গাজায় ইসরায়েলের নৌ-অবরোধ ভেঙে ত্রাণ সরবরাহ করার চেষ্টাকারী বহরের অ্যাক্টিভিস্টরা জানিয়েছেন যে বুধবার ভোরে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার পর তারা আবারও তাদের নির্ধারিত পথে ফিরে এসেছেন।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলা (GSF) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রায় ২০টি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ ফ্লোটিলা থেকে ৭-২০ নটিক্যাল মাইল দূরে দেখা গেছে। আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় আছি, সম্ভাব্য বাধার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। জাহাজগুলো আমাদের বহরকে চতুর্দিক থেকে ঘিরে ফেলবে।
গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার অগ্রবর্তী জাহাজগুলোর মধ্যে একটি, আলমা (Alma)-কে একটি ইসরায়েলি যুদ্ধজাহাজ কয়েক মিনিটের জন্য ‘‘আক্রমণাত্মকভাবে ঘিরে ফেলেছিল’’। এই ঘটনার সময় জাহাজের ভেতরের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
গাজাগামী এই সর্বশেষ বহরে ৪০টিরও বেশি নৌকা এবং ৫০০ জন মানুষ রয়েছে, যাদের মধ্যে ইতালীয় রাজনীতিবিদ এবং সুইডিশ জলবায়ু অ্যাক্টিভিস্ট গ্রেটা থুনবার্গ-ও রয়েছেন।
অ্যাক্টিভিস্টদের অভিযোগ, ইসরায়েলি জাহাজটি আলমার ক্যাপ্টেনকে এড়িয়ে চলার কৌশল (এভ্যাসিভ ম্যানুভার) নিতে বাধ্য করেছিল। এরপর একই জাহাজ অন্য একটি নৌকার ওপরও অ্যাক্টিভিস্টদের বর্ণনা অনুযায়ী ‘‘হয়রানিমূলক কৌশল’’ পুনরাবৃত্তি করে।
ইসরায়েল এর আগেও বলেছিল যে তারা এই বহরকে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে দেবে না। তারা এর আগে জুন ও জুলাই মাসে জাহাজযোগে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের জন্য অ্যাক্টিভিস্টদের দুটি প্রচেষ্টা রুখে দিয়েছে।
আলমা জাহাজে থাকা থিয়াগো আভিলা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় ক্যামেরা, লাইভস্ট্রিম এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সহ নৌকার ডিভাইসগুলো অকার্যকর হয়ে গিয়েছিল। সুমুদ ফ্লোটিলার দ্বিতীয় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজ সিরিয়াস (Sirius)-এ থাকা লিসি প্রোয়েঙ্কা বলেছেন যে ইসরায়েলি জাহাজটি প্রায় ১৫ মিনিট ধরে তাদের ঘিরে রেখেছিল এবং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
সুমুদ ফ্লোটিলা বুধবার বিকেল পর্যন্ত জানিয়েছে যে তাদের নৌকাগুলো গাজা থেকে ১০০ নটিক্যাল মাইল দূরে ছিল। এর আগে প্রায় এই দূরত্ব থেকেই ইসরায়েলি বাহিনী পূর্ববর্তী বহরগুলিকে আটক করেছিল।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও আপোস প্রস্তাব
ইতালি ও গ্রিস ইসরায়েলের প্রতি অ্যাক্টিভিস্টদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
দুটি দেশ অ্যাক্টিভিস্টদের সাইপ্রাসে ত্রাণ নামিয়ে ক্যাথলিক চার্চের মাধ্যমে বিতরণ করার একটি আপোস প্রস্তাব গ্রহণ করারও আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে যে এমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া উচিত নয় যা ‘‘যারা এখনও শান্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাদের দ্বারা অপব্যবহার হতে পারে’’।
এর আগে, ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি অ্যাক্টিভিস্টদের যাত্রা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন যে তাদের এই পদক্ষেপ সংঘাতের সমাপ্তির ‘‘আশা’’ যারা নষ্ট করতে চায়, তাদের জন্য একটি অজুহাত হিসেবে কাজ করতে পারে।
ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডিয়ন সায়ার বহরটিকে থামার আহ্বান জানিয়ে এক্স-এ লিখেছেন: ‘‘দয়া করে আপনার কাছে থাকা যেকোনো ত্রাণ সাইপ্রাসের বন্দর, ইসরায়েলের আশকেলন মেরিনা বা এই অঞ্চলের অন্য কোনো বন্দরের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে গাজায় স্থানান্তর করুন।’’
অন্যদিকে, সুমুদ ফ্লোটিলা জোর দিয়ে বলেছে, ‘‘অবরোধ ভাঙার মানবিক দাবি নিয়ে বন্দরে ফিরে যাওয়া যায় না,’’ এবং তারা তাদের যাত্রা চালিয়ে যাবে।
গত সপ্তাহে ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেট্টো অজ্ঞাত হামলাকারীদের দ্বারা বহরটির ওপর রাতে ড্রোন হামলার নিন্দা করেছিলেন। এই ঘটনার পর ইতালি ও স্পেন নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করে ইসরায়েলকে ‘‘বিপজ্জনক উত্তেজনা’’ সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত করেছিল। ইসরায়েল এই ঘটনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি—তবে প্রমাণ ছাড়াই বারবার দাবি করেছে যে এই বহরটি হামাসের একটি অভিযান।
পোপ লিও চতুর্দশ-ও বহরটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অন্যদিকে, গ্রেটা থুনবার্গ এই সমালোচনার জবাব দিয়েছেন যে এই বহরটি প্রচারণার কৌশল নয়, কারণ ‘‘আমার মনে হয় না কেউ প্রচারণার জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করবে।’’
উল্লেখ্য, গাজার জন্য মার্কিন শান্তি পরিকল্পনায় অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করা, হামাসের হাতে আটক জীবিত ২০ জন ইসরায়েলি বন্দিকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেওয়া এবং মৃত বন্দিদের দেহাবশেষ মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে, যার বিনিময়ে শত শত আটক গাজাবাসীকে মুক্তি দেওয়া হবে। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/