধাঘণ্টা চলার পর সুনামগঞ্জ যাওয়ার সড়কে রং ছাতি ইউনিয়নের বাঘবেড় গ্রামে ব্রেক। বাইক রেখে এবার হাঁটা। যতই হাঁটি ততই যেন দৃষ্টির সীমানায় থাকা পাহাড়টা দূরে সরে যায়। প্রায় ২০-২৫ মিনিট হাঁটার পর গাঢ় সবুজ পাহাড়টা প্রায় ধরেই ফেলি। ঝিরির টলটলে পানি জানান দেয় সামনেই ঝর্ণা। বিশাল উঁচু পাহাড়।
যার বুকে ধারণ করে আছে বড়বড় পাথরের বোল্ডার। সেসব পাথরের ফাঁকফোকর দিয়ে এগিয়ে যাই। একটা সময় পেয়ে যাই স্বচ্ছ জলের ক্যাসকেড। দুজনেই সেখানে ইচ্ছামতো তপ্ত দেহটা টলটলে পানিতে ভিজাই। চন্দ্রডিঙ্গার নজরকাড়া বুনো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক কথায় অসাধারণ। তবে পাহাড়টা ভারতের। তাই চন্দ্রডিঙ্গার চূড়ায় না উঠে ফিরতি পথ ধরি।

চলেন যাই: ঢাকা থেকে বাস, ট্রেনযোগে নেত্রকোনা। সেখান থেকে ভাড়ায় খাটা মোটরবাইকেল বা অটোতে নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার রংছাতি ইউনিয়ন ও পাঁচগাওর পথে পথে গল্পের নয়নাভিরাম জায়গাগুলো ঘুরে আসা যাবে।
থাকা-খাওয়া: আরাম-আয়েশে থাকা-খাওয়ার ভাবনা বাদ দিয়ে ‘যেখানে রাইত-সেখানেই কাইত’ এরকম মানসিকতা নিয়ে বের হয়ে যাবেন, দেশের অপ্রচলিত পর্যটন সম্ভাবনাময় প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার জন্য।
/রোদসী

.jpg)