সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদ পরিবারের অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের শাসনের সমাপ্তি ঘটেছে। এই খবরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সংগঠন বিভিন্নভাবে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে।
জাতিসংঘ
সিরিয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ দূত গেইর পেডারসেন বলেছেন, ‘গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমাদের এমন একটি পদ্ধতি খুঁজে বের করতে হবে যেখানে একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ থাকবে।’ তিনি বলেন, আগের মতো না হয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া দরকার। এমন একটি প্রক্রিয়া হবে যেখানে সবার অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে এবং ঐক্য থাকবে। এর মাধ্যমে সিরিয়ার স্থিতিশীলতা, সার্বভৌমত্ব এবং ঐক্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। বিভিন্ন ধরনের ক্ষতি পুনরুদ্ধার করা যাবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন
ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা কালাস এক্স-এ এক পোস্টে বলেছেন, আসাদ শাসনব্যবস্থার সমাপ্তি একটি ইতিবাচক ও দীর্ঘকালীন প্রত্যাশিত ঘটনা। এটি আসাদ সমর্থকদের দুর্বলতাও প্রকাশ করে। বিশেষ করে রাশিয়া ও ইরানের মতো দেশগুলো। তিনি আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান অগ্রাধিকার হচ্ছে অঞ্চলটিতে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সিরিয়ার পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ এবং জটিল হবে। এতে সব পক্ষকে গঠনমূলক অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র
হোয়াইট হাউস একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও তার দল সিরিয়ার অসাধারণ ঘটনাগুলো ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছে বাইডেন প্রশাসন।
অন্যদিকে ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, রাশিয়ার সমর্থন হারানোর পর আল-আসাদ তার দেশ থেকে পালিয়ে গেছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আসাদ চলে গেছেন। তিনি তার দেশ থেকে পালিয়েছেন। তার রক্ষাকর্তা রাশিয়া, রাশিয়া, রাশিয়া- যার নেতৃত্বে ছিলেন ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি আর আসাদকে রক্ষা করতে আগ্রহী নন।’
ট্রাম্প বলেন, রাশিয়ার প্রথম থেকেই সেখানে থাকার কোনো কারণ ছিল না। তারা সিরিয়ায় সব আগ্রহ হারিয়েছে ইউক্রেনের কারণে। যেখানে প্রায় ৬ লাখ রুশ সেনা আহত বা নিহত হয়েছেন। এই যুদ্ধ কখনোই শুরু হওয়া উচিত ছিল না। এটি হয়তো চিরকাল চলতে পারে।
রাশিয়া
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, সিরিয়ার আরব প্রজাতন্ত্রের ভূখণ্ডে সংঘাতের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা শেষে বাশার আল-আসাদ প্রেসিডেন্ট পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন এবং দেশত্যাগ করেছেন। তবে তিনি কোথায় গেছেন তা উল্লেখ করা হয়নি। তিনি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নির্দেশ দিয়েছেন। এই আলোচনায় রাশিয়া অংশগ্রহণ করেনি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়টি। বিবৃতিতে আরও জানিয়েছে, সিরিয়ায় অবস্থিত রাশিয়ার সেনাঘাঁটিগুলোতে সৈন্যরা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। তবে তাদের ওপর তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি নেই।
চীন
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, সিরিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বেইজিং। যত দ্রুত সম্ভব সিরিয়া স্থিতিশীলতায় ফিরে আসবে বলে দেশটি আশা প্রকাশ করেছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, চীন সরকার সিরিয়ায় যারা নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে দেশ ছাড়তে ইচ্ছুক তাদের সক্রিয়ভাবে সহায়তা করেছে। এ ছাড়াও যারা সিরিয়ায় রয়েছেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। আমরা সিরিয়ার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চীনের প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রত্যক্ষ পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছি। বর্তমানে সিরিয়ায় চীনের দূতাবাস দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে এবং আমরা চীনা নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখব।
তুরস্ক
তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বলেছেন, সিরিয়ার আসাদ সরকারের পতন ঘটেছে এবং দেশের নিয়ন্ত্রণ হাতবদল হচ্ছে। কাতারের দোহা ফোরামে বক্তব্য দেওয়ার সময় ফিদান বলেন, এটি রাতারাতি ঘটেনি। গত ১৩ বছর ধরে দেশটি অস্থিরতায় রয়েছে। যা ২০১১ সালে আল-আসাদের গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন দমন করার মাধ্যমে শুরু হয়।
