২০০৮ সালের ২৮মে নির্বাচিত গণপরিষদ নেপালের ২৪০ বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে দেশটিকে একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করে। এর আগে, ২০০১ সালের জুন মাসে এক কাঠমান্ডুতে তৎকালীন নারায়ণহিটি প্রাসাদে এক নৈশভোজে রাজা বীরেন্দ্র, রানী ঐশ্বর্য এবং রাজপরিবারের অন্যান্য সদস্যরা এক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।
এই ঘটনার পর প্রয়াত রাজা বীরেন্দ্রর একমাত্র ভাই জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। যদিও পরে জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং মাওবাদী বিদ্রোহের ফলে সেই রাজতন্ত্রের পতন ঘটে।
জ্ঞানেন্দ্রর অনুরোধে এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়। যার প্রতিবেদনে বলা হয়, যুবরাজ দিপেন্দ্রই (বিরেন্দ্রর ছেলে) তার পরিবারের সবার হত্যাকারী। পছন্দের নারীকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে তাঁর পরিবার রাজি হচ্ছিল না বলে তিনি নিজের মা-বাবার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ১ জুন দিপেন্দ্র হুইস্কি পান করে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে তার ভাই-বোন তাকে একটি ঘরে নিয়ে যান। এরপর দিপেন্দ্র মারিজুয়ানা ও এক অজানা কালো পদার্থ মেশানো সিগারেট পান করেন। তারপর প্রেমিকার সঙ্গে ফোনে কথা বলে রাত প্রায় ৯টার দিকে তিনি যুদ্ধের পোশাক পরেন। তারপরই তিনি দুটি রাইফেল ও একটি রিভলভার নিয়ে নৈশভোজের কক্ষে যান। সেখানে দিপেন্দ্র তার বাবা-মা, দুই ভাইবোন এবং আরও কয়েকজন আত্মীয়কে গুলি করে হত্যা করেন। যাদের মধ্যে মাত্র তিনজন বেঁচে যান। এরপর দিপেন্দ্র নিজেকেও গুলি করেন এবং চারদিন কোমায় থেকে মারা যান।
নেপালের রাজপরিবারে সেই হত্যাকাণ্ড নিয়ে আজো ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। বিশেষকরে হত্যাকান্ডটি আসলে কে ঘটিয়েছিল সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
হত্যার শিকার রাজা বিরেন্দ্রর রাজ্য পরিচালনার নীতির দিকে নজর দিলে দেখা যায়, শাসনভার হাতে নেওয়ার পর চেষ্টা করেন প্রতিবেশী চীন ও ভারতের প্রভাবমুক্ত থেকে দেশ চালানোর। বিরেন্দ্র চেষ্টা করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার। তার সময়েই ১৯৯০ সালে নেপালে গণতান্ত্রিক আন্দোলন শুরু হয়। অন্যদিকে, তার মৃত্যুর পর জ্ঞানেন্দ্র ক্ষমতা নিয়ে আন্দোলনকারী মাওবাদীদের দমনের চেষ্টা করেন।
যুক্তরাজ্যের এটন কলেজ ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা বিরেন্দ্র উদার রাজা হিসেবে বেশ সমাদৃত ছিলেন। তিনি প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় হাসিমুখে আলোচনায়ও বসেছেন।
বিপরীতে, ভারতের দার্জিলিংয়ে ও পরে কাঠমান্ডুর ত্রিভূবন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা জ্ঞানেন্দ্র ছিলেন কাঠখোট্টা ও গম্ভীর স্বভাবের। তিনি বেশ কট্টরপন্থীও ছিলেন।
জ্ঞানেন্দ্রর পরিবারের সদস্যরাও জনসাধারণের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন না। জ্ঞানেন্দ্রর উচ্ছৃঙ্খল ছেলে পরাস ২০০০ সালে গভীর রাতে প্রাসাদে ফেরার সময় এক জনপ্রিয় সংগীতশিল্পীকে গাড়িচাপা দিয়ে হত্যা করেন।
সেই ঘটনাটি সেসময় গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয় এবং জনসাধারণের মধ্যে ঘৃণা ও ক্ষোভের ঢেউ তোলে। আর এমন একটি পরিবার যখন নাটকীয়ভাবে নেপালের ক্ষমতায় বসে তখনই জনমনে সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়।
তাছাড়া, হত্যাকাণ্ডের পর কয়েকদিন কর্তৃপক্ষ একোডোম নীরব থেকে এ নিয়ে অল্প কিছু অস্পষ্ট তথ্য ছাড়া কিছুই প্রকাশ করছিল না। তদন্ত চালানো হয়েছিলও খুবই তড়িঘড়ি করে…
প্রশ্ন ওঠে,যেখানে নৈশভোজের সময় মদ্যপ রাজপুত্র দিপেন্দ্র অন্যের সহায়তায় নিজের ঘরে যান সেখানে পরে তিনি কীভাবে ভারী অস্ত্র বহন করে এতজনকে হত্যা করলেন? এছাড়া, সব আত্মীয়ই যখন নৈশভোজে উপস্থিত ছিলেন, সেখানে জ্ঞানেন্দ্র কেন অনুপস্থিত ছিলেন?
তাছাড়া, ওই হত্যাকাণ্ডের সময় জ্ঞানেন্দ্রর স্ত্রী ও ছেলে কীভাবে বেঁচে গেলেন? দিপেন্দ্র যেখানে নিজের পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছে, সেখানে জ্ঞানেন্দ্রর পরিবারের সদস্যদের কেন ছেড়ে দিলেন?
এরকম নানা অসঙ্গতির কারণে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদন জনসাধারণের বড় একটি অংশ প্রত্যাখ্যান করে।জনসাধারণ আজো মনে করে, জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসার জন্য নিজের ভাইসহ অন্যদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেন।
কাঠমান্ডুর নারায়ণহিটি প্রাসাদ ছিল কুখ্যাতভাবে গোপনীয়। সেখানে আসলে কী ঘটছে তা কখনোই জানা যায়নি। গুজব, জল্পনা আর প্রাসাদের কর্মকর্তাদের অস্পষ্ট বিবৃতির ছাড়া ২০০১ সালের সেই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পরপর প্রাসাদের অভ্যন্তরে ঠিক কী ঘটেছিল, সে রহস্যের অনেকটাই তাই আড়ালে রয়ে যায়।
সুলতানা দিনা/