১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহে দুঃসাহসিক কিছু ঘটনা ঘটেছিল। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা আক্রমণ পরিচালনার উদ্দেশ্যে ক্র্যাক প্লাটুন নামে একটি সংগঠন তৈরি হয়েছিল সে সময়। সেই সংগঠনের কয়েকজন যোদ্ধাকে ধরে নিখোঁজ করে ফেলে পাকিস্তানি আর্মি। তাদের আর পাওয়া যায়নি! আজও ইতিহাসে তারা শহিদ। তাদের নিখোঁজ হওয়ার দিনগুলোকে ‘অন্তর্ধান দিবস’ হিসেবে পালন করে তাদের পরিবার। রাষ্ট্র কিছুই করে না! আগস্টকে আমরা বলি ‘নিষ্ঠুরতম’ শোকের মাস। এখানে এই ক্র্যাক প্লাটুনের কয়েকজনের কথা উল্লেখ করছি।
শহিদ বকর
১১ আগস্ট, ১৯৭১। ঢাকা ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে দ্বিতীয় দফায় মারাত্মক বিস্ফোরণ ঘটানোর মূল নায়ক ছিলেন ১৮ বছর বয়সী কৈশোরোত্তীর্ণ এই তরুণ। ক্র্যাকপ্লাটুনের সর্বকনিষ্ঠ গেরিলা মোহাম্মদ আবু বকর। ঢাকা ইন্টারকনে তার সেই দুঃসাহসিক অ্যাকশনের খবর বিশ্বগণমাধ্যমকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল পাকিস্তানি মিলিটারির দম্ভ। পরে ৩০ আগস্ট ভোরে গুলশান-২-এর বাসা থেকে এই দুঃসাহসী যুবককে তুলে নিয়ে যায় পাকিস্তানি আর্মি। নাখালপাড়ার ড্রাম ফ্যাক্টরি সংলগ্ন এমপি হোস্টেলে তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। এর পর থেকে আবু বকরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শহিদ হাফিজ
শহিদ হাফিজ বেহালা বাজাতেন। সেই সূত্রে আলতাফ মাহমুদের সঙ্গে অনেক বছর ধরে তার সখ্য ছিল। হাফিজকে বলা হতো আলতাফ মাহমুদের ছায়াসঙ্গী। একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে গান রচনার সূত্র ধরে গেরিলা অপারেশনেও এই দুজনকে এক সঙ্গে দেখা গেছে। ৩০ আগস্ট পাক সেনাদের হাতে তারা এক সঙ্গে ধরা পড়েন। অত্যাচারের মাত্রা এতই বেশি ছিল যে হাফিজ টর্চার সেলেই ৩১ আগস্ট শহিদ হন।
শহিদ আলতাফ মাহমুদ
৩৭০ নম্বর আউটার সার্কুলার রোডের বাসায় থাকতেন আলতাফ মাহমুদ। একাত্তরের গেরিলাদের জন্য এক দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল তার বাড়িটি। ওই সময় তিনি মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং ঢাকা শহরে কয়েকটি অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফের নির্দেশে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে একটি অপারেশনে আলতাফ মাহমুদ অংশগ্রহণ করেন। গেরিলাদের কাছে প্রচুর বিস্ফোরক ছিল। সেগুলো নিরাপদে রাখার স্থান পাওয়া নিয়ে দেখা দেয় সমস্যা। আলতাফ মাহমুদ নিজ দায়িত্বে সব গোলাবারুদ তার বাসার কাঁঠালগাছের নিচে পুঁতে রাখেন। আগস্টের শেষ সপ্তাহে ক্র্যাক প্ল্যাটুনের সামাদ নামের একজন গেরিলা ধরা পড়েন। পাঞ্জাবি পুলিশ ও পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে প্রচণ্ড নির্যাতিত হয়ে তিনি আলতাফ মাহমুদের বাসার কাঁঠালগাছের নিচে লুকিয়ে রাখা গোলাবারুদের কথা বলে ফেলেন। ৩০ আগস্ট ভোরবেলা আর্মিরা প্রথমে আলতাফ মাহমুদকে ওই ট্রাঙ্কভর্তি অস্ত্রসহ ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
শহিদ আজাদ
১৯৭১ সালের ৩০ আগস্ট। ওই দিন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে ধরা পড়েন ক্র্যাক প্লাটুনের একদল তেজী মুক্তিযোদ্ধা। আজাদ ছিলেন তাদেরই একজন। তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে রাখা হয় রমনা থানায়। আজাদের মা ছেলের সঙ্গে দেখা করে ছেলেকে বলেন, ‘শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনো কিছু স্বীকার করবে না।’
আজাদ মার কাছে ভাত খেতে চান। মা ভাত নিয়ে এসে ছেলেকে আর পাননি! আর কোনোদিন মায়ের বুকে ফিরে আসেননি মুক্তিযোদ্ধা শহিদ আজাদ। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন আজাদের মা। ঠিক ৩০ আগস্টেই মারা যান তিনি! পুরো ১৪ বছর ভাত খাননি তিনি। কেবল একবেলা রুটি খেয়ে থেকেছেন।
শহিদ বদি
বদিউল আলম ঢাকা শহর এবং এর আশেপাশে বেশ কয়েকটি দুর্ধর্ষ অপারেশনে অংশ নেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে বিস্ফোরণ ঘটানো, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে অপারেশন, ২৫ আগস্ট ধানমন্ডির ১৮ ও ২০ নম্বর রোডে অপারেশন। এসব অভিযান এখনো তাদের দুর্ধর্ষ দুঃসাহসিকতার দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
মায়ের আদেশ মেনে বদিউল আলম ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে ঢাকা এবং ঢাকার আশপাশের এলাকায় একের পর এক সফল অপারেশন পরিচালনা করছিলেন। একাত্তরের ২৯ আগস্ট পাক হায়েনারা সেখান থেকে বদিউলকে ধরে নিয়ে যায়। এর পরে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
শহিদ জুয়েল
১৯ আগস্ট সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন অপারেশনের সময় ক্রিকেটার আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল আহত হন। এর পর তাকে মগবাজারে প্রখ্যাত সুরকার আলতাফ মাহমুদের বাসায় চিকিৎসার জন্য আনা হয়। আলবদরের একজন কমান্ডার এই খবর পৌঁছে দেয় স্থানীয় পাকিস্তানি ক্যাম্পে। তার ওপর চালানো হয় অমানুষিক অত্যাচার। যে হাত দিয়ে ব্যাটিং করে প্রতিপক্ষের বোলারদের ওপর চড়াও হতেন জুয়েল, সেই হাতের দুটো আঙুল কেটে ফেলে পাকিস্তানি বাহিনী।
প্রচণ্ড নির্যাতনের মুখে একটা কথাও স্বীকার করেননি তিনি। ৩১ আগস্টের পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হয়, তাকে ৩১ আগস্ট ক্র্যাক প্লাটুনের অন্য যোদ্ধাদের সঙ্গে হত্যা করা হয়। মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য শহিদ জুয়েলকে মরণোত্তর বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত করা হয়।
শহিদ রুমি
সেক্টর-২-এর অধীনে মেলাঘরে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই সেক্টরটির পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন খালেদ মোশাররফ ও রশিদ হায়দার। প্রশিক্ষণ শেষ করে তিনি ঢাকায় ফেরত আসেন এবং ক্র্যাক প্লাটুনে যোগ দেন। রুমী ও তার দলের ঢাকায় আসার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে হামলা করে উড়িয়ে দেওয়া। এ সময় তাকে ঝুঁকিপূর্ণ আক্রমণ পরিচালনা করতে হয়।
১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট তিনি তার বাড়ি থেকে কয়েকজন গেরিলা যোদ্ধার সঙ্গে পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। সঙ্গে ধরা অন্য সদস্যরা ছিলেন আলতাফ মাহমুদ, আবুল বারাক, আজাদ ও জুয়েল। ৩০ আগস্টের পর রুমী ও তার সহযোদ্ধাদের আর পাওয়া যায়নি।