চলমান যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় মোট ৩ হাজার ৭০০ ফিলিস্তিনি কারাবন্দিকে মুক্তি দিয়েছে ইসরায়েল। সোমবার (১৩ অক্টোবর) দু’টি ব্যাচে এই কারাবন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় কারাগার দপ্তরের জনসংযোগ বিভাগ।
গাজায় যেসব কারাবন্দি এসে পৌঁছেছেন, তাদের সবাইকে প্রাথমিক মেডিকেল পরীক্ষা করেছে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের নাসার মেডিকেল কমপ্লেক্স।
ফিলিস্তিনের বন্দী বিষয়ক কমিশন এবং প্রিজনার্স ক্লাব জানিয়েছে, অনেক মুক্তিপ্রাপ্তদের শরীরে নির্যাতন এবং মানসিক আঘাতের দৃশ্যমান চিহ্ন রয়েছে। দলগুলো জানিয়েছে, তাদের মুক্তির মুহূর্ত পর্যন্ত নির্যাতন অব্যাহত ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা বর্ণনা করেছেন, বাস থেকে নামার সময় কিছু বন্দী ভেঙে পড়েছিলেন, রেড ক্রসের কর্মীরা তাদের দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিল।
কারাবন্দীদের স্বাগত জানাতে গত সোমবার পশ্চিম তীরের বেইতুনিয়া ও গাজার খান ইউনিসে জড়ো হয়েছিলেন শত শত ফিলিস্তিনি। দুই বছর ধরে চলা অভিযানে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক শত শত ফিলিস্তিনি বাড়ি ফেয়ার পর যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্যের জন্ম দেয়।
দক্ষিণ গাজার নাসের হাসপাতালের বাইরে রেডক্রসের প্রথম চালানের বাসগুলো প্রায় এক হাজারেরও বেশি বন্দী নিয়ে আসলে সেখানে ভিড় জমে যায়। বন্দীদের পরিবারগুলো সেখানে কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে তাদের প্রিয়জনদের জড়িয়ে ধরে, যাদের অনেকেই দুর্বল এবং দৃশ্যত অপুষ্টিতে ভুগছে।
তাদের একজন ইসলাম আহমেদ বলেন, “আমাকে বেইত লাহিয়ার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। আমি সেখানে একমাত্র সাংবাদিক ছিলাম।”
হাসি এবং ক্লান্তিতে ভেঙে যাওয়া কণ্ঠস্বর নিয়ে সাংবাদিক আহমেদ বলেন, “আটকের অবস্থা ছিল শোচনীয়। মারধর এবং অপমান অসহনীয় ছিল।”
তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে আটকের আগে আহমেদের ওজন ছিল ১০৬ কিলোগ্রাম (প্রায় ২৩৪ পাউন্ড); মুক্তি পাওয়ার সময় তার ওজন ছিল ৭৬ কিলোগ্রাম (প্রায় ১৬৭ পাউন্ড)।
বেশিরভাগই ইসরায়েলের প্রিজন সার্ভিসের লোগো সম্বলিত ধূসর ট্র্যাকস্যুট পড়ে ছিলেন, তাদের ফ্যাকাশে মুখ এবং পাতলা শরীর বন্দীদশার যন্ত্রণা প্রকাশ করছিল।
৩৮ বছর বয়সী মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দী জুমা সাইদ হামদিন তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে তার অগ্নিপরীক্ষার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন, "আমি প্রায় চার মাস হাত বাঁধা এবং চোখ ঢেকে কাটিয়েছি। এমনকি সাপ্তাহিক গোসলের সময়ও আমাদের চোখ খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়নি। আমাদের ২৪ ঘন্টা হাঁটু গেড়ে বসে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল।"
হামদিন আরও বলেন, "রক্ষীরা বন্দীদের কেবল কয়েক ঘন্টা ঘুমাতে দিত এবং তারপর আবার হাঁটু গেড়ে বসতে জাগিয়ে তুলত। যে কাউকে ঘুমন্ত অবস্থায় ধরা পড়ত তাকে প্রচন্ড মারধর করা হত।"
সবশেষে হামদিন বলেন, “আমি আমার পুরনো জন্মদিন, ৭ আগস্ট, ১৯৮৭ মুছে ফেলেছি। আমার নতুন জন্মদিন আজ, ১৩ অক্টোবর, ২০২৫। আমার পুনর্জন্ম হয়েছে। এটা এমন এক আনন্দ যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।”
এদিকে, জানা গেছে মুক্তি পাওয়া এসব কারাবন্দীদের মধ্যে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত কোনো আসামি নেই। ইসরায়েল আগেই জানিয়েছিল, মৃত্যুদণ্ডের সাজাপ্রাপ্ত কোনো ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হবে না।
সুলতানা দিনা/