শনিবার (১ ফেব্রুয়ারি) মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের চার বছর পূর্ণ হলো। ২০২১ সালের এই দিনে দেশটির নির্বাচিত রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা (প্রধানমন্ত্রীর সমমানের) অং সান সু চিকে হটিয়ে ক্ষমতা দখল করে সেনাবাহিনী। এরপর থেকে জীবনযাত্রার মান, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সূচকে মায়ানমারের অবস্থান ক্রমাগত নিম্নগতি দেখেছে।
সেনা-অভ্যুত্থান
২০২১ সালে দেশটির ক্ষমতা দখলে নেতৃত্ব দেন জেনারেল মিন অং হ্লাইং। সেনা অভ্যুত্থানের সরকারকে টিকিয়ে রাখতে অং সান সু চি ও উ উইন মিন্টের মতো নেতাকে গ্রেপ্তার করেছেন তিনি। এরপর প্রায় চার বছরের সামরিক স্বৈরশাসনের সাক্ষী হয়েছে মায়ানমার।
ক্ষমতা দখলের পর দেশটির জান্তা সরকার দেশে কঠোর সেনা তৎপরতা মোতায়েন করেছে। দমিয়েছে সরকারবিরোধী ছোট-বড় প্রায় সব আন্দোলন।
জান্তার আক্রমণে বিপুল প্রাণহানি
গত চার বছরে দেশটিতে সহিংসতায় ৬ হাজার ২২৮ জনের প্রাণহাণির ঘটনা নিশ্চিত করেছে বার্তা সংস্থা ইরাবতী। এর মধ্যে ৭১১টি শিশু ও ১ হাজার ৩৮৭ জন নারী ছিলেন বলে জানিয়েছে সু চির দল এনএলডি সমর্থিত এই সংবাদ মাধ্যম।
আন্দোলন দমাতে আইনি আগ্রাসন
এ ছাড়া রাজবন্দীও বেড়েছে নাটকীয় হারে। ২০২০ সালে যেখানে মাত্র ২৩৪ জন রাজবন্দী ছিলেন, ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে এই সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২১ হাজার ৭১১।
সরকারবিরোধী আন্দোলনের চরম পরিণতি দেখেছে দেশের জনগণ। ২০২২ সালে গণতন্ত্রপন্থী নেতা কো জিমি ও হিপহপ শিল্পী কো ফো জিয়া থাওয়ের মৃত্যুদণ্ড দেশটিতে বিদ্যমান মতাদর্শের স্বাধীনতার চরম বিপর্যয়কেই স্পষ্ট করে।
জান্তা সরকারের সামরিক নীতি নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
বিমান হামলা
২০২১ সালের আগে দেশটিতে বিমান হামলার খবর কদাচিৎ শোনা গেলেও, জান্তা সরকার আন্দোলন দমনের পন্থা হিসেবে বেছে নিয়েছে বিমান হামলাকেই।
চার বছরে মায়ানমারে ৩ হাজারের বেশি বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন ১ হাজার ৭৪৯ জন।
সরকার বাহিনীর অগ্নিসন্ত্রাসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১ লাখের বেশি বাড়িঘর।
দেশটিতে এ পর্যন্ত সরকার বাহিনীর আগ্রাসনে সাড়ে ৩ কোটি বাসিন্দা ঘরছাড়া হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি।
অর্থনৈতিক বিপর্যয়
অর্থনৈতিক খাতেও দেশটির দুরাবস্থা লক্ষনীয়। বার্ষিক জিডিপিতে নিম্নগতির পাশাপাশি মুদ্রাস্ফীতি ও বাণিজ্যে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে ধুঁকছে দেশের অর্থনীতি।
নিত্যপণ্যের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে পৌঁছে গেছে। আগে এক ব্যাগ চাল ৫৪ হাজার কিয়াতের বিনিময়ে পেতেন বাসিন্দারা। এখন গুনতে হচ্ছে দুই লাখেরও বেশি।
এতে মায়ানমারে তীব্র খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে। দেড় কোটি জনসংখ্যার এই দেশের প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁঁড়িয়ে আছেন।
জ্বালানী সংকট ও সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা
এদিকে জ্বালানি সংকটের কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। রাজধানী ইয়াংগুনে দিনে অন্তত ১৬ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে না।
সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাও বিপন্নপ্রায়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত ওয়ার্ড প্রেস ফিডম ইন্ডেক্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতায় ১৮০ টি দেশের মধ্যে মায়ানমারের অবস্থান ১৭১তম।
জানা গেছে, জান্তা সরকারের আক্রমণে ১২ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছেন। কারাবাসে আছেন ৪৩ জন।সরকারবিরোধী বিদ্রোহীগোষ্ঠীর উত্থান
তবে জান্তাবিরোধী সশস্ত্র বাহিনীও ক্রমে শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিরোধ দেখিয়েছে আরাকান আর্মি। এই সংগঠনের নেতৃত্বে মায়ানমারের প্রায় ১৪৪টি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল দখলে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। ৭৯টি এলাকায় জান্তাবাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি হামলাও চালিয়েছে তারা।
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা
এদিকে মায়ানমারের মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে শঙ্কিত আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আরাকান রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান বর্বর গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছে দেশটির সরকার।
দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপটে মায়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অন্তত গুরুত্ববহ। সেনাশাসনের অবসান প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবে কবে পূরণ হবে জানেন না দেশটির জনগন। সূত্র: বিবিসি, এএফপি, ইরাবতী।
নাইমুর/