ইসরায়েল শুক্রবার (১৩ জুন) ভোরে ইরানের শতাধিক স্থাপনা লক্ষ করে একযোগে বিমান হামলা চালিয়েছে। হামলায় ৭৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন তিন শতাধিক। হামলায় বেশ কয়েকটি পরমাণু স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন এই যুদ্ধ গোটা মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়বে কিনা তা নিয়ে আলোচনা চলছে। কেননা, হামলার পর ইসরায়েল তার চারদিকে সেনা মোতায়েন করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যম সিএনএন জানায়, কয়েক বছর ধরে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর যে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে আসছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবের মুখ দেখল।
শুক্রবার ভোরের দিকে তাদের হামলায় ইরানের রাজধানী তেহরানসহ বেশ কয়েকটি শহর কেঁপে ওঠে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা অসংখ্য ছবিতে ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনা থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখা যাচ্ছে।
হামলায় ইরানের সেনাপ্রধানসহ ২০ শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও ৬ পরমাণু বিজ্ঞানী মারা গেছেন। ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও গাড়ির ছবিতে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো সয়লাব। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে এ হামলাকে গত বছরের দুই দফা হামলার সঙ্গে মেলালে ভুল হবে। গত বছর ইসরায়েল দুই দফায় ইরানে হামলা চালায়। সেগুলোকে ‘সতর্কবার্তা’ ধরলে শুক্রবারের হামলা মূলত ‘যুদ্ধের শামিল’।
সিএনএন আভাস দিয়েছে, ইরানও হামলার জবাব দেবে। এরই মধ্যে দেশটি ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে ১০০টির মতো ড্রোন ছুড়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী। সেসব ড্রোন ভূপাতিত করার ছবিও টেলিগ্রামে এসেছে।
কিন্তু এই জবাবই শেষ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের ধারণা, ইরান আরও বড় আকারে প্রতিশোধ নেবে, যা পুরো অঞ্চলকেই যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। তেমনটা হলে তাতে যুক্তরাষ্ট্রও জড়িয়ে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইউরোপের অনেক মিত্রের সঙ্গে তেল আবিবের টানাপড়েন চললেও ওয়াশিংটনের কাছ থেকে তারা সব সময়ই ইরান ও ফিলিস্তিন ইস্যুতে সমর্থন পেয়ে এসেছে। কেবল তাই নয়, ইসরায়েলে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র সরবরাহ করা দেশও যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবারের হামলায় ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া বিমান ব্যবহারের কথাও গর্ব ভরেই বলছে।
ইসরায়েল যে ইরানে হামলা করতে পারে তার ইঙ্গিত মিলেছিল কয়েক দিন ধরেই। ওয়াশিংটন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকা থেকে জরুরি নয় এমন কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও ইরানে ইসরায়েলের হামলা ‘আসন্ন’ বলে বারবারই সতর্ক করে আসছিল।
এর ধারাবাহিকতায় গতকাল ভোররাতে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানা এবং সামরিক কমান্ডারদের লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে তেল আবিব। কয়েক দফায় শতাধিক হামলায় তারা ইরানের অন্তত ৮টি স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি করেছে বলে দাবি করেছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। হামলায় ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ও রাডারেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
তেল আবিবের ভাষ্য, তেহরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে একটি দীর্ঘমেয়াদি অভিযান শুরু করা হয়েছে। এই সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ইরানি হুমকি প্রতিরোধ করা। যতদিন না এই হুমকি বন্ধ হচ্ছে, ততদিন এ অভিযান চলবে।
এর জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইসরায়েলকে ‘তিক্ত ও বেদনাদায়ক’ পরিণতি ভোগ করার প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। ইরানের পাল্টা হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েলে এরই মধ্যে জরুরি অবস্থাও জারি করা হয়েছে। পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে ইসরায়েলের বাসিন্দারা তো বটেই, মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সবাই ‘বড় যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার’ আশঙ্কা করছেন।
সমরশক্তি বিবেচনায় পশ্চিমা সহায়তাপুষ্ট ইসরায়েল এগিয়ে থাকলেও ইরানের শক্তি হচ্ছে তাদের ‘প্রতিরোধ অক্ষ’। যে অক্ষে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতিরা থেকে শুরু করে ইরাক ও সিরিয়ায় ক্রিয়াশীল অনেকগুলো মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে।
গত বছর যুদ্ধে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর শক্তি অনেকটা খর্ব করলেও সশস্ত্র গোষ্ঠীটি এখনো সক্রিয় এবং এর প্রভাব এত সহজে মুছে যাওয়ার নয় বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন গত কয়েক মাস ধরে চেষ্টা চালিয়ে আসছে। এ নিয়ে আগামীকাল রবিবার দুই পক্ষের মধ্যে ষষ্ঠ দফার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু ইসরায়েলের হামলা ওই আলোচনায় ইতি টেনে দেবে, তা বলাই বাহুল্য। গত বছর ইসরায়েল ও ইরান দীর্ঘদিনের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ ছেড়ে সরাসরি একে অপরের ওপর হামলা চালিয়েছিল। সেবার যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্র ইসরায়েলকে ইরানের জ্বালানি ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করতে নিষেধ করে দিয়েছিল। এরপর ইরানও তাদের পাল্টা হামলায় রাশ টেনেছিল। দৃশ্যত ব্যাপক হামলা করলেও তেহরান নিশানা ঠিক করেছিল এমনভাবে যেন ক্ষয়ক্ষতি খুব কম হয়। সেই তুলনায় ইসরায়েলের গতকালের হামলা ছিল ‘ভয়াবহ তীব্র’। তারা এবার ইরানের মূল পারমাণবিক ও সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ তালিকায় আছে নাতাঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনা, আছে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কারখানাও। তেল আবিবের হামলায় প্রাণ গেছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল হোসেইন সালামি ও সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মোহাম্মদ বাঘেরির।
তবে সব বিশেষজ্ঞ আবার একই রকম ভাবছেন না। আটলান্টিক কাউন্সিলের স্কোক্রফট সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড সিকিউরিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও জ্যেষ্ঠ পরিচালক ম্যাথু ক্রোয়েনিগ মনে করছেন, ইসরায়েল হামলা চালালেও ইরানের পাল্টা হামলা চালানোর সক্ষমতা কম। এ সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ইরানকেই নিতে হবে। তারা কি ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ অব্যাহত রাখবে, নাকি ঝুঁকি নিয়েই তা চালিয়ে যাবে, তার ওপরই আগামী মাস বা বছরগুলোতে ইসরায়েলি প্রতিক্রিয়া নির্ভর করবে।