ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) নিশ্চিত করেছে যে তারা হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী সাইপ্রাস-নিবন্ধিত একটি ট্যাংকারকে আটক করেছে।
টালারা নামে মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী ট্যাংকারটি গতকাল শুক্রবার সকালে ৩০ হাজার টন পেট্রোকেমিক্যাল বহন করা অবস্থায় জব্দ করা হয়, এ তথ্য রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে দেওয়া আইআরজিসির বিবৃতিতে জানানো হয়।
আইআরজিসি বলেছে, “বৈধ কর্তব্য পালন, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং বিচার বিভাগীয় আদেশের ভিত্তিতে এই অভিযান সফলভাবে পরিচালিত হয়েছে।” সংস্থাটি অভিযোগ করেছে, জাহাজটি অনুমোদনবিহীন কার্গো পরিবহনের ‘আইন লঙ্ঘন’ করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাও জানিয়েছে, টালারাকে আইআরজিসি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।
সাইপ্রাসভিত্তিক কলম্বিয়া শিপম্যানেজমেন্ট পরিচালিত টালারা সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দর থেকে সিঙ্গাপুরের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। কোম্পানি জানিয়েছে, জাহাজটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তারা ক্রুদের নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মালিকপক্ষ ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থার সঙ্গে কাজ করছে। জাহাজটি উচ্চ-সালফার গ্যাস অয়েল বহন করছিল—যা মূলত মেরিন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলোও ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করছে।
যুক্তরাজ্য মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, খোরফাক্কান শহরের পূর্বদিকে ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে ঘটনাটি ঘটে এবং এতে “রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম” জড়িত ছিল।
নিরাপত্তা সংস্থা অ্যাম্ব্রে জানিয়েছে, দক্ষিণমুখী টালারার কাছে তিনটি ছোট নৌকা এগিয়ে আসে এবং পরে জাহাজটি ওমান উপসাগর হয়ে ইরানের দিকে মোড় নেয়।
সংবাদ সংস্থা এপি বিশ্লেষিত তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনীর এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন জাহাজ আটকানোর সময় কয়েক ঘণ্টা ওই অঞ্চলে চক্কর দেয়।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, তারা ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
তাদের বিবৃতিতে বলা হয়, “বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবাধ নৌচলাচলের অধিকার রয়েছে।” তবে তারা কোনো পক্ষকে দায়ী করেনি।
এটি গত এক বছরের মধ্যে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের প্রথম এমন অভিযান।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে আইআরজিসি টোগো-ফ্ল্যাগযুক্ত একটি ট্যাংকার জব্দ করেছিল, যাকে তারা ‘পদ্ধতিগতভাবে জ্বালানি চোরাচালান’-এ জড়িত বলে অভিযোগ করেছিল।
২০২৪ সালের এপ্রিলে আইআরজিসি কমান্ডোরা হেলিকপ্টার থেকে নেমে একটি পর্তুগিজ-ফ্ল্যাগযুক্ত কন্টেইনার জাহাজ দখল করে—যা এক ইসরায়েলি ব্যবসায়ীর সঙ্গে যুক্ত ছিল। ঘটনা ঘটে ইসরায়েল সিরিয়ায় ইরানের কনস্যুলেটে হামলা চালানোর কয়েকদিন পর।
২০২৩ সালে ভারত মহাসাগরে আরেকটি ইসরায়েল-সংযোগযুক্ত জাহাজ ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করে।
২০২২ সালে ইরান দুইটি গ্রিক ট্যাংকার আটক করে, যা মুক্তি পায় কয়েক মাস পর—গ্রিসে মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আটক ইরানি ট্যাংকার ফেরত আসার পর।
২০১৯ সালেও হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে দায়ী করেছিল।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বজুড়ে মোট বাণিজ্যিক তেলের প্রায় ২০ শতাংশ এবং বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন করে—ফলে এটি অত্যন্ত কৌশলগত রুট।
এসব ঘটনার পেছনে প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হয়—২০১৮ সালে ট্রাম্পের ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সরে আসা এবং এর পর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপকে।
২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলায়মানিকে হত্যা করে। সেই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে তারা ইরানের বেশ কয়েকটি পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়।
এর মধ্যে শুক্রবার টালারা জব্দের ঘটনা ঘটে এমন সময়, যখন তেহরানে ইরান তাদের বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শনী শুরু করেছে।
আইআরজিসি জানায়, তারা নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি এবং যুদ্ধে ধ্বংস হওয়া বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুনর্নির্মাণে জোর দিচ্ছে। ওই যুদ্ধে ইরানের বহু শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণু বিজ্ঞানীসহ এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/