যুক্তরাষ্ট্র সফরে গেছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ। সেখানে দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাকে হাস্যোজ্জ্বলভাবে দেখা গেলেও দুইজনের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা স্পষ্ট ছিল।
মূলত ইউক্রেন ইস্যুতে ইউরোপের দেশগুলোর পাশ থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাশিয়ার দিকে ঝুঁকেছে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রশাসন। আর তাতেই তৈরি হয়েছে ফাটল। যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সের সম্পর্ক বহু পুরোনো। সে কারণে হয়তো দিনভর আলোচনায় ট্রাম্প ও মাখোঁকে বন্ধুত্বপূর্ণ অবস্থাতেই দেখা যায়।
কিন্তু দিনশেষে মাখোঁ নিশ্চিত করেছেন যে তিনি ট্রাম্পের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে একমত নন। ট্রাম্প রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে স্বৈরশাসক বলতে রাজি নন। বরং তিনি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে স্বৈরশাসক বলেছেন কিছুদিন আগে। অন্যদিকে মাখোঁ বলেছেন, এই সংঘাতে রাশিয়া যে আগ্রাসনকারী, তা একদম স্পষ্ট।
ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মাখোঁ বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট পুতিন শান্তি লঙ্ঘন করেছেন।’ অন্যদিকে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ইচ্ছা ব্যক্ত করেন এবং তিনি ইউক্রেন ও রাশিয়ার মধ্যকার বিবাদ দূর করতে চান বলে জানান। ট্রাম্প বলেন, একবার কোনো চুক্তি হয়ে গেলে তিনি মস্কোতে পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যেতে পারেন।
তবে মাখোঁ একটু ভিন্নভাবে সব করার পক্ষে। তার মতে, প্রথমে সমঝোতা হওয়া এবং তার পর এমন শান্তি চুক্তি করা উচিত, যা নিরাপত্তা নিশ্চয়তা করে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘আমরা শান্তি চাই, তিনি শান্তি চান। আমরা দ্রুত শান্তি চাই, কিন্তু এমন চুক্তি চাই না যা দুর্বল।’ মাখোঁ বলেন, যেকোনো শান্তি চুক্তি মূল্যায়ন করতে হবে, পরীক্ষা করতে হবে এবং প্রমাণ করতে হবে।
কিছু বিষয়ে দুই নেতা সম্মতও হয়েছেন। তারা বলেছেন, একবার শান্তি চুক্তি হয়ে গেলে ইউক্রেনে ইউরোপীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। মাখোঁ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘তারা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকবে না। তারা কোনো সংঘাতের অংশ হবে না। তারা শুধু শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সেখানে থাকবে।’
ট্রাম্প জানান, তার বিষয়টিতে সম্মতি রয়েছে। পুতিনেরও এতে সম্মতি রয়েছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, ‘হ্যাঁ, তিনি সেটায় সম্মতি দেবেন। আমি তাকে সুনির্দিষ্টভাবে এই প্রশ্নটি করেছিলাম। তার এ নিয়ে কোনো সমস্যা নেই।’
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর হোয়াইট হাউস সফরকারী প্রথম ইউরোপীয় নেতা মাখোঁ। ট্রাম্পের সঙ্গে এ সফরে যা যা আলোচনা হয়েছে, সেগুলোকে ‘মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো’ বলে অভিহিত করেছেন মাখোঁ।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মাখোঁর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এবারও ওভাল অফিসে বৈঠকের সময় সে সম্পর্কের একটি প্রভাব দেখা গেছে। যেমন- ট্রাম্প ইউরোপ সম্পর্কে ভুল তথ্য দিচ্ছিলেন। তিনি বলছিলেন, ইউরোপ নিজেদের সব সহায়তা ঋণ হিসেবে দিয়েছে। এ সময় মাখোঁকে ট্রাম্পের বাহু স্পর্শ করে ভুল ধরিয়ে দিতে দেখা যায়।
ইউক্রেনীয় খনিজ প্রশ্নে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে বলেও জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, জেলেনস্কি চলতি সপ্তাহে বা আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে চুক্তি চূড়ান্ত করতে আসতে পারেন। আগের বাইডেন প্রশাসন কিয়েভকে যা যা সহায়তা দিয়েছিল, তার কিছুটা অংশের বিনিময়ে ওই খনিজের ভাগ চাইছে যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ৫০০ বিলিয়ন ডলারের খনিজ চেয়েছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে জেলেনস্কি সে দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধকালীন সময়ে যে সহায়তা দিয়েছে, তা কোনো দিক থেকে এর কাছাকাছিও না। এ ছাড়া তারা কোনো সুরক্ষা নিশ্চয়তাও দেয়নি।
এদিকে, ইউক্রেনের কিছু ভূখণ্ড এখন রাশিয়ার হাতে রয়েছে। ট্রাম্পকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল সে ভূখণ্ড ফেরত পাওয়া যাবে কি না। উত্তরে তিনি বলেছেন, আমরা বিষয়টি দেখব। অন্যদিকে মাখোঁ বলেছেন, ‘যেকোনো চুক্তিতেই ইউক্রেনের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি থাকা উচিত।’
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমারের চলতি সপ্তাহে হোয়াইট হাউস সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে।
জাতিসংঘে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান
ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের তিন বছর পূর্ণ হওয়া উপলক্ষে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ইউক্রেন মস্কোর আগ্রাসনের নিন্দা জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবটি উত্থাপন করে ইউরোপীয় দেশগুলো।
প্রথা ভেঙে যুক্তরাষ্ট্র ভোটে রাশিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। তবে শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়েছে।
এ ছাড়াও ইউক্রেনের আঞ্চলিক অখণ্ডতার পক্ষে আরেকটি প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। সে প্রস্তাব উত্থাপন করে খোদ যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ওই প্রস্তাবে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানানো হয়। তবে রাশিয়ার বিরুদ্ধে কোনো সমালোচনা ছিল না। ওয়াশিংটন ও মস্কো প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেয়। নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই মিত্র— যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সে প্রস্তাবে ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকে। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি