ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় শক্তিশালী ক্লাস্টার বোমা নিক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সব অগ্রগতির অধ্যায় এখানেই শেষ।
অন্যদিকে, শনিবার (২১ জুন) ইরান বলছে, তারা মার্কিন হামলার একদিন আগেই ফোর্দো থেকে গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক সরঞ্জাম ও উপকরণ সরিয়ে নিয়েছে। তাছাড়া, এ স্থাপনায় এমন কোনো ক্ষতি হয়নি যে, সেটি আবার মেরামত করা সম্ভব নয়।
এটি অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা একটি দীর্ঘ এবং জটিল গল্পের প্রায় সর্বশেষ মোড়। যেটি মূলত ১৯৫৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাত ধরেই শুরু হয়।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির আদ্যোপান্ত
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৫৩ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ভাষণে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট ডি. আইজেনহাওয়ার তার ‘শান্তির জন্য পরমাণু’ বিষয়ক কর্মসূচির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইরান এবং অন্যান্য দেশগুলোকে বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি বিকাশে সহায়তা করার কথা জানান। যাতে, এই দেশগুলো শান্তিপূর্ণ, বেসামরিক পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের একটি উদ্যোগে অংশ নেওয়ার মাধ্যমে পরবর্তীতে কোনো সামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি না নেয়।
এরপর, ১৯৫৭ সালে একটি বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে তার প্রথম পারমাণবিক চুল্লি এবং জ্বালানি সরবরাহ করে যুক্তরাষ্ট্র। ৫ মেগাওয়াটের সেই পারমাণবিক চুল্লি এখনো তেহরানে কার্যকর রয়েছে।
আইজেনহাওয়ার আরও জানান, শান্তির জন্য পরমাণু কর্মসূচির অংশ হিসেবে এ উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ইরানে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারকে উৎসাহিত করা এবং ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের প্রশিক্ষণ অন্তর্ভুক্ত করা।
তারপর, ১৯৬৭ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে আমেরিকা এই পারমাণবিক চুল্লিটি তৈরি করে। তারা ইরানকে সেই চুল্লির জ্বালানিও (অস্ত্র-গ্রেড সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম) সরবরাহ করে।
তখন ইরানে মার্কিন-সমর্থিত রাজা শাহ রেজা পাহলভির শাসন চলছিল। আর ইরান ছাড়াও এই সুবিধাভোগী দেশের মধ্যে ছিল ইসরায়েল, ভারত এবং পাকিস্তান। তখন ইরানসহ বাকি দেশগুলো এই কর্মসূচির অধীনে তাদের নিজস্ব ছোট পারমাণবিক চুল্লি এবং তাদের নিজস্ব জ্বালানি পায়। কিন্তু ১৯৭০-এর দশকে ইরানে তেলের ভাণ্ডারের বিশাল উত্থানের ফলে তাদের সেই স্বল্প পরিসরের পারমাণবিক কর্মসূচি একটি পূর্ণাঙ্গ বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়। সে সময় ইরানের কাছে প্রদত্ত জ্ঞান কাজে লাগানোর এবং বৈজ্ঞানিক মনন বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ ছিল।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে পাহলভির সরকার কয়েক ডজন ইরানি শিক্ষার্থীকে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে (এমআইটি) পারমাণবিক প্রকৌশল নিয়ে অধ্যয়নের জন্য আর্থিক সহায়তা করে বলে জানায় বিশ্ববিদ্যালয়টি। এমআইটিতে প্রশিক্ষিত এই ইরানি শিক্ষার্থীরাই পরে দেশে ফিরে নিজের দেশের পারমাণবিক কর্মসূচি পরিচালনা শুরু করেন। তখন থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন প্রশিক্ষণার্থীরা।
১৯৫৯ সালে প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার তেহরানে ইরানের শাহ রেজা পাহলভির সঙ্গে দেখা করেন এবং ১৯৬০-এর দশকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানকে তার প্রথম পারমাণবিক গবেষণা চুল্লি সরবরাহ করে।
এরপর, ১৯৭০-এর দশকে এমন একটা মুহূর্ত আসে যখন আমেরিকান কর্মকর্তারা অনুধাবন করতে শুরু করেন যে, তারা হয়তো ভুল করছেন। তারা আশঙ্কা করেছিলেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টাকারী দেশগুলোর মধ্যে একটি হয়ে উঠবে। এরপর, মার্কিন কূটনীতিকরা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার জন্য আলোচনা শুরু করেন। সে সময় পাহলভির অধীনস্থ ইরান জোর দিয়ে জানিয়ে দেয়, তাদেরও যেকোনো জাতির মতো পারমাণবিক শক্তির অধিকার রয়েছে!
