কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেদ্রো হুমকি দিয়েছেন, গ্লেনকোর এবং ড্রামন্ডের মতো বহুজাতিক খনিজ কোম্পানিগুলো যদি ইসরায়েলে কয়লা রপ্তানি অব্যাহত রাখে, তাহলে তিনি একতরফাভাবে তাদের সঙ্গে কনসেশন চুক্তি পরিবর্তন করবেন। যদিও এই কোম্পানিগুলো জানিয়েছে ,প্রেসিডেন্টের ডিক্রি মেনে তারা ইতোমধ্যেই চালান বন্ধ করে দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন।
কলম্বিয়ার উত্তর-পূর্ব লা গুয়াজিরা প্রদেশে অবস্থিত গ্লেনকোরের সেরেজন অপারেশন, বিশ্বের বৃহত্তম উন্মুক্ত কয়লা রপ্তানি খনিগুলোর মধ্যে একটি। এর মধ্যে রয়েছে ১৫০ কিলোমিটার (৯৩ মাইল) রেলপথ এবং ক্যারিবিয়ান সাগরে একটি বন্দর।
২০২৪ সালে সেরেজনের উৎপাদন ১৯ মিলিয়ন মেট্রিক টনে পৌঁছেছিল। মার্চ মাসে, কোম্পানিটি ঘোষণা করেছিল, খনিজ পদার্থের দাম কম থাকার কারণে তারা তাদের বার্ষিক তাপীয় কয়লা উৎপাদন ৫ মিলিয়ন থেকে ১ কোটি টন কমিয়ে আনবে।
মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে বলা হয়, গাজায় সামরিক অভিযান পরিচালনা করায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো এবার সরাসরি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের নির্দেশ দিয়েছেন।
পেত্রো ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে কলম্বিয়ার বন্দরগুলো থেকে ছেড়ে যাওয়া সব কয়লাবাহী জাহাজ আটকের জন্য নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন। এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এল—যখন গত বছর পেত্রো সরকার ইসরায়েলে কয়লা রপ্তানি নিষিদ্ধ করে একটি আনুষ্ঠানিক ডিক্রি জারি করেছিল। এই অবস্থান গাজার পরিস্থিতি নিয়ে কলম্বিয়ার তীব্র আপত্তির প্রতীক ছিল।
কিন্তু, প্রেসিডেন্ট পেত্রোর অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তার প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ইসরায়েলে কয়লা রপ্তানির অনুমোদন দিয়ে সরকারি নীতিকে দুর্বল করছেন।
গত বৃহস্পতিবার সামাজিক মাধ্যমে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আজও তারা ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে পূর্ণ একটি কয়লাবাহী জাহাজ ছেড়ে দিয়েছে। এটা আমার সরকারের প্রতি একটি চ্যালেঞ্জ। নৌবাহিনী ইসরায়েলের উদ্দেশ্যে যাওয়া জাহাজগুলো বন্ধ করার লিখিত নির্দেশ পাবে।’ পরে তিনি আরও কঠোরভাবে ঘোষণা করেন, ‘এক টন কয়লাও কলম্বিয়া থেকে ইসরায়েলে যাবে না।’
পেত্রোর এই সাহসী পদক্ষেপ গ্লেনকোর এবং ড্রামন্ডের মতো বহুজাতিক খনিজ কোম্পানিগুলোর সঙ্গে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এই কোম্পানিগুলো লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম উন্মুক্ত কয়লা খনি সেরেজোন পরিচালনা করে। তারা দাবি করছে, তারা আগের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার আইনি ব্যতিক্রমগুলো মেনেই কাজ করছে।
তবে পেত্রো বলছেন, অভ্যন্তরীণ প্রতারণা এবং করপোরেট চাপের কারণে প্রেসিডেন্ট পেত্রো শুধু কূটনৈতিক প্রতিবাদেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তিনি শ্রমমন্ত্রী গ্লোরিয়া ইনেস রামিরেজকে কয়লা খাতের শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকেরও নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে, সেরেজোন খনির আশপাশে বসবাসকারী ওয়াইউ আদিবাসী সম্প্রদায়সহ কয়লা খনি দ্বারা প্রভাবিত অন্যান্য আদিবাসী সম্প্রদায়ের সঙ্গে পরামর্শের ওপরও তিনি জোর দিয়েছেন।
ইসরায়েলের সঙ্গে কলম্বিয়ার সম্পর্ক ছেদ পেত্রোর বৃহত্তর কূটনৈতিক পদক্ষেপের একটি অংশ। ২০২৪ সালে কলম্বিয়া ইসরায়েলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে এবং ইসরায়েলি সামরিক সরঞ্জাম কেনা স্থগিত করে। পেত্রো লাতিন আমেরিকায় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর অন্যতম প্রধান সমালোচক হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছেন।
গাজার প্রতি সমর্থনের অংশ হিসেবে গত ১৫ জুলাই কলম্বিয়া বোগোটায় জরুরি মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করে, যেখানে ৩০ টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা গাজার সমর্থনে আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া সমন্বয় করতে একত্রিত হয়েছিলেন। একই সপ্তাহে, প্রেসিডেনশিয়াল প্রাসাদ কাসা দে নারিও ফিলিস্তিনি পতাকায় সজ্জিত করা হয়েছিল।
পেত্রোর এই পদক্ষেপ এমন এক সময়ে এল যখন কলম্বিয়ার কয়লা শিল্প উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপের সম্মুখীন। সাম্প্রতিক জিডিপি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির খনিজ খাত টানা পাঁচ ত্রৈমাসিক ধরে সংকুচিত হয়েছে। সেরেজোন খনি কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের মার্চ মাসে উৎপাদন ৫০ শতাংশেরও বেশি কমানোর ঘোষণা দিয়েছে, যার কারণ হিসেবে উচ্চ রপ্তানি খরচ এবং নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা উল্লেখ করা হয়েছে।
কলম্বিয়ার এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যেখানে অনেক দেশ গাজায় ইসরায়েলি কার্যক্রমের নিন্দা জানিয়েছে, কলম্বিয়া অন্যতম বিরল দেশ যারা একটি প্রধান রপ্তানি পণ্য বন্ধ করে সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের মতো কঠোর অবস্থানে গেছে।
এছাড়া, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট এমন এক সময়ে এই নির্দেশ দিলেন, যখন ইসরায়েলি অবরোধের কারণে গাজায় লাখো মানুষ দিনের পর দিন না খেয়ে আছে।
সুলতানা দিনা/