যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি সংক্রান্ত বৈঠকে মধ্যস্থতা করে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছে পাকিস্তান। গত রবিবার সুইজারল্যান্ডে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির উপস্থিত ছিলেন। এই ঐতিহাসিক আলোচনার পর আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের ভূমিকা বেশ প্রশংসিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক সূত্রমতে, সম্পাদিত এই চুক্তিটি কোনো স্থায়ী শান্তিচুক্তি নয়। এটি মূলত একটি অন্তর্বর্তী কাঠামো মাত্র। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যকার বিপজ্জনক সংঘাত সাময়িকভাবে থামানো হয়েছে। এই চুক্তি আগামী ৬০ দিনের জন্য একটি আলোচনার সুযোগ তৈরি করেছে। এই সময়ের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পারমাণবিক সীমাবদ্ধতার মতো জটিল বিষয়ের সমাধান করতে হবে। শেষ মুহূর্তে লেবাননকেন্দ্রিক কিছু মতবিরোধের কারণে চুক্তিটি প্রায় ভেস্তে যেতে বসেছিল। কিন্তু পাকিস্তান ও কাতারের প্রচেষ্টায় এই প্রক্রিয়া রক্ষা পায়।
পাকিস্তান কেবল পরোপকারের জন্য এই মধ্যস্থতায় জড়ায়নি। এর পেছনে দেশটির নিজস্ব সুনির্দিষ্ট স্বার্থ ছিল। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ হলে পাকিস্তানের অর্থনীতি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হতো। ইরানের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রায় ৯০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান জ্বালানি সরবরাহের জন্য পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। সেখানে যুদ্ধ চললে তেলের দাম বাড়ত এবং সামুদ্রিক বাণিজ্য ব্যাহত হতো। তাই এই মধ্যস্থতা ছিল পাকিস্তানের জন্য একধরনের কৌশলগত আত্মরক্ষা।
এই কূটনীতির প্রথম সুফল ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে। পাকিস্তান বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করেছে আন্তর্জাতিক সংকট নিরসনে তারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাকিস্তানের আলোচনা কেবল অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এই মধ্যস্থতা সেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি অনেকটাই বদলে দিয়েছে। বিশ্ব এখন পাকিস্তানকে সংকটের উৎস হিসেবে নয়, বরং সংকট সমাধানের মাধ্যম হিসেবে দেখছে। ওয়াশিংটন এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছে ইসলামাবাদের কূটনৈতিক গুরুত্ব নতুন করে তৈরি হয়েছে।
পাকিস্তানের জন্য আসল পুরস্কার লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা কমলে পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে চাপ কমবে। এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে এবং জ্বালানিসংকটের ঝুঁকি হ্রাস পাবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এই সফল মধ্যস্থতার ফলে পাকিস্তান এখন ইরান, সৌদি আরব, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার সুযোগ পাচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের সামনে বড় সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা কমলে এই অঞ্চলের বাণিজ্য রুটে বড় পরিবর্তন আসবে। দীর্ঘকাল ধরে দুবাই ছিল ইরানের প্রধান বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বার। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আমিরাত ইরানি ব্যবসার ওপর কিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর ফলে ইরান এখন বিকল্প বাণিজ্য রুটের সন্ধান করছে। পাকিস্তান এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নিজেকে একটি বিকল্প রুট হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে।
এদিকে চার মাস ধরে চলা ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন কূটনৈতিক মেরূকরণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই যুদ্ধের চূড়ান্ত পরিণতিতে পাকিস্তান এক বড় কূটনৈতিক বিজয়ী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যে যুদ্ধটি ইসরায়েলের সরাসরি অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা এখন শেষ হচ্ছে ওয়াশিংটন, তেহরান এবং ইসলামাবাদের তৈরি করা একটি বিশেষ কাঠামোর মাধ্যমে।
যুক্তরাষ্ট্র এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এখন এই কূটনৈতিক ট্র্যাকটি পরিচালনা করছে। তবে ইসরায়েল এই প্রক্রিয়ায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। ভারতে নিযুক্ত ইসরায়েলি কনসাল জেনারেল ইয়ানিভ রেভাখ স্পষ্ট করেই বলেছেন, পাকিস্তান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উঠে আসুক, তা ইসরায়েল একেবারেই পছন্দ করছে না। অবশ্য জেরুজালেম মার্কিন সরকারের ওপর আস্থা রাখছে।
পাকিস্তানের এই কূটনৈতিক সাফল্যের পেছনে মূল শক্তি হিসেবে কাজ করেছে তার ভৌগোলিক অবস্থান। ইরান, আফগানিস্তান এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের মাঝখানে পাকিস্তানের অবস্থান তাকে একটি স্থায়ী কৌশলগত সুবিধা এনে দিয়েছে। অতীতে ওসামা বিন লাদেনের উপস্থিতি নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক কিংবা পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট–কোনো কিছুই ওয়াশিংটনের কাছে ইসলামাবাদের গুরুত্ব কমাতে পারেনি। ভৌগোলিক অবস্থানগত শক্তি কোনো আন্তর্জাতিক শুভেচ্ছা বা বন্ধুত্বের ওপর নির্ভর করে না, এটি একটি বাস্তব সত্য। ইসরায়েলের অস্বস্তির মূল কারণও এটিই।
সূত্র: দ্য ডন, জেরুজালেম পোস্ট