ভারতের সঙ্গে নতুন কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রেক্ষাপটে কাবুল ও আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় পাকতিকা প্রদেশে ঘটে যাওয়া দুটি বিস্ফোরণের জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে তালেবান সরকার। বৃহস্পতিবারের এই ঘটনাগুলো দক্ষিণ এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে ঘটেছে, যা ইসলামাবাদকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
তালেবান সরকারের মুখপাত্র জবিউল্লাহ মুজাহিদ গতকাল বৃহস্পতিবার জানান, কাবুলে একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে এবং এর কারণ তদন্তাধীন। সে সময় তিনি ঘটনাটিকে তেমন গুরুতর নয় বলে উল্লেখ করেন। এক্স (পূর্বে টুইটার)-এ পোস্ট করে তিনি বলেন, “কাবুল শহরে একটি বিস্ফোরণ শোনা গেছে। তবে উদ্বেগের কিছু নেই। সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি এবং তদন্ত চলছে।”
তবে শুক্রবার আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, কাবুল ও পাকতিকার বিস্ফোরণের পেছনে পাকিস্তানের হাত রয়েছে। মন্ত্রণালয় কোনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি।
এই ঘটনাগুলো এমন এক সময় ঘটল যখন আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সম্পর্ক ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করছে, ২০২১ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবান সরকার পাকিস্তান তেহরিক-ই-তালেবান (টিটিপি) নামের সশস্ত্র গোষ্ঠীকে আশ্রয় দিচ্ছে—যাদের ওপর পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলার দায় বর্তেছে।
বিস্ফোরণের খবর ছড়িয়ে পড়ার সময়েই তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি ছয় দিনের সফরে ভারতে পৌঁছান—তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর এটাই তার প্রথম সফর।
ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে জোর গুঞ্জন ওঠে, পাকিস্তান এই বিস্ফোরণের নেপথ্যে রয়েছে এবং এর লক্ষ্য ছিল টিটিপির শীর্ষ নেতারা, বিশেষ করে সংগঠনের প্রধান নূর ওয়ালি মেহসুদ। তবে আফগান কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেহসুদ নিরাপদ আছেন।
শুক্রবার পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জেনারেল আহমদ শরিফকে প্রশ্ন করা হলে, পাকিস্তান কি টিটিপি নেতাদের হত্যা করতে আফগানিস্তানে হামলা চালিয়েছে কিনা—তিনি তা নিশ্চিত বা অস্বীকার কোনোটিই করেননি। তিনি বলেন, “আফগানিস্তানকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এর প্রমাণও আমাদের হাতে আছে। পাকিস্তানের জনগণের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় যা প্রয়োজন, তা করা হবে এবং করা হচ্ছে।”
এ বিষয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আল জাজিরার কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয়নি।
একসময় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত আফগান তালেবান সাম্প্রতিক সময়ে তাদের পররাষ্ট্রনীতি পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। তারা এখন ভারতের মতো আঞ্চলিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সহজ হয়।
অন্যদিকে পাকিস্তান অভিযোগ করছে, ভারত তাদের ভূখণ্ডে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিচ্ছে—যা নয়াদিল্লি অস্বীকার করেছে।
আরও পড়ুন: ৪ বছর পর কাবুলে দূতাবাস খুলছে ভারত, তালেবানের সঙ্গে নতুন সম্পর্কের ইঙ্গিত
আরও পড়ুন: কাবুলে পাকিস্তানের বিমান হামলা
কাবুল-ইসলামাবাদ সম্পর্কের নাজুক অবস্থা
২০২৪ সাল ছিল সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী। কারণ পাকিস্তানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), বেলুচ বিদ্রোহী গোষ্ঠী, এবং আইএস-সংঘটিত হামলার কারণে ২ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়, যা ছিল গত এক দশকের মধ্যে পাকিস্তানের সবচেয়ে সহিংস বছর। এরপরও দুই দেশ সম্পর্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা শুরু করে।
গত এপ্রিলে পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ইসহাক দার কাবুল সফর করেন। চীনসহ কয়েকটি দেশের মধ্যস্থতায় ধারাবাহিক বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা উন্নতি হলেও সহিংসতা পুরোপুরি থামেনি।
ইসলামাবাদভিত্তিক ‘পাকিস্তান ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ’ (পিআইসিএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে সহিংসতায় মৃতের সংখ্যা প্রায় ২০২৪ সালের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট’ (এসি-এল-ই-ডি)-এর তথ্যমতে, ২০২১ সাল থেকে পাকিস্তানে সহিংসতার মূল উৎস টিটিপি। সংস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “গত এক বছরে টিটিপি পাকিস্তানের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অন্তত ৬০০টি হামলা বা সংঘর্ষে জড়িত ছিল। ২০২৫ সালের শুরু থেকেই তাদের তৎপরতা ২০২৪ সালের পুরো বছরের চেয়ে বেশি।”
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তানে সহিংসতা আরও বেড়েছে। উত্তর-পশ্চিমের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে ধারাবাহিক হামলায় ডজনখানেক সেনা নিহত হয়েছে। শুক্রবার সেনাবাহিনী জানায়, ওই অঞ্চলের ওরাকজাই জেলায় সাম্প্রতিক এক হামলায় জড়িত ৩০ জনেরও বেশি যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে।
শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই অন্তত ১৩৫ জন নিহত ও ১৭৩ জন আহত হয়েছে। ওই মাসে আহত সেনাদের দেখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ আফগান সরকারকে কড়া সতর্কবার্তা দেন।
তিনি বলেন, “তাদের দুটি পথের একটিই বেছে নিতে হবে—যদি তারা আন্তরিকতা ও সদিচ্ছা নিয়ে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চায়, আমরা প্রস্তুত। কিন্তু যদি তারা সন্ত্রাসীদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না।”
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেন, “আফগান সরকারের সঙ্গে বছরের পর বছর আলোচনা চললেও পাকিস্তানে রক্তপাত বন্ধ হয়নি। প্রতিদিন আমাদের সেনাদের জানাজা হচ্ছে। আমরা ছয় মিলিয়ন আফগান শরণার্থীর আতিথেয়তার ৬০ বছরের মূল্য দিচ্ছি আমাদের রক্ত দিয়ে।”
১৯৮০-এর দশকে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর থেকে পাকিস্তান লাখ লাখ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ইসলামাবাদ ব্যাপক বহিষ্কার অভিযান চালাচ্ছে, যার ফলে এখন পর্যন্ত প্রায় দশ লাখ আফগানকে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
এদিকে পাকিস্তান-আফগানিস্তানের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সংঘাতের মধ্যে প্রতিবেশি ভারতকে আরও কাছে টানছে আফগানিস্তান যা পাকিস্তানের জন্য মোটেও সুখকর নয়। গতকাল বৃহস্পতিবার দিল্লি সফর করেন আফগান পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি। তিনি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে চার বছর পর কাবুলে পূর্ণাঙ্গ দূতাবাস চালু করার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। এ পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার ও আগের সরকার পতনের পর প্রথমবারের মতো তালেবান সরকারের সঙ্গে দিল্লির আনুষ্ঠানিক উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হতে যাচ্ছে। এ বৈঠক চলাকালে আফগানিস্তানের চার প্রদেশে বিমান হামলা করে পাকিস্তান। এ হামলা মূলত পাকিস্তানের ১১ সেনা কর্মকর্তা হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান।
ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস ও সম্ভাব্য সংঘাত
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের উত্তেজনা সীমান্ত অতিক্রম করে সামরিক সংঘর্ষেও গড়িয়েছে। পাকিস্তান একাধিকবার আফগান ভূখণ্ডে বিমান হামলা চালিয়েছে—সর্বশেষটি ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান যদি সত্যিই কাবুলের সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের পেছনে থাকে, তবে এর পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।
কাবুলভিত্তিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক তামিম বাহিস আল জাজিরাকে বলেন, “তালেবান সবসময় টিটিপি যোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কাবুলে যদি পাকিস্তানের হামলার সত্যতা প্রমাণিত হয়, তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হবে। আগের পাকিস্তানি হামলাগুলোর কোনো ফল পাওয়া যায়নি, বরং এতে পারস্পরিক অবিশ্বাস বেড়েছে।”
তিনি বলেন, “এই ঘটনার পর আলোচনা ও সহযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে।”
২০২২ সালে কাবুলে সর্বশেষ বড় টার্গেটেড হামলায় আল-কায়েদা নেতা আইমান আল-জাওয়াহিরি যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছিলেন।
ইসলামাবাদভিত্তিক বিশ্লেষক ইহসানউল্লাহ টিপু মেহসুদ মনে করেন, পাকিস্তান যদি সত্যিই এই হামলায় জড়িত থাকে, তবে তা সাম্প্রতিক টিটিপি হামলার প্রতিক্রিয়ায় দেওয়া এক ধরনের ‘সতর্কবার্তা’। তিনি বলেন, “পাকিস্তান হয়তো কাবুলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও কান্দাহারে তালেবানের ধর্মীয় নেতৃত্ব—দুই জায়গাকেই লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যদি আফগানিস্তান টিটিপিকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়।”
তবে বাহিস সতর্ক করে বলেন, “যদি পাকিস্তান আফগান ভূখণ্ডে হামলা চালানো অব্যাহত রাখে, তাহলে আফগানদের একাংশের মধ্যে টিটিপির প্রতি সহানুভূতি বাড়তে পারে, যা নতুন সদস্য সংগ্রহ, অর্থায়ন এবং তালেবানের অভ্যন্তর থেকেও নীরব সমর্থন এনে দিতে পারে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “যদি সত্যিই টিটিপি নেতাদের কাবুলে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়ে থাকে, তাহলে গোষ্ঠীটি আরও ভয়ঙ্কর প্রতিশোধমূলক হামলার পথে যেতে পারে। এতে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে সহিংসতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।” সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/