গাজা ‘বধ্যভূমি’ হয়ে উঠেছে বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস। এমন একটি সময় তিনি এ মন্তব্য করলেন যখন প্রতিনিয়ত সেখানে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণহানি হচ্ছে। ক্ষুধায় কষ্ট করতে হচ্ছে গাজাবাসীকে। মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আগেই বলেছে, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী যা করছে তা যুদ্ধাপরাধ, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ ও জাতিগত নিধনের শামিল।
গত মঙ্গলবার ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ২৬ জন ফিলিস্তিনি মারা গেছেন গাজায়। বেসামরিক মানুষ, সাংবাদিক, সহায়তাকর্মী– কেউই রেহাই পাচ্ছেন না ইসরায়েলি হামলা থেকে। গাজাবাসীকে জোরপূর্বক সরিয়ে এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক হারে ঘটছে। পরিস্থিতি এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে গোটা গাজার ৫০ শতাংশ ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
গাজা আগে থেকেই অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইসরায়েল। ফলে সেখানে কোনো সহায়তাও প্রবেশ করতে পারছে না। অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে কোনো খাবার নেই, জ্বালানি নেই, ওষুধ নেই। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও তা-ই বলেছেন। ইসরায়েল এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সহায়তা আটকে রাখার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন ভাঙছে বলেও মন্তব্য করেছেন গুতেরেস। তিনি স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেন, আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে ইসরায়েলের যে দায়িত্ব রয়েছে, তা তারা মানছে না।
ইসরায়েল কোন কোন আইন ভাঙছে, তা-ও উল্লেখ করেছেন গুতেরেস। তিনি বলেছেন, ইসরায়েল চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের ৫৫, ৫৬ ও ৫৯ ধারা ভেঙেছে। সেসব ধারায় বলা আছে যে, ইসরায়েলকে নিজেদের দখলের অধীনে থাকা জনগোষ্ঠীকে খাবার ও চিকিৎসা রসদ দিতে বাধ্য। কোনো কারণে যদি জনগোষ্ঠীর একাংশের হাতে পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকে, তা হলে দখলদার শক্তিকে অবশ্যই সহায়তা পাঠাতে দিতে হবে। জাতিসংঘের কর্মীসহ ইসরায়েল যে মানবিক সহায়তাকর্মীদের হত্যা করছে, সে বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন গুতেরেস।
গাজাবাসীকে জোরপূর্বক উচ্ছেদের যে পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করেছেন, সে প্রসঙ্গে গুতেরেস জানান, এ ধরনের যেকোনো পরিকল্পনার স্পষ্টভাবে বিরোধিতা করবেন তিনি। এটিও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে জানান গুতেরেস। তিনি বলেন, ফিলিস্তিনিদের জন্য একমাত্র সমাধান হলো তাদেরকে তাদের ভূমিতে থাকতে দেওয়া এবং ইসরায়েলিদের পাশাপাশি বসবাস করতে দেওয়া।
এদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত ফেব্রুয়ারিতেই এক প্রতিবেদনে জানায়, অধিকৃত অঞ্চল থেকে জোরপূর্বকভাবে কাউকে উচ্ছেদ করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ রয়েছে। এ ধরনের উচ্ছেদ যখন অপরাধমূলক উদ্দেশ্যে করা হয়, তখন তা যুদ্ধাপরাধ। যখন এটি কোনো বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে পদ্ধতিগতভাবে করা হয় বা রাষ্ট্রের নীতি এরকম কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়, তখন তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, গাজার যুদ্ধে অন্তত ৫০ হাজার ৮১০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে এবং ১ লাখ ১৫ হাজার ৬৮৮ জন আহত হয়েছেন।
তবে গাজার সরকারি গণমাধ্যম দপ্তরের তথ্য বলছে, গাজায় মোট মারা গেছেন ৬১ হাজার সাত শরও বেশি মানুষ। ধ্বংসস্তূপে নিখোঁজ গাজাবাসীকেও তারা মৃতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তাবিষয়ক সংস্থা ওসিএইচএর তথ্য বলছে, নিহত সহায়তাকর্মীদের মধ্যে ডক্টরস উইদআউট বর্ডার্সের একজন কর্মীও রয়েছেন। এ ছাড়া প্যালেস্টিনিয়ান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) দুজন মারা গেছেন। তারা হলেন- হুসাম আল লৌলৌ, মাহদি মুহাম্মদ, মুহাম্মদ আবু সুবাইহ ও তার স্ত্রী সামিরা ইসমাইল আহমাদ আবদুল হাদি।
গাজার যুদ্ধে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় অন্তত ৪১২ জন মানবিক সহায়তাকর্মী মারা গেছেন। ওসিএইচএ আরও উল্লেখ করেছে যে ৬ ও ৭ এপ্রিল পৃথক ঘটনায় খান ইউনিসে তিন ফিলিস্তিনি সাংবাদিক মারা গেছেন।
৬ এপ্রিলের আক্রমণে আরও সাতজনের সঙ্গে ইসলাম মাকদাদ নামের এক নারী সাংবাদিকও নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ৭ এপ্রিল ইসরায়েলি বাহিনী নাসের হাসপাতালের কাছে এক তাঁবুতে হামলা চালায়। এতে হেলমি আল-ফাকাওয়ি নামের একজন সাংবাদিক আগুনে পুড়ে মারা যান। আহমেদ মানসুর নামের আরেক সাংবাদিক গুরুতর আহত হন এবং একদিন পর তার মৃত্যু হয়।
প্যালেস্টিনিয়ান জার্নালিস্ট সিন্ডিকেট বলছে, গত মার্চ মাসে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আরও সাত সাংবাদিক মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন দায়িত্ব পালনকালে। আর একজন মারা গেছেন নিজ বাড়িতে অবস্থানের সময়।
দাতব্য সংস্থায়ও হামলা
গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলার নতুন এক ভিডিও ফুটেজ সামনে এসেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী এক দাতব্য খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্রে হামলা চালাচ্ছে। ঘটনাটি গত সোমবারের। ওই খাদ্য সরবরাহ কেন্দ্রে হামলা চালানোর কারণে সংকট আরও তীব্রতর হতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইসরায়েল আগের মতোই নির্বিচারে হামলা চালাচ্ছে। ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) বলছে, তাদের ক্লিনিকের কাছে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ হিসেবে পরিচিত আল-মাওয়াসিতেও হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
হামলা ইয়েমেন ও লেবাননেও
ইসরায়েলি বাহিনী শুধু গাজায় নয়, ইয়েমেন ও লেবাননেও বোমাবর্ষণ অব্যাহত রেখেছে। ইয়েমেনের হোদেইদাহ অঞ্চলে ইসরায়েলের বোমা হামলায় অন্তত ছয়জন মারা গেছেন। ইসরায়েলি বাহিনী লেবাননের বালবেক ও বেকা ভ্যালিতেও বিমান হামলা চালিয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা