ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ, অভিবাসন সমস্যা নিরসন ও অর্থনীতি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হোয়াইট হাউসে ফিরছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। রিপাবলিকান পার্টি সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করায় এজেন্ডাগুলো বাস্তবায়ন করতে তিনি কংগ্রেসের যথেষ্ট সমর্থন পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, এসব প্রতিশ্রুতি পালনে তিনি কঠোর হতে পারেন।
ট্রাম্প তার বিজয়ী ভাষণে বলেছেন, তিনি একটি সাদাসিধে নীতিতে দেশ পরিচালনা করবেন। সেটি হচ্ছে ‘প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, প্রতিশ্রুতি রাখা হবে। আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি রাখতে যাচ্ছি।’ তিনি কীভাবে তার লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে যাচ্ছেন, তার সামান্য বিবরণও দিয়ে রেখেছেন।
২০২৩ সালে ফক্স নিউজ ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করেছিল, যদি তিনি পুনরায় ক্ষমতায় আসেন, তবে তার রাজনৈতিক বিরোধীদের শায়েস্তা করতে ক্ষমতার অপব্যবহার করবেন কি না। জবাবে তিনি নিজেকে একজন স্বৈরশাসক নন উল্লেখ করে বলেছিলেন, তিনি হোয়াইট হাউসে প্রথম দিন ছাড়া অন্য কোনো দিন সেটি করবেন না।
প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি বিভিন্ন সময় নির্বাচনি প্রচারে যে কাজগুলো করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন-
১. অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যর্পণ
নির্বাচনি প্রচারের সময় একটা কথা ট্রাম্প বেশ জোর গলায় বলেছেন। সেটি হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি অবৈধ অভিবাসীকে তাড়িয়ে দেবেন। এ ছাড়া মেক্সিকো সীমান্তে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শেষ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। নিজের প্রথম মেয়াদে এই প্রাচীর তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন তিনি।
তবে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ে ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গিকে কিছুটা বাঁকা চোখে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। বিবিসিকে তারা বলেন, যে পরিমাণ অভিবাসীকে ট্রাম্প ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলছেন, তা বাস্তবায়ন করতে গেলে বিশাল আইনগত ও লজিস্টিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে। এ ছাড়া এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গতিও কমিয়ে দিতে পারে।
২. অর্থনীতিতে মনোযোগ
নির্বাচনের পরপরই বুথফেরত জরিপে দেখা গিয়েছিল, ভোটারদের কাছে অন্যতম বড় বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি। ট্রাম্প ইতোমধ্যেই মূল্যস্ফীতি থামানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের আমলে নিত্যপণ্যের দাম রেকর্ড পরিমাণ উচ্চতায় উঠেছিল। তবে দাম কমানোর ক্ষেত্রে একজন প্রেসিডেন্টের ভূমিকা রাখার ক্ষমতা বেশ সীমিত।
এ ছাড়া কর কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে বিদেশি পণ্যের ওপর নতুন অন্তত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করতে চান তিনি। আর চীন থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর শুল্ক বাড়াতে চান অতিরিক্ত ৬০ শতাংশ। কিছু অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলছেন, এতে পণ্যের দাম সাধারণের নাগালের আরও বাইরে চলে যেতে পারে।
৩. জলবায়ু নীতির পুনর্বিবেচনা
প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর পরিবেশ সুরক্ষাসংক্রান্ত নানা আইন বাতিল করেছিলেন ট্রাম্প। তখন প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে প্রথম দেশ হিসেবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। এবারও জলবায়ু নীতিতে কাটছাঁটের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। এর মধ্য দিয়ে তার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িশিল্পকে সহায়তা করা। ইলেকট্রিক গাড়ির বিরোধী তিনি। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের জীবাশ্ম জ্বালানির উত্তোলন বাড়ানোরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প।
৪. ইউক্রেন যুদ্ধের সমাপ্তি
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে ইউক্রেনকে এ পর্যন্ত ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ট্রাম্প অনেক আগ থেকেই এত পরিমাণ সহায়তার সমালোচনা করে আসছিলেন। তিনি একটি সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে ক্ষমতা গ্রহণের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটাতে চান। তবে এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন শক্তিশালী হবেন বলে মনে করেন ডেমোক্র্যাটরা।
ইসরায়েলের কট্টর সমর্থক হলেও গাজায় যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে তিনি। লেবাননেও যুদ্ধ বন্ধের জন্য ইসরায়েলকে আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। তবে এই দুই ফ্রন্টে ইসরায়েলি যুদ্ধ কীভাবে বন্ধ করতে চান, তা বিস্তারিত বলেননি।
৫. গর্ভপাতের অধিকার খারিজ
নিজের কিছু সমর্থকের ইচ্ছার কথা মাথায় রেখে কমলা হ্যারিসের সঙ্গে নির্বাচনি বিতর্কের সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় এলে গর্ভপাতের অধিকার রদসংক্রান্ত আইনে স্বাক্ষর করবেন না। ২০২২ সালে গর্ভপাতের সাংবিধানিক অধিকারকে খারিজ করে দিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট। ওই রায়ের পক্ষে ছিলেন আদালতের রক্ষণশীল বিচারপতিদের অধিকাংশ। ট্রাম্প মনে করেন, গর্ভপাতের অধিকার-সম্পর্কিত বিষয়ের পুরোপুরি ক্ষমতা অঙ্গরাজ্যগুলোর হাতে ন্যস্ত করা উচিত।
৬. ৬ জানুয়ারির কিছু দাঙ্গাকারীকে ক্ষমা
২০২০ সালের নির্বাচনে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সে পরাজয় তিনি মেনে নেননি। নির্বাচনের ফলাফল বদলাতে ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালান ট্রাম্পের সমর্থকরা। এতে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দাঙ্গা বাধাতে সমর্থকদের উসকানি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছিল।
ট্রাম্প বলেছিলেন, দাঙ্গার অভিযোগ তুলে তার শত শত সমর্থককে রাজনৈতিক বন্দি করা হয়েছে। তাদের অনেককে অকারণে বন্দি করে রাখা হয়েছে। ক্ষমতায় গেলে তাদের কয়েকজনকে ‘মুক্তি’ দেবেন তিনি। তবে কিছু সমর্থক সেদিন ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে গিয়েছিলেন বলেও মনে করেন তিনি।
৭. বিশেষ কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথকে বরখাস্ত
ট্রাম্প বলেছিলেন, হোয়াইট হাউসে বসার ‘দুই সেকেন্ডের মধ্যে’ জ্যাক স্মিথকে চাকরিচ্যুত করবেন তিনি। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুটি ফৌজদারি মামলার তদন্ত করছেন মার্কিন কৌঁসুলি জ্যাক স্মিথ। ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল ভবনে দাঙ্গায় উসকানি দেওয়া ও সরকারি গোপন নথি সরানোর অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ওই মামলা দুটি করা হয়েছিল। ট্রাম্পকে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল পাল্টে দেওয়ার বিষয়ে অভিযুক্ত করেছিলেন স্মিথ। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ট্রাম্প।