সে সময় শাহ রেজা পাহলভি বলেন, ‘যদি না স্পষ্ট হয় যে, ইরানকে দ্বিতীয় শ্রেণির দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে না, তাহলে তিনি বিকল্প বিক্রেতাদের সন্ধান করবেন এবং ইরানের জন্য পারমাণবিক প্রযুক্তি অর্জনের জন্য তিনি মার্কিন কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আর কাজ করবেন না।’
এর পরই ইরান পশ্চিম জার্মানি এবং ফ্রান্স থেকে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কিনে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা চুল্লিটিতে কাজ করতে থাকে।
তার পরই তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ক্যাম্পাসটি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠে। ১৯৭৯ সালে পাহলভির পতনের পর, আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনির নেতৃত্বে নতুন ইসলামপন্থি সরকার আসে। সে সময় প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ে জড়ো হয়ে তাদের নামাজের জায়গাটিকে মক্কার দিকে ঘুরিয়ে দিতেন। নামাজের সময় সেখানে ‘আমেরিকার মৃত্যু’ স্লোগান শোনা যেত।
১৯৭৯ সালের বিপ্লবে নির্বাসন থেকে ফিরে শাহকে উৎখাত করে আয়াতুল্লাহ খামেনি সমর্থকদের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পশ্চিমা প্রভাবের প্রতীক হিসেবে দেখতে শুরু করেন। কিন্তু প্রাথমিকভাবে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে তার কোনো আগ্রহ ছিল না।
এক সময় এই খামেনিই বলেছিলেন, বুশেহরের অসমাপ্ত পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে গম সংরক্ষণের জন্য সাইলো হিসেবে ব্যবহার করা উচিত! সে সময় অনেক ইরানির ধারণা ছিল, তেল সমৃদ্ধ একটি জাতির ওপর পশ্চিমাদের ব্যয়বহুল চিন্তা চাপিয়ে দেওয়ার কারণেই এগুলো পরিত্যক্ত করা হয়েছিল।
এই মনোভাব ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত টিকে ছিল। কিন্তু ততক্ষণে ইরান সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিবেশী ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল। সেই যুদ্ধের অংশ হিসেবে সাদ্দাম বারবার বুশেহর পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলা চালান, যা তখন কার্যকর ছিল না। ১৯৮০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলমান এই যুদ্ধ ইরানে তীব্র বিদ্যুৎসংকট তৈরি করে।
অবশেষে, ইরানের নেতারা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার সিদ্ধান্ত নেন। যদিও এর সঠিক কারণ স্পষ্ট ছিল না।
১৯৯৭ সালে দিকের কথা, ইরানে প্রতিদিনই খুব ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট হতো। সম্ভবত পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য এই বিষয়টিই ইরানিদের জন্য প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল।
মঞ্চে ইসরায়েলের প্রবেশ
ঠিক এই সময়ই এই মঞ্চে ইসরায়েলের প্রবেশ। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিটি যখন গতিশীল হতে থাকে, তখনই ইসরায়েল বারবারই সতর্ক করতে শুরু করে যে ইরান বিপজ্জনক পারমাণবিক অগ্রগতি করছে। ইসরায়েল এ অঞ্চলে ইরানকে হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে। আবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০০১-এর হামলার পরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগও আরও তীব্র হয়।
২০০০ সালে ইরান তার পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করার প্রস্তাব দেয়। এমনকি ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে তারা একটি চুক্তিতে পৌঁছে। কিন্তু বুশ প্রশাসনের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র তাতে স্বাক্ষর করা থেকে বিরত থাকে।
চুক্তির প্রচেষ্টাতে ব্যর্থ হয়েই ইরান হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজ তৈরি শুরু করে, যা ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে ব্যবহৃত হয়। এই আখ্যানকে ঘিরেই ইরানে জাতীয়তাবাদের এক নতুন অনুভূতি তৈরি হয়।
২০০৫ সালে ক্ষমতায় আসেন জনপ্রিয় নেতা মাহমুদ আহমাদিনেজাদ। তিনি হলোকস্টকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন এবং বুশ প্রশাসনকে অমান্য করতে শুরু করেন। ২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আহমাদিনেজাদ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির একজন জোরালো সমর্থক এবং পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
এরপর কয়েক দশক আগের পাহলভির মতো, নতুন এই ইরানও জোর দিয়ে বলতে শুরু করে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার রয়েছে। এমনকি জনগণ যখন অস্থির হয়ে উঠছিল এবং ইরানের অর্থনীতি যখন তীব্র পতনের দিকে যাচ্ছিল, তখনো আহমাদিনেজাদ তার অবস্থান ধরে রাখেন।
২০০৯ সালে আহমাদিনেজাদ পুনরায় নির্বাচিত হলে ওবামার প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করলে তা ভেঙে যায়। তখন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য শক্তি ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও জোরদার করে।
২০১৩ সালে হাসান রুহানি নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে বহির্বিশ্বের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক উন্নত করার প্রতিশ্রুতি দেন। দেশটির চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী ধর্মগুরুরা এটি অনুমোদন করেছিলেন। এদিকে, ইরানি কূটনীতিকরা ইতোমধ্যেই চুপচাপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন।
আমেরিকান কূটনীতিক উইলিয়াম বার্নস, যিনি বর্তমানে কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সভাপতি, সেই গোপন আলোচনায় আমেরিকান পক্ষের নেতৃত্ব দেন। তিনি মনে করেন, ইরানের জন্য আপসের এখনই সঠিক সময়। ২০১৩ সালের শুরুতে ইরানের বিরুদ্ধে যথেষ্ট পরিমাণে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়।
প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি ২০১৩ জানুয়ারিতে বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শন করে ইরান এবং ছয় বিশ্বশক্তির মধ্যে পারমাণবিক চুক্তির দিকে পরিচালিত আলোচনাকে সমর্থন করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ সেসময় যুক্তি দিয়েছিলেন, একটি চুক্তি সম্ভব- যদি ইরানকে কিছু মাত্রায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অনুমতি দেওয়া হয়।
কার্যত, ওবামা প্রশাসন এই যুক্তি মেনেও নিয়েছিল। নতুন চুক্তি অনুযায়ী, সেসময় ইরান নিশ্চিত করেছিল ইরানের পারমাণবিক কার্যকলাপ সীমিত থাকবে, পরিদর্শনের মাধ্যমে এটি যাচাই করা যাবে এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে। এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি তাদের প্রচেষ্টার অনুমতি দিয়েছিলেন।
চুক্তিটি কার্যকর করতে তার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। আর প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে চলা সেই গল্পের একটি মাইলফলক হচ্ছে আজকের ইরান-ইসরায়েল-যুক্ররাষ্ট্রের ত্রিমুখী সংঘাত। যে গল্প এখনও শেষ হয়নি।
সুলতানা দিনা/অমিয়/