ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানে সৌদি আরবে আলোচনায় বসছে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে পশ্চিমা বিশ্ব যেভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৃথক ও একা করে ফেলেছিল, তার অবসান ঘটিয়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। তবে এর মধ্য দিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর ঐক্যে ফাটল ধরেছে। আগামীতে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পাশে কতটা দাঁড়াবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহকারীরা সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বক্তব্য রেখেছেন ইউক্রেন ও ইউরোপ ইস্যুতে। সেগুলো থেকে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়তো পুতিন যা বলবেন, তাতেই রাজি হয়ে যাবেন। যুদ্ধ অবসানের জন্য তিনি যে চুক্তিটি করবেন তা ইউক্রেনের জন্য ততটা সুফল বয়ে আনবে না।
যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে রাখবে না। তবে দেশটি জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা যে চুক্তিই করুক না কেন, ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোকে সেটির নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। পাশাপাশি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে ইউক্রেনে সেনাও পাঠাতে হবে। বিষয়টি নিয়ে এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছেন ইউরোপীয় নেতারা। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ গতকাল সোমবার প্যারিসে গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসেছিলেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন জার্মানি, ব্রিটেন, ইতালি, পোল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও ডেনমার্কের নেতৃস্থানীয়রা। পাশাপাশি উপস্থিত ছিলেন ইউরোপীয় কাউন্সিল ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান এবং ন্যাটোর মহাসচিব।
শুধু ইউরোপীয় দেশ নয়, যুদ্ধ অবসানের আলোচনায় ইউক্রেনও অংশ নিতে পারবে না এমন ইঙ্গিত এসেছিল ট্রাম্পের পক্ষ থেকে। তবে ভলোদিমির জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে হওয়া কোনো সিদ্ধান্ত কখনই গ্রহণ করবে না ইউক্রেন। পরে ট্রাম্প আবছা এক আভাস দেন যে, ইউক্রেনকে হয়তো আলোচনায় নেওয়া হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা মাইক ওয়াল্টজ এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ সৌদি আরবের মধ্যস্থতায় আয়োজিত আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন। সৌদি আরবের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসন ও মস্কো- দুই পক্ষেরই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প পুতিনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন। রুবিও বলছেন, ওই ফোনালাপের পরবর্তী ধাপ হচ্ছে এ বৈঠক। সিবিএসকে তিনি বলেছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে বোঝা যাবে যে, এটি গুরুত্বপূর্ণ কি না। এটির মতো জটিল একটি যুদ্ধ শুধু একটি ফোনকলে সমাধান হবে না।
ইউক্রেনকে আলোচনায় যুক্ত করা প্রসঙ্গে রুবিও বলেন, ‘যদি এটি আসল আলোচনা হয়- আমরা এখনো ওই পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি- তবে যদি তা হয়, তাহলে ইউক্রেনকে যুক্ত করা হবে এতে। কারণ তাদের দেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদিকে ইউরোপীয়দের যুক্ত করতে হবে, কারণ তারা পুতিন ও রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন ও এই প্রচেষ্টায় তাদেরও অবদান রয়েছে।’
তবে সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক যে অবস্থানে এসে ঠেকেছে, তাতে শুধু একজনেরই খুশি হওয়ার কথা। আর তিনি হলেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। এতদিন ইউরোপীয় দেশগুলো ও যুক্তরাষ্ট্র সম্মিলিতভাবে রাশিয়াকে শত্রু হিসেবে তকমা দিলেও সম্প্রতি সে বিষয়টি পাল্টে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স গত শুক্রবার মিউনিখে এক সম্মেলনে জোর গলায় বলেছেন, ইউরোপের সমস্যা তারা নিজেরাই।
পুরো বিষয়টি নিয়ে কার্নেগি রাশিয়া ইউরেশিয়া সেন্টারের পরিচালক আলেক্সান্ডার গাবুয়েভ বলছেন, এটি অবশ্যই ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য আনন্দের। এটি তার জন্য ইস্টার, হানুকাহ, বড়দিন ও জন্মদিন- একদিনে হওয়ার মতো।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট চাইছেন ন্যাটো সদস্যরা নিজেদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি করুক। তবে বছরের পর বছর ধরে এ খাতের খরচ সংকুচিত করে আসা ইউরোপীয় দেশগুলো চাইলেই এখন ওই অবস্থানে যেতে পারছে না। এতে তাদের অর্থনীতির অন্যান্য অংশে চাপ তৈরি হবে। তবে কোনো কোনো ইউরোপীয় দেশের নেতা যে ট্রাম্পকে খুশি করার চেষ্টা করতে পারে, সে ইঙ্গিতও মিলেছে। যেমন- যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের আসন্ন দিনগুলোতে ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা রয়েছে। তিনি বলেছেন, শান্তি চুক্তির অধীনে ইউক্রেনে সেনা পাঠাতে ইচ্ছুক তার দেশ।