যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানিয়েছেন, দেশটি আইডাহো অঙ্গরাজ্যের একটি সামরিক ঘাঁটিতে কাতার বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। গতকাল শুক্রবার দেওয়া এই ঘোষণার পর অনলাইনে সমালোচনা শুরু হলে হেগসেথ স্পষ্ট করেন যে, ঘাঁটিটির নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনেই থাকবে—এটি কোনো বিদেশি সামরিক ঘাঁটি নয়।
আন্তর্জাতিকভাবে মিত্র দেশগুলোর পাইলটদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ দেওয়া নতুন কিছু নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সিঙ্গাপুর, জার্মানি ও ন্যাটো সদস্য দেশগুলোর (যেমন নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, যুক্তরাজ্য) বিমানবাহিনীর সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।
কেন কাতারের প্রশিক্ষণকেন্দ্র আইডাহোতে?
কাতারের বিমানবাহিনীর সদস্যরা আইডাহোর মাউন্টেন হোম এয়ার ফোর্স বেসে এফ–১৫ যুদ্ধবিমান পরিচালনা শেখার প্রশিক্ষণ নেবেন। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬৬তম ফাইটার উইংয়ের অধীনে পরিচালিত হবে।
কাতারের ভূমির আয়তন তুলনামূলক ছোট (মার্কিন অঙ্গরাজ্য কানেকটিকাটের চেয়েও সামান্য ছোট), ফলে দেশটিতে বড় আকারের লাইভ-ফায়ার বা যুদ্ধ-প্রস্তুতি অনুশীলন করা কঠিন। এজন্য তারা বিদেশে প্রশিক্ষণ স্থল খুঁজছিল।
২০২২ সালের এক সরকারি প্রতিবেদনে বলা হয়, কাতার এমন একটি স্থানের অনুরোধ জানায় যার ভূপ্রকৃতি তাদের মরুভূমির সঙ্গে মিল আছে। আইডাহোর মাউন্টেন হোম একটি শুষ্ক মরু মালভূমি এলাকায় অবস্থিত, যা কাতারের ভূপ্রকৃতির সঙ্গে প্রায় অভিন্ন।
২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র কাতারকে এফ–১৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির অনুমোদন দেয়। সেই সময়ই কাতার যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে প্রশিক্ষণ সুবিধা চায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, যুক্তরাজ্যেরও একটি যৌথ স্কোয়াড্রন রয়েছে যেখানে ব্রিটিশ ও কাতারি পাইলটরা একসঙ্গে কাজ করেন—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এটি লন্ডনের প্রথম এমন যৌথ স্কোয়াড্রন।
যুক্তরাষ্ট্রে আর কোন দেশগুলোর প্রশিক্ষণকেন্দ্র আছে?
জার্মান বিমানবাহিনীর ট্যাকটিক্যাল ট্রেনিং কমান্ড বর্তমানে টেক্সাসের শেফার্ড এয়ার ফোর্স বেসে অবস্থিত। ১৯৫৮ সাল থেকেই জার্মান পাইলটরা যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন।
একইভাবে, শত শত সিঙ্গাপুরি বিমানবাহিনীর সদস্যও মাউন্টেন হোম ঘাঁটিতে অবস্থান করেন। তারা এফ–১৫ যুদ্ধবিমানে দক্ষতা অর্জনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সিঙ্গাপুরের ছোট ভৌগোলিক আয়তনের কারণে তাদেরও বিদেশে প্রশিক্ষণ নিতে হয়—যেমন অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে বিশাল প্রশিক্ষণক্ষেত্র ও লাইভ-ফায়ার সুবিধা আছে।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরকে মাউন্টেন হোম ঘাঁটিতে আরও অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি দেয়। নেদারল্যান্ডস, যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোর অন্যান্য দেশগুলোর পাইলটরাও যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষণ নেয়।
তবে ২০১৯ সালে ফ্লোরিডার একটি ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণরত সৌদি বিমানবাহিনীর এক কর্মকর্তা গুলিবর্ষণ করে তিনজন মার্কিন সেনাকে হত্যা করেন। পরে ২১ জন সৌদি সদস্যকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কার করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের কি অনুরূপ ঘাঁটি আছে বিদেশে?
হ্যাঁ, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বহু দেশে পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করে, যেখানে হাজার হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করেন।
কাতারেই অবস্থিত আল-উদেইদ এয়ার বেস, যা মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এটি ইরাক, আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ২০১৯ সালের এক কংগ্রেসীয় প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে প্রায় ১৩ হাজার মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
এছাড়া কাতার যুক্তরাষ্ট্রকে একটি বোয়িং ৭৪৭ বিমান উপহার দিচ্ছে—যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাট ও কিছু রিপাবলিকান বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, এটি ভবিষ্যতে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ব্যবহারে গেলে তা বেআইনি হতে পারে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি সেনা জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছে বলে সরকারি পরিসংখ্যানে উল্লেখ রয়েছে। সূত্র: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
মাহফুজ/