ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি ও আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পর্যবেক্ষণের ফলাফল নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আবারো তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়েছে।
রবিবার (২৮ সেপ্টেম্বর) ইরানের ওপর ইউরোপের দেশগুলো স্ন্যাপব্যাক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞা রবিবার থেকেই কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সিএনএনের প্রতিবেদন।
‘স্ন্যাপব্যাক মেকানিজম’ বলতে বোঝায় কোন দেশ বা প্রতিষ্ঠানের ওপর আগে কোনো এক সময় জারি করা নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর করে চাপে ফেলা।
ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা ও পর্যবেক্ষণের জন্য একটি যুগান্তকারী চুক্তির (যা JCPOA নামে পরিচিত) অংশ হিসেবে স্থগিত করার এক দশক পর ইরানের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর করার জন্য এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়।
স্ন্যাপব্যাক ২০০৬ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে প্রবর্তিত জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞাগুলো আবার কার্যকর করছে। যার মধ্যে রয়েছে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির জন্য প্রযুক্তি অর্জনের উপর নিষেধাজ্ঞা। এর আওতায় ইরানের তেল এবং আর্থিক পরিষেবা খাতও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়েছিল। কিন্তু ইউরোপের এই সিদ্ধান্তটি JCPOA-তে স্বাক্ষরকারী অন্যান্য দেশ- চীন এবং রাশিয়া, ইরানের অন্যান্য ঐতিহাসিক মিত্রদের উপর বাধ্যতামূলক নয়।
এর আগে ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্য অভিযোগ করে , তাদের কাছে সেই চুক্তির অধীনে ইরানের বাধ্যবাধকতা পূরণ না করার কারণে "স্ন্যাপব্যাক" শুরু করা ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
JCPOA নামে পরিচিত সেই চুক্তির মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির উপর বিধিনিষেধের বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হয়েছিল। যা এ বছরের ১৮ অক্টোবর স্থায়ীভাবে শেষ হওয়ার কথা ছিল।
তবে চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী কোনও দেশ যদি সিদ্ধান্ত নেয় যে, ইরান তার প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে, তাহলে সেই তারিখের আগে নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করতে পারবে।
আগস্ট মাসে, ইউরোপীয় আলোচকরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বলেন, ইরান "তার JCPOA প্রতিশ্রুতির প্রায় সম্পূর্ণ অংশ" লঙ্ঘন করেছে এবং ইউরোপ স্ন্যাপব্যাক প্রক্রিয়া চালু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
অক্টোবরে রাশিয়া নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিত্ব গ্রহণের আগে প্রক্রিয়াটি এগিয়ে নেওয়ার উপায় হিসেবে আগস্ট মাসে ইরানকে এক মাসের সতর্কতা দেওয়া হয়।
এ মাসে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং অন্যান্য ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বেশ কয়েকটি বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলোর মূল দাবি পূরণে কোনও অগ্রগতি হয়নি।
এক্ষেত্রে,ইরান একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে, আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (IAEA) পর্যবেক্ষণ এবং পরিদর্শনের নিয়ম মেনে চলতে এবং তাদের হাতে থাকা ৪০০ কেজিরও বেশি উচ্চ ক্ষমতাসমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের অবস্থা এবং অবস্থানের জন্য জবাবদিহি করতে অস্বীকৃতি জানায়।
পশ্চিমা দেশগুলো এবং ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টার অভিযোগ করে আসছে। তবে তেহরান এসব অস্বীকার করে জোর দিয়ে বলেছে যে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ এবং বেসামরিক খাতে ব্যবহারের জন্য।
আরাঘচি ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে জানান, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে IAEA-এর প্রবেশাধিকার সীমিত থাকবে এবং ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের নির্ধারিত শর্ত অনুসারে পরিচালিত হবে। তিনি আরও জানান, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদগুলো অ্যাক্সেসযোগ্য নাও থাকতে পারে, সেগুলো পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নীচে চাপা পড়ে থাকতে পারে।
এদিকে, জেসিপিওএ-তে অংশগ্রহণকারী তিনটি ইউরোপীয় দেশ - ফ্রান্স, জার্মানি এবং যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা স্ন্যাপব্যাকের পর এক বিবৃতিতে বলেন: "আমরা ইরান এবং সমস্ত রাষ্ট্রকে এই প্রস্তাবগুলো সম্পূর্ণরূপে মেনে চলার আহ্বান জানাচ্ছি।"
তেহরানের সমালোচনা করে এই মন্ত্রীরা বলেন, "বারবার JCPOA প্রতিশ্রুতি লঙ্ঘন" করার জন্য "স্ন্যাপব্যাক পদ্ধতি চালু করা ছাড়া তাদের আর কোন বিকল্প ছিল না"। তবে তারা এও বলেন যে, এটিই "কূটনীতির শেষ নয়।"
এদিকে, গত শনিবার, ইরান জানায়, তারা প্যারিস, বার্লিন এবং লন্ডন থেকে তাদের রাষ্ট্রদূতদের প্রত্যাহার করছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে, আরাঘচি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন যেখানে তিনটি দেশের স্ন্যাপব্যাকের আহ্বানকে "প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট অপব্যবহার" বলে অভিহিত করা হয়েছে।
এদিকে, এই নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে ইরান তার সিদ্ধান্তে অবিচল রয়ে গেছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, "'স্ন্যাপব্যাক'-এর মাধ্যমে তারা রাস্তা বন্ধ করে দেয়, কিন্তু মস্তিষ্ক এবং চিন্তাভাবনাই অন্য রাস্তা খুলে বা তৈরি করে দেয়।"
তবে,মাসুদ পেজেশকিয়ান সাংবাদিক ও বিশ্লেষকদের একটি দলকে বলেছেন যে তার দেশের পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) ত্যাগ করার কোনও ইচ্ছা নেই।
সুলতানা দিনা/