থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যকার সীমান্ত সংঘর্ষ তৃতীয় দিনে গড়ালে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মধ্যস্থতার উদ্যোগ নিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। স্কটল্যান্ড সফরের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি জানান, উভয় দেশের শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং উভয় পক্ষই তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধবিরতির পক্ষে।
ট্রাম্প বলেন, “এই মুহূর্তে যে যুদ্ধ চলছে, সেটার অবসান চাই। যদি সংঘর্ষ চলতে থাকে, তাহলে ওই অঞ্চলভুক্ত কোনো দেশের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে যাব না।”
উল্লেখ্য, ১৩ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রাণঘাতী এই সংঘর্ষে ইতোমধ্যে ৩০ জনের বেশি নিহত এবং এক লাখ ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। শনিবার (২৬ জুলাই) নতুন করে সীমান্তে কয়েকটি এলাকায় গোলাগুলি শুরু হয়। উভয় দেশই নিজেদের আত্মরক্ষায় হামলার দাবি জানিয়ে অপর পক্ষকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানায়।
থাইল্যান্ডের ত্রাট প্রদেশ ও কম্বোডিয়ার পুরসাত প্রদেশে নতুন সংঘর্ষ শুরু হয়, যা পূর্বের সংঘর্ষ হওয়া এলাকা থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে। মে মাসের শেষদিকে এক কম্বোডীয় সেনার মৃত্যুর পর থেকেই সীমান্তে উত্তেজনা বাড়ছিল। পরবর্তীতে উভয় পক্ষই সেনা মোতায়েন বৃদ্ধি করে। এতে করে থাইল্যান্ডের নাজুক জোট সরকারও পতনের মুখে পড়ে।
থাইল্যান্ডের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মালি সোচেতা জানান, এখন পর্যন্ত সংঘর্ষে থাইল্যান্ডের সাত সেনা ও ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক এবং কম্বোডিয়ার পাঁচ সেনা ও আটজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়ার সংঘর্ষে মধ্যস্থতার বিষয়ে ট্রাম্পের পোস্ট। ছবি: সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, “আমি থাইল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী ও কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি। উভয়েই শান্তি ও তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি চান।”
এশিয়ান আঞ্চলিক জোট আসিয়ান-এর চেয়ারম্যান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম জানান, তিনি যুদ্ধবিরতির জন্য নিজ উদ্যোগে প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কম্বোডিয়া আনোয়ারের প্রস্তাব সমর্থন করলেও থাইল্যান্ড বলেছে, তারা নীতিগতভাবে একমত।
জাতিসংঘে উভয় দেশের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে থাইল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত চেরদচাই চাইভাইভিদ বলেন, “মধ্য জুলাইয়ের পর থেকে থাই ভূখণ্ডে দুটি ঘটনায় নতুন করে স্থাপন করা ল্যান্ডমাইনে আমাদের সেনারা আহত হয়েছেন।” তিনি দাবি করেন, বৃহস্পতিবার (২৪ জুলাই) সকাল থেকে কম্বোডিয়া উসকানিমূলক হামলা চালায়।
কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, থাইল্যান্ড একটি “ইচ্ছাকৃত, উসকানিমূলক ও অবৈধ সামরিক হামলা” চালিয়েছে এবং সীমান্তে সেনা ও অস্ত্র মোতায়েন বাড়িয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, “এই সামরিক প্রস্তুতি স্পষ্ট করে যে থাইল্যান্ড আগ্রাসন বাড়ানোর ও কম্বোডিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের পরিকল্পনা করছে।” আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি থাইল্যান্ডের বিরুদ্ধে “সবচেয়ে কঠোর ভাষায় নিন্দা জানানোর” আহ্বান জানায় কম্বোডিয়া।
অন্যদিকে, থাইল্যান্ড বলেছে তারা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান চায়।
দুই দেশের মধ্যে ৮১৭ কিলোমিটার দীর্ঘ স্থলসীমান্তের বিভিন্ন অংশ এখনো নির্ধারিত নয়। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরেই মালিকানা নিয়ে বিরোধ চলছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ১১ শতকের হিন্দু মন্দির প্রোহ ভিহার এবং তা মোয়ান থম মন্দির। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত প্রোহ ভিহার মন্দিরকে কম্বোডিয়ার মালিকানায় দেয়। কিন্তু ২০০৮ সালে কম্বোডিয়া এটিকে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে গেলে বিরোধ ফের জোরদার হয়।
এরপর কয়েক বছর ধরে ছোটখাটো সংঘর্ষ চলতে থাকে, যাতে অন্তত ডজনখানেক লোক নিহত হয়। চলতি বছরের জুনে কম্বোডিয়া বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতে তুললে থাইল্যান্ড জানায়, তারা আদালতের এখতিয়ার স্বীকার করে না এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পথেই সমস্যার সমাধান চায়। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/