মায়ানমারে বেলারুশের মডেল ভেরা ক্রাভৎসোভার নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রহস্য। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, ২৬ বছর বয়সী এই মডেলকে থাইল্যান্ড থেকে অপহরণ করে মায়ানমারের মানব পাচারকারীদের একটি প্রতারণা কেন্দ্রে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে তাকে হত্যা করে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়েছে বলেও খবর ছড়ায়। তবে থাই কর্তৃপক্ষ এসব দাবি অস্বীকার করেছে।
জানা গিয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ভেরা অনলাইনে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে একটি মডেলিং গিগে কাজ পেয়েছিলেন। সেখানে পেশাদার ফটোশুট, বেতনভুক্ত থাকার ব্যবস্থা এবং একটি নির্দিষ্ট বেতনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল।
ক্যারিয়ার গড়ার আকাঙ্ক্ষায় ভেরা কোনও সময় নষ্ট না করে দ্রুত ফ্লাইট বুকিং করেন এবং ১২ সেপ্টেম্বর থাইল্যান্ডে অবতরণ করেন।
তবে, এই তরুণী জানতেন না যে, তার যাত্রা এক ভয়াবহ মোড় নিতে চলেছে। তার 'নিয়োগকর্তারা' আসলে ছিল মানব পাচারকারীদের একটি দল।
থাই ইমিগ্রেশন বিভাগ জানায়, ভেরা ক্রাভৎসোভা গত ১২ সেপ্টেম্বর ব্যাংককের সুবর্ণভূমি বিমানবন্দরে প্রবেশ করেন এবং ২০ সেপ্টেম্বর থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন। বায়োমেট্রিক যাচাইয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তিনি নিজেই বিমানবন্দরে প্রবেশ ও প্রস্থান করেছেন। অর্থাৎ, তাকে কেউ অপহরণ করেনি।
থাই পুলিশ মেজর জেনারেল চেরংগ্রন রিমফাদি বলেন, ‘সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, তিনি নিজের ইচ্ছাতেই যাচ্ছিলেন, কোনো জোরজবরদস্তির চিহ্ন নেই। থাইল্যান্ডের বাইরে কী ঘটেছে, সেই বিষয়ে আমাদের এখতিয়ার নেই।’
এদিকে মায়ানমারে নিযুক্ত বেলারুশের রাষ্ট্রদূত ভ্লাদিমির বরোভিকভ গণমাধ্যমে প্রচারিত হত্যার খবরকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভেরার মৃত্যুর খবর এখনো যাচাই করা হয়নি। এভাবে যাচাই না করে তথ্য ছড়ানোর ফলে তার পরিবারের জন্য কষ্ট বাড়াচ্ছে।
রাষ্ট্রদূত জানান, ভেরা গত ২০ সেপ্টেম্বর ব্যাংকক থেকে ইয়াঙ্গুনে যান এবং পরিবারের সঙ্গে তার শেষ যোগাযোগ হয় ৪ অক্টোবর।
রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম ‘কমসোমলস্কায়া প্রাভদা’ দাবি করেছে, মায়ানমার কর্তৃপক্ষের একটি নথিতে বলা হয়েছে, ভেরার মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাকে এবং ১৬ অক্টোবর তার দেহ দাহ করা হয়। তবে এই নথির সত্যতা নিশ্চিত হয়নি।
অপর দিকে কয়েকটি ট্যাবলয়েড দাবি করেছে, থাইল্যান্ডে মডেলিংয়ের চাকরির প্রলোভনে গিয়ে অপহৃত হন ভেরা এবং মায়ানমারের এক প্রতারণা কেন্দ্রে তাকে দাসত্বে বাধ্য করা হয়।
সেই প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে যাওয়ার পর পাচারকারীরা তার মোবাইল ফোন এবং পাসপোর্ট কেড়ে নিয়েছিল যাতে সে তার প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। এরপর তাকে বন্দী করে একটি শ্রম শিবিরে কাজ করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
যেখানে তার দায়িত্ব ছিল একজন গ্ল্যামারাস মডেল হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা এবং ডেটিং সাইটে একাকী পুরুষদের সাথে প্রেমের ফ্লার্ট করা এবং তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা।
পরের সপ্তাহে, তার পরিবারের সঙ্গে এই দলটি যোগাযোগ করে পাঁচ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করে জানায়, অন্যথায় ভেরাকে "হত্যা" করা হবে এবং তার "অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেটে নেওয়া হবে"।
এরপর তার পরিবার সেই অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তারা খবর পায় যে, ভেরা মারা গেছে, তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করা হয়েছে এবং তার দেহ ইতোমধ্যেই দাহ করা হয়েছে।
জানা গিয়েছে, মায়ানমারে একইভাবে একজন ২৪ বছর বয়সী সার্বিয়ান নারীও এই প্রতারক মানবপাচারকারী দলের শিকার হয়েছিলেন। তবে দাশিনিমা ওচিরনিমায়েভা নামের সেই নারী রাশিয়ান কূটনীতিকদের হস্তুক্ষেপের ফলে বেঁচে যান।
এদিকে, বেলারুশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে তারা ভেরার প্রিয়জনদের পূর্ণ সহায়তা প্রদান করবে যাতে তার দেহাবশেষ তার স্বদেশে ফিরিয়ে আনা যায় এবং ন্যায়বিচারের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।
সুলতানা দিনা/