উচ্চ আদালতের নির্দেশে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে যুক্তরাজ্য ও মরিশাস সরকারের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি শেষ মুহূর্তে সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন এক প্রতিবেদনে জানায়, দুই চাগোসীয় নারীর দায়ের করা মামলার প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার ভোররাতে বিচারপতি গুজ এই আদেশ দেন। এর ফলে চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগেই স্থগিত করা হয়।
কিন্তু তার আগে দীর্ঘ আইনি চ্যালেঞ্জ এবং মাসের পর মাস সমালোচনার পর কৌশলগতভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই চাগোস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ মরিশাসের কাছে যুক্তরাজ্যের চাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের হাতে তুলে দেওয়ার কথা ছিল।
তবে এই দ্বীপপুঞ্জের বৃহত্তম দ্বীপ দিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক ঘাঁটি আরও ৯৯ বছরের জন্য ব্যবহার চালিয়ে যেতে পারবে।
চাগোস দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দারা এই চুক্তিটি নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায়। বার্নাডেট ডুগাস ও বার্ট্রিস পম্প নামে চাগোসের দুজন নারী তাদের জন্মভূমি দিয়েগো গার্সিয়ায় গিয়ে বসবাস করতে চেয়ে সম্ভাব্য চুক্তিটির বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। মামলা করা দুই নারীর আইনজীবী মাইকেল পোলাক বলেন, ‘চাগোসবাসীদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে পরামর্শ না করেই সরকার তাদের জন্মভূমি দিয়ে দেওয়ার যে উদ্যোগ নিচ্ছে, তা চাগোসবাসীদের প্রতি অতীতের নিষ্ঠুর আচরণেরই ধারাবাহিকতা।’
তবে প্রস্তাবিত চুক্তিটি হোক বা না হোক বর্তমান ব্যবস্থায়ও গার্সিয়া দ্বীপে চাগোসবাসীদের ফেরার অনুমতি নেই।
চুক্তি নিয়ে চাগোসবাসীদের হতাশা ও ক্ষোভ বৃহস্পতিবার আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রসচিব ডেভিড ল্যামি ও মন্ত্রী স্টিফেন ডোটি চাগোসীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকের পর ‘চাগোসিয়ান ভয়েস’ সংগঠনের সদস্য জেমি সাইমন বলেন, ‘এই চুক্তিতে আমাদের জন্য ভালো কিছু নেই। আমি আতঙ্কিত ও ক্ষুব্ধ।’
চাগোস দ্বীপপুঞ্জ ১৯৬৫ সালে মরিশাস থেকে আলাদা করা হয়। সে সময় ব্রিটিশ উপনিবেশের অধীনে ছিল মরিশাস। সে সময় মাত্র ৩০ লাখ পাউন্ডে দ্বীপগুলো কিনে নিয়েছিল ব্রিটেন। তবে মরিশাসের দাবি, স্বাধীনতা অর্জনের জন্য চাপে পড়ে তারা এসব দ্বীপকে আইনবহির্ভূরতভাবে হারাতে হয়েছিল।
এরপর ১৯৭১ সালে একটি অভিবাসন আদেশের মাধ্যমে চাগোসবাসীদের নিজেদের জন্মভূমিতে ফেরত আসা নিষিদ্ধ করা হয়।
এদিকে জাতিসংঘের আদালত ও সাধারণ পরিষদ সম্প্রতি চাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে মরিশাসের পক্ষে অবস্থান নেয়। ২০১৯ সালে দ্বীপটির অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সাপেক্ষে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) রায় দেয় যে, ব্রিটেনের উচিত ‘যত দ্রুত সম্ভব’ দ্বীপপুঞ্জগুলো ফিরিয়ে দেওয়া, যাতে এখানকার ‘জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে’ উপনিবেশমুক্ত করা যায়। তবে এই রায়টি উপদেষমূলক হলেও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে এটি ব্যাপক সমর্থন নিয়ে অনুমোদিত হয়।
তবে বর্তমানে চাগোসবাসীদের মধ্যে অনেক ধরণের মতপার্থক্য রয়েছে। তাদের কেউ কেউ দ্বীপে ফিরে যেতে চান, কেউ আবার চান যুক্তরাজ্যে নিজেদের অধিকার ও অবস্থান নিশ্চিত করতে। আবার অনেকে মনে করেন বাইরের কোনো শক্তি দ্বীপের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করুক।
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যের তৎকালীন কনজারভেটিভ সরকার এই চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরু করলেও তা চূড়ান্ত করতে পারেনি। লেবার সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা আবারও এগোতে শুরু করে।
এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠছে, কেননা এই জটিলতার কারণে চাগোস দ্বীপপুঞ্জের গার্সিয়ায় অবস্থিত মার্কিন-ব্রিটিশ যৌথ সামরিক ঘাঁটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে যেতে পারে।
আবার কিছু বিরোধীরা দাবি করছেন, মরিশাসের সঙ্গে চীনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং ব্রিটিশ চাগোসীয়দের স্বার্থকে অবহেলা করা হচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে আদালতের পরবর্তী শুনানির দিকেই তাকিয়ে আছে চাগোসবাসীসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ।
এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে এই চুক্তি স্বাক্ষরের ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ের স্টারমারের অংশ নেওয়ার কথা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। সূত্র: সিএনএন
সুলতানা দিনা/