চার দিন একে অপরের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার পর গত শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি মেনে নেয় ভারত ও পাকিস্তান। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, সৌদি আরব, ব্রিটেনসহ বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধবিরতির নেপথ্যে কাজ করেছে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে এই যুদ্ধে লাভ হলো কার।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধকে চীনের সামরিক গোয়েন্দা তথ্য জানার এক বিশাল সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তারা বলছেন, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারত যেসব যুদ্ধবিমান এবং সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করছে, তা থেকে গোয়েন্দা তথ্য পাচ্ছে দেশটি। চীনের সামরিক আধুনিকতা এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখান থেকে সে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের সামরিক তৎপরতা ও কৌশল সম্পর্কে জানতে পারছে। এসব গোয়েন্দা তথ্য সাগরে, জলে স্থলে ভারতকে মোকাবিলায় তাকে এগিয়ে রাখছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আলেকজান্ডার নেইল বলেন, এটা গোয়েন্দা দৃষ্টিকোণ থেকে এক অনন্য সুযোগ। ভারতের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের সামরিক নড়াচড়া সীমান্তেই সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা জানান, চীনের নির্মিত জে-১০ যুদ্ধবিমান দিয়ে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে দুটি ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে পাকিস্তানের পাইলটরা। যার মধ্যে একটি ছিল ফরাসি নির্মিত রাফাল। ভারত অবশ্য তাদের কোনো যুদ্ধবিমানের ক্ষয়ক্ষতি শিকার না করলেও বিশ্লেষকরা রাফালের দিকেই ইঙ্গিত করেছেন।
সামরিক বিশ্লেষক বলছেন, এ ধরনের যুদ্ধ পরিস্থিতি যেকোনো দেশের জন্য একটি বিরল উপলক্ষ। যেখানে পাইলটের দক্ষতা, যুদ্ধবিমানের কার্যকারিতা ও আকাশ থেকে আকাশে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে বিশ্লেষণ করা যায়।
চীন ও ভারত- এই দুই আঞ্চলিক পরাশক্তি। দীর্ঘ মেয়াদে একে অপরকে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখে আসছে। যাদের মধ্যে ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ হিমালয় সীমান্ত নিয়ে দশকের পর দশক ধরে উত্তেজনা চলছে। সর্বশেষ সীমান্ত সংঘর্ষ ঘটে ২০২০ সালে।
লন্ডনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (আইআইএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, চীনের এখন ২৬৭টি স্যাটেলাইট সক্রিয় রয়েছে, যার মধ্যে ১১৫টি গোয়েন্দা, নজরদারি ও টহলের জন্য এবং আরও ৮১টি সামরিক ইলেকট্রনিক ও সংকেত পর্যবেক্ষণের জন্য। এটি ভারতসহ আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় অনেক বেশি। যুক্তরাষ্ট্রের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে তারা।
বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা বলছেন, ভারত ব্রহ্ম সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কৌশলগত অস্ত্র প্রয়োগ করেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। মিত্র পাকিস্তানের কাছ থেকে তারা ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক তথ্য পাবে। পাকিস্তান গত শনিবার দাবি করেছে, ‘বুনইয়ানুম মারসুস’ অভিযানে ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ ধ্বংস করেছে। পাকিস্তানের মাধ্যমে চীন এখন ভারতের প্রতিরক্ষার অনেক কিছুই জানতে পারবে।
খবরে বলা হয়েছে, সামুদ্রিক পর্যবেক্ষণেও চীন এখন বেশি সক্রিয়। ওপেন সোর্স গবেষক ড্যামিয়েন সাইমন মনে করেন, ভারত মহাসাগরে চীনা গবেষণা জাহাজ, মহাকাশ পর্যবেক্ষণ জাহাজ ও তথাকথিত মাছ ধরার নৌবহর নিয়মিত মোতায়েন করা হচ্ছে, যাদের মধ্যে অনেক ‘গোপন গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রাহক’ হিসেবে কাজ করছে।