তিনি আরও বলেন, সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোকে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিতে দেওয়া যাবে না। বিরোধী দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। আমরা সিরিয়ার স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার জন্য কাজ করব। নতুন সিরিয়া প্রতিবেশীদের জন্য হুমকি সৃষ্টি করবে না; বরং হুমকি দূর করবে বলে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
মিসর
মিসরের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, মিসর সিরিয়ার সমস্ত পক্ষকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা রক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তারা সিরিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সিরিয়ার জনগণ, সার্বভৌমত্ব ও ঐক্যের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেছে।
ফ্রান্স
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের ‘বর্বর শাসনের পতনকে’ স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার জনগণের প্রতি শান্তির শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন। এক্স পোস্টে মাখোঁ লিখেছেন, অবশেষে বর্বর শাসকের পতন হয়েছে। আমি সিরিয়ার জনগণের সাহস, ধৈর্য এবং বীরত্বকে শ্রদ্ধা জানাই। এই অনিশ্চয়তার মুহূর্তে তাদের জন্য আমার শান্তি, স্বাধীনতা এবং ঐক্যের শুভেচ্ছা রইল।
জার্মানি
জার্মান চ্যান্সেলর অলাফ শোলজ আল-আসাদের পতনকে ‘ভালো খবর’ বলে উল্লেখ করেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার জন্য রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শোলজ একটি বিবৃতিতে বলেছেন, বাশার আল-আসাদ তার জনগণের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিলেন। তার ঘাড়ে অসংখ্য প্রাণের দায় আছে এবং বহু মানুষকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছেন। যাদের অনেকেই জার্মানিতে আশ্রয় নিয়েছেন। এর আগে জার্মানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্নালেনা বেরবক আসাদ শাসনের সমাপ্তি সিরিয়ার কোটি কোটি মানুষের জন্য একটি বড় স্বস্তি বলে উল্লেখ করেছিলেন।
ইসরায়েল
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমিখাই চিকলি বলেছেন, সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের অগ্রগতি ইসরায়েলের জন্য আনন্দের নয়। তিনি সিরিয়ার গোলান মালভূমিতে পুনরায় ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতির চুক্তির ভিত্তিতে একটি নতুন প্রতিরক্ষা রেখা তৈরি করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সিরিয়ার অধিকাংশ অঞ্চল এখন আল-কায়েদা ও আইএস-এর সহযোগী সংগঠনের নিয়ন্ত্রণে।
অন্য একটি বিবৃতিতে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বলেছে, সিরিয়ায় সাম্প্রতিক ঘটনার পর... সেনাবাহিনী বাফার জোনে ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় অন্যান্য স্থানে বাহিনী মোতায়েন করেছে। যাতে গোলান মালভূমির জনপদ ও ইসরায়েলের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে।
লেবানন
লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা প্রতিবেশী সিরিয়ার সঙ্গে সীমান্তে তাদের উপস্থিতি জোরদার করছে। অঞ্চলটি যে দ্রুত পরিবর্তনশীল এবং সূক্ষ্ম পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা বিবেচনায় রেখে… উত্তরের এবং পূর্বের সীমান্ত পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত ইউনিটগুলোকে শক্তিশালী করা হয়েছে। পাশাপাশি নজরদারি ব্যবস্থাও কঠোর করা হয়েছে।
কাতার
কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সতর্ক করে বলেছে, আল-আসাদের পতনের পর সিরিয়াকে কোনোভাবেই অরাজকতার দিকে যেতে দেওয়া যাবে না। তারা সিরিয়ার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সুরক্ষা ও রাষ্ট্রের ঐক্য রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। যাতে দেশটি অরাজকতার মধ্যে না পড়ে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত
সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেছেন, অরাজনৈতিক পক্ষগুলোকে রাজনৈতিক শূন্যতা কাজে লাগানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। তিনি বাহরাইনের রাজধানী মানামায় অনুষ্ঠিত মানামা ডায়ালগ নিরাপত্তা ফোরামে বলেন, সিরিয়ায় ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো রাজনৈতিক ব্যর্থতা এবং সংঘাত ও বিশৃঙ্খলার ধ্বংসাত্মক প্রকৃতির একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সূত্র: আল-জাজিরা