ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ১২ দিনের এ সংঘাত কাতারের মধ্যস্থতায় অবশেষে থেমেছে। বিষয়টির প্রশংসা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে ঘটনার ধারাবাহিকতা পর্যবেক্ষণে বেশ কিছু প্রশ্ন সামনে আসে। এই সংঘর্ষের আগে যুক্তরাষ্ট্র কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমানগুলো সরিয়ে নেয়। সেনা উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ফেলা হয়। এরপরে ইরান ওই ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে এতে কোনো হতাহত হয়নি। এরপর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন এবং এটি আগে থেকে জানা ছিল এমন ইঙ্গিতও দেন। দ্য ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
হামলার আগেই আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে যুদ্ধবিমান সরিয়ে ফেলে যুক্তরাষ্ট্র
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গত ৫ জুন থেকে ১৯ জুনের মধ্যে কাতারে অবস্থিত আল উদেইদ ঘাঁটি থেকে প্রায় ৪০টি সামরিক বিমান সরিয়ে নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এটি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি। ১৯ জুন মাত্র তিনটি বিমান ঘাঁটিতে ছিল। এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা না দিলেও কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জানায়, ‘আঞ্চলিক উত্তেজনা’ ও ‘সতর্কতা হিসেবে’ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্লেষকরা এটিকে একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। যুক্তরাষ্ট্র সেনাবাহিনীর সাবেক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মার্ক শোয়ার্টজ বলেন, ‘আল উদেইদ ঘাঁটি ইরানের অত্যন্ত কাছে। তাই এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এমন জায়গায় বাহিনী ও সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতি ঠেকাতে আগে থেকেই সতর্ক থাকা উচিত।’
ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়লেও কেউ আহত হয়নি
গত সোমবার সন্ধ্যায় ইরান আল উদেইদ ঘাঁটির দিকে সাতটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। কাতারের উপপ্রধান সামরিক কর্মকর্তা শায়েক আল-হাজরি বলেন, ‘কাতারের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সাতটির মধ্যে ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে। একটি ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির সীমানার মধ্যে পড়ে। ভাগ্যক্রমে, কোনো হতাহত হয়নি। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাবর আল-নুয়াইমি যোগ করেন, ‘একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে কিছু টুকরো পড়ে সামান্য আগুন লাগে। তবে জরুরি পরিষেবা দ্রুত তা নিভিয়ে ফেলে। কোনো ব্যক্তি আহত হননি।’ যুক্তরাষ্ট্র ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’ নামে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলার পর এই প্রতিক্রিয়া আসে।
ট্রাম্প আগাম হামলার ইঙ্গিত দেন, যুদ্ধবিরতির প্রশংসা করেন
ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কিছুক্ষণ পরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লেখেন, ইরান ও ইসরায়েল ‘সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতিতে’ পৌঁছেছে। কিন্তু তার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট, তিনি আগে থেকেই জানতেন। তিনি লেখেন, ‘সবাইকে অভিনন্দন! এটি পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়েছে যে, প্রায় ৬ ঘণ্টার মধ্যে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে (যখন ইসরায়েল ও ইরান তাদের চলমান চূড়ান্ত মিশন শেষ করবে)।’ পরে ট্রাম্প আরও লেখেন, ‘ধরা যাক সবকিছু ঠিকঠাক কাজ করে, যা করবে... এই যুদ্ধটি কয়েক বছর চলতে পারত এবং পুরো মধ্যপ্রাচ্য ধ্বংস করে দিতে পারত। কিন্তু তা হয়নি এবং কখনোই হবে না!’
পর্দার আড়ালে কাতারের মধ্যস্থতা
এই যুদ্ধবিরতি কীভাবে সম্ভব হলো? রয়টার্স জানায়, কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুর রহমান আল থানির একটি ফোনকলে ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এই অনুরোধ করেছিলেন ট্রাম্প নিজে, যেহেতু ইসরায়েল আগেই চুক্তি মেনে নিয়েছিল। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরান সম্মতি জানায়। প্রথম ১২ ঘণ্টার যুদ্ধবিরতির সূচনা করে ইরান। এরপর ইসরায়েল সাড়া দেয়। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ ঘোষণা করা হয়।
রিফুয়েলিং বিমান গোপনে ইউরোপে পাঠানো হয়
অন্যদিকে, ১৫ থেকে ১৮ জুনের মধ্যে অন্তত ২৭টি মার্কিন রিফুয়েলিং বিমান ইউরোপের দিকে পাঠানো হয়। সেগুলোর বেশির ভাগ সেখানেই থেকে যায়। তবে পেন্টাগন ওইসব বিমানের গন্তব্য জানাতে অস্বীকৃতি জানায়।
এত কিছুর পরও প্রশ্নটা থেকে যায়, এটা কি সত্যিকারের যুদ্ধ ছিল, নাকি একটি সুপরিকল্পিত ভূ-রাজনৈতিক নাটক? সূত্র: দ্য ইকোনমিক টাইমস