মানবাধিকার ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন গত কয়েকমাসে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে । যদিও স্বার্থরক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সব প্রশাসনই বিশ্বের বিতর্কিত নেতাদের সঙ্গে সখ্য বজায় রেখেছে। তবে এরপরও বৈশ্বিক মানবাধিকার ইস্যুতে সব মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রকাশ্যে কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড বজায় রাখতেন।
কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে অনেকটা সরে এসেছেন বলে মন্তব্য করছেন বিