ইরান তাদের রাষ্ট্রদূতদের যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি থেকে ‘আলাপ-আলোচনার জন্য’ দেশে ফিরিয়ে এনেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ইউরোপের এই তিন দেশ জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের প্রক্রিয়া চালু করায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রায় এক দশক পর প্রথমবারের মতো ইরানের ওপর জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা ফের কার্যকর হতে যাচ্ছে।
আজ শনিবার ইরানি সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানায়, “জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বাতিল হওয়া প্রস্তাবগুলো পুনর্বহালের যে দায়িত্বজ্ঞানহীন পদক্ষেপ ইউরোপের তিন দেশ নিয়েছে, তার জবাবেই জার্মানি, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতদের তেহরানে ডাকা হয়েছে।”
আরও পড়ুন: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটি, নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল হবে ইরানের ওপর
এই পদক্ষেপ এলো একদিন পর, যখন রাশিয়া ও চীন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়া ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে মাত্র চার দেশ তাদের খসড়া প্রস্তাব সমর্থন করে, ফলে নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের পথ খুলে যায়।
ইউরোপের এই তিন দেশ (E3) এক মাস আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে অভিযোগ তুলে “স্ন্যাপব্যাক” প্রক্রিয়া চালু করে। তাদের দাবি, ইরান তার পারমাণু কর্মসূচি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করছে না—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমা হামলার পর নেওয়া পাল্টা পদক্ষেপের পরিপ্রেক্ষিতে।
ইরান বলছে, জুনে ১২ দিনের সংঘাতে এসব হামলায় এক হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়।
আগামীকাল রবিবার রাত ১২টা থেকে কার্যকর হতে যাওয়া নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক, সামরিক, ব্যাংকিং ও শিপিং খাতে বৈশ্বিক সহযোগিতা নিষিদ্ধ হবে। ইতোমধ্যেই তেহরানের খোলাবাজারে ইরানি মুদ্রা রিয়াল ধসে পড়েছে—প্রতি মার্কিন ডলারের বিপরীতে এর দর নেমে গেছে ১১ লাখেরও বেশি।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA) জানিয়েছে, এ সপ্তাহে তারা ইরানের কিছু স্থাপনায় পরিদর্শন পুনরায় শুরু করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বোমায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কি না, তা জানায়নি। মস্কোয় ওয়ার্ল্ড অ্যাটমিক উইক সম্মেলনে ইরানের পারমাণু বিষয়ক প্রধান মোহাম্মদ ইসলামি আবারও অভিযোগ করেন, সংস্থাটি ইরানের স্থাপনায় হওয়া বিমান হামলার নিন্দা জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
গত কয়েক দিনে ইরান স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়া স্থগিতের দুটি প্রস্তাব দিয়েছিল, তবে পশ্চিমা শক্তিগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বৈঠকের আলোচনা সত্ত্বেও তারা কোনো অগ্রগতি দেখতে পায়নি।
ইরানি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চাপের মাধ্যমে দেশটির ইসলামী শাসনব্যবস্থা উচ্ছেদ করতে চাইছে, তাই আলোচনার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
তিনি বলেন, “যদি আসল লক্ষ্য পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ দূর করা হতো, তা সহজেই করা যেত।” তিনি আবারও নিশ্চিত করেন, ইরান কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বলেন, ওয়াশিংটন ইরানের ক্ষতি করতে চায় না, বরং আরও আলোচনায় রাজি আছে। তবে তার ভাষায়, “এ মুহূর্তে স্ন্যাপব্যাকই সঠিক ওষুধ।”
নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা। তবে সব দেশ তা কার্যকর করবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। রাশিয়ার উপ-রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি পলিয়ানস্কি শুক্রবার বলেন, মস্কোর দৃষ্টিতে এই নিষেধাজ্ঞা “অকার্যকর ও বাতিলযোগ্য”।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলো (E3) আগেই একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং বিশ্বব্যাপী দেশগুলোকে ইরানি তেল কেনা থেকে বিরত রাখতে চেয়েছে। যদিও চীনের অনেক কোম্পানি এ চাপ অমান্য করেছে। এর জেরে যুক্তরাষ্ট্র চীনের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফায় “সর্বোচ্চ চাপ” নীতি চালু করেন, যখন তিনি বারাক ওবামার আমলে হওয়া ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ান। ওই চুক্তির আওতায় ইরান ব্যাপকভাবে কর্মসূচি সীমিত করলে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সুযোগ পেত।
নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যত সেই চুক্তিতে স্থগিত থাকা জাতিসংঘের ব্যবস্থা পুনর্বহাল করছে।
গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে দেরি না করার আহ্বান জানান এবং ইঙ্গিত দেন যে ইসরায়েল প্রয়োজনে আবারও ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে হামলা চালাতে প্রস্তুত।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান অবশ্য বলেছেন, ইরান কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (NPT) থেকে বেরিয়ে যাবে না। তার ভাষায়, “কিছু শক্তি কৃত্রিম অজুহাত খুঁজে অঞ্চলকে আগুনে জ্বালিয়ে দিতে চাইছে।”
শনিবার ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) এক বিবৃতিতে জানায়, ইসরায়েলি “বিস্তারবাদ” ঠেকাতে একমাত্র উপায় “সক্রিয় ও বুদ্ধিদীপ্ত প্রতিরোধ।” তারা দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের “অশুভ পরিকল্পনা” ব্যর্থ হয়েছে।
শনিবারই ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলি লারিজানি বৈরুতে হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ, সিনিয়র আইআরজিসি কমান্ডার আব্বাস নিলফোরুশানসহ ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহতদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তিনি বলেন, এখন সব দেশই বুঝতে পারছে, ইসরায়েল “কোনো দেশকেই রেহাই দেয় না।”
এদিকে ইরানের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, চারজনকে ইসরায়েলের গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ ও নিষিদ্ধঘোষিত মুজাহিদিন-ই-খালক (এমইকে) গোষ্ঠীর হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে দুইজনকে মৃত্যুদণ্ড ও অপর দুইজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/