রয়টার্স জানায়, ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাই একদিকে যেমন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলছে, তেমনি চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের জন্য এটি হয়ে উঠছে একটি স্বর্ণখনি। যেটাকে কাজে লাগিয়ে চীন আগামীতে টেকসই একটি প্রতিরক্ষা কৌশল গড়ে তুলতে পারবে।
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের বরাবরই রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। ভারতকে মোকাবিলাসহ দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বজায় রাখতেই সে পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে। এই যুদ্ধে সেই দায়বদ্ধতা থেকেই সে পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সম্প্রতি চীনে সরকারি সফরের সময় প্রেসিডেন্ট আসিফ জারদারি পাকিস্তানের কৌশলগত অংশীদারত্বের অটুট প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পাকিস্তানের অন্যতম মূল লক্ষ্য হলো, যেভাবেই হোক চীনা বিনিয়োগকারীদের আরও আকৃষ্ট করা। পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সম্পর্ক মজবুত হলেও পাকিস্তান চায়, তা আরও জোরদার করতে। তবে পাকিস্তান সতর্ক, যাতে তা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে তার পররাষ্ট্রনীতির ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
পাকিস্তান আপ্রাণ চেষ্টা করছে চীন ও পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে। সামরিক প্রতিষ্ঠানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শদাতা যুক্তি দিচ্ছেন যে চীনের উত্থান সোভিয়েত ইউনিয়নের উত্থানের মতো নয়। তাই পাকিস্তান আরও ঘনিষ্ঠভাবে চীনের সঙ্গে জোট বাঁধতে পারে।
বিশ্লেষকদের তাদের মতে, চীন মূলত চলমান পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে ভারতীয় সামরিক কৌশল, প্রযুক্তি ও যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছে, যা দেশটির দীর্ঘমেয়াদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও সীমান্ত দ্বন্দ্বে সহায়ক হতে পারে। চীনের সামরিক আধুনিকায়নের ফলে এখন তার স্যাটেলাইট, সীমান্ত ঘাঁটি ও ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত নৌবহর থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ভারতের সামরিক পদক্ষেপগুলো পর্যবেক্ষণ সম্ভব হচ্ছে।
সংবাদদাতারা বলছেন, ভারত পাকিস্তান যুদ্ধে চীনের জে-১০ বিমানের যুদ্ধ পরীক্ষা সফল হয়েছে। এটি দিয়েই পশ্চিমা প্রযুক্তির রাফালকে ভূপাতিত করা হয়েছে। এটি চীনের সামরিক প্রযুক্তির বড় বিজয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পারমাণবিক শক্তিধর চীন ও ভারতের ৩ হাজার ৮০০ কিমি দীর্ঘ বিতর্কিত হিমালয় সীমান্ত রয়েছে। সীমান্ত নিয়ে যুদ্ধ ও ২০২০ সালের উত্তেজনার পর দুই দেশ সীমান্তে টহল নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। ভারত পাকিস্তান বর্তমান সংঘাতে ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের তথ্য- বিশেষ করে ব্রহ্ম সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র- চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই ক্ষেপণাস্ত্র এখনো কোনো সরাসরি সংঘাতে ব্যবহার করা হয়নি।
পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের ‘অল-ওয়েদার স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ’ বেশ কয়েক দশক ধরেই শক্তিশালী। পাকিস্তানে চীনা সামরিক উপদেষ্টা ও প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে চীন পাকিস্তানের মাধ্যমে ভারতের বিরুদ্ধে প্রাসঙ্গিক তথ্য পেতে পারছে বলেই অভিমত সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক জেমস চারের। তার ভাষায়, ‘পাকিস্তানে চীনা সামরিক উপদেষ্টা ও কর্মীদের উপস্থিতি সুবিদিত। পাকিস্তান যেহেতু চীন থেকে অনেক উন্নত সামরিক প্রযুক্তি আমদানি করে, তাই পিএলএ এসব তথ্য সহজেই সংগ্রহ করতে পারে।