চীনের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কড়া জবাব দিয়েছে চীন। দেশটি মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। এমনকি তদন্ত শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সার্চ জায়ান্ট গুগলের বিরুদ্ধেও। এ ছাড়া আরও দুই মার্কিন প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ তালিকার আওতায় এনেছে দেশটি।
চীনের ওপর ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্কারোপের বিপরীতে বেইজিংয়ের কড়া জবাবের পর অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই দুই দেশের মধ্যে কি বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু হচ্ছে?
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, চীন যুক্তরাষ্ট্রের কয়লা, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এ ছাড়া অপরিশোধিত তেল, কৃষি যন্ত্রাংশ, পিকআপ ট্রাক ও কিছু স্পোর্টস কারের ১০ শতাংশ করে শুল্ক আরোপ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার থেকে ওই শুল্ক কার্যকর হয়েছে।
চীনে গুগলের বেশ কিছু ব্যবসা রয়েছে। তবে তাদের সার্চ সেবা ২০১০ সাল থেকেই সেখানে ব্লক। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধেও চীনে তদন্ত শুরু হয়েছে। গুগল বাজারে একাধিপত্য তৈরি করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে চীন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র শুধু চীনের ওপর নয়, কানাডা ও মেক্সিকোর পণ্যের ওপরও শুল্ক আরোপ করেছিল। জবাবে তারাও পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছিল। কানাডার জনসাধারণ যুক্তরাষ্ট্রের এ পদক্ষেপের প্রতিবাদে কিছু কিছু মার্কিন পণ্য বয়কট করতেও শুরু করে। শেষ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবং মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শেনবামের সঙ্গে কথা বলেন। পরে দেশটি জানায়, আপাতত ৩০ দিনের জন্য শুল্ক আরোপ স্থগিত করা হয়েছে।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট জানান, ট্রাম্পের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি সীমান্তে ফেনটানিলের প্রবাহ ও অবৈধ অভিবাসীর ঢল ঠেকাতে ১০ হাজার সেনা পাঠাতে রাজি হয়েছেন। একই ধরনের কথা বলেছেন কানাডার প্রধানমন্ত্রীও। ট্রুডো জানান, কানাডাও সীমান্তে ১০ হাজার সেনা মোতায়েন করবে, যারা সীমান্তকে সুরক্ষিত রাখবে। তিনি এ সম্পর্কিত নির্দেশনায় স্বাক্ষর করেছেন বলেও উল্লেখ করেন। এই পদক্ষেপে কানাডার খরচ হবে ২০ কোটি মার্কিন ডলার।
তবে ট্রাম্পের পক্ষপাতমূলক এ পদক্ষেপের কড়া জবাব দিয়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এ ক্ষেত্রে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর দেখানো পথেই হেঁটেছেন তিনি। মার্কিন পণ্যের ওপরও পাল্টা করারোপের ঘোষণা দিল বেইজিং।
এই যখন অবস্থা, তখন রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন, কানাডা-মেক্সিকোর বেলায় সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলেও, চীনের বেলায় কেন নয়? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কানাডা ও মেক্সিকো যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশ হলেও চীন তাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী। চীনের বাণিজ্যিক অগ্রগতি কোনোভাবেই কাম্য নয় ওয়াশিংটনের।
এর আগে ২০১৮ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প যখন চীনের ওপর করারোপ করেন, তখন বাণিজ্য যুদ্ধের বিষয়ে তেমন একটা মাথা ঘামায়নি বেইজিং। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। চীনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা না করেই শুল্কারোপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রাম্প। এতেই পাল্টা ব্যবস্থা নিল বেইজিং। আর এর মধ্য দিয়েই দেশ দুইটি বাণিজ্যযুদ্ধে জড়াতে যাচ্ছে বলে অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন।
তবে চীনের পাল্টা শুল্ক আরোপ বড় কোনো ঘটনা বলে মানতে নারাজ বেইজিংভিত্তিক থিংকট্যাংক সেন্টার ফর চায়না অ্যান্ড গ্লোবালাইজেশনের অধ্যাপক হেনরি ওয়্যাং।’ বিবিসিকে তিনি বলেছেন, ‘অবশ্যই চীনকে কোনো না কোনোভাবে উত্তর দিতে হবে। তবে তারা শুল্ক সুনির্দিষ্ট পণ্যের ওপর আরোপ করেছে। আমি মনে করি না যে, এটি বড়মাপে কোনো পাল্টা জবাব দেওয়া।’
ওয়্যাং আরও জানান, চীনে এখন চান্দ্র নববর্ষ উদযাপিত হচ্ছে। অনেক আমলাই ছুটিতে আছেন। তারা ফিরে আসার পর চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উচ্চপর্যায়ে আলোচনা শুরু হতে পারে।
দুই প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ তালিকায়
ট্রাম্পের শুল্কের জবাবের অংশ হিসেবে বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রতিষ্ঠানকে অনির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কালো তালিকাভুক্ত ওই দুই প্রতিষ্ঠানের একটি পিভিএইচ করপোরেশন। প্রতিষ্ঠানটি ক্যালভিন ক্লেইন ও টমি হিলফিগারের মতো ব্র্যান্ডগুলোর হোল্ডিং প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করত। আর দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠানটি হলো মার্কিন বায়োপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইলুমিনা।
এক বিবৃতিতে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই দুই প্রতিষ্ঠান চীনের বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, সুরক্ষা ও উন্নয়নকে সংশ্লিষ্ট আইন অনুসারে সমুন্নত রাখতেই ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কালো তালিকাভুক্ত ওই দুই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চীন জরিমানাসহ বিভিন্ন ধরনের নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। তাদের বিদেশি কর্মীদের ভিসাও বাতিল করে দেওয়া হতে পারে।
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় অভিযোগ
বিশ্ববাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ জানাবে বলে সতর্ক করেছে বেইজিং। চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলছে, নিজেদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থরক্ষায় তারা ডব্লিউটিওর সমঝোতা প্রক্রিয়ার দ্বারস্থ হবে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র চীনের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করে ডব্লিউটিওর নিয়ম ব্যাপকভাবে লঙ্ঘন করছে। এই পদক্ষেপ প্রকৃতিগতভাবেই ভয়াবহ এবং একতরফাবাদেরও বাণিজ্যিক সুরক্ষাবাদের গতানুগতিক উদাহরণ। সূত্র: বিবিসি, সিএনবিসি
সৃষ্টিকর্তার কাছে সৌভাগ্যের প্রার্থনায় নববর্ষ পালনের সময়ই চীনের ওপর শুল্কারোপের ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুক্তরাষ্ট্রের এ সিদ্ধান্ত চীনাদের জন্য সৌভাগ্য বয়ে আনবে নাকি দুর্ভাগ্য, তা নিয়ে আলোচনা এখন নানা মহলে। চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
মঙ্গলবার থেকে কানাডা ও মেক্সিকোর ওপর ২৫ শতাংশ ও চীনের ওপর ১০ শতাংশ মার্কিন শুল্ক কার্যকরের কথা ছিল। তবে এর এক দিন আগেই সিদ্ধান্ত থেকে আংশিক সরে এসেছেন ট্রাম্প। কানাডা ও মেক্সিকোর জন্য ৩০ দিন স্থগিত থাকবে শুল্কারোপ। তবে, চীনকে এই তালিকায় রাখেননি তিনি। ফলে, আগের সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে বেইজিংয়ের জন্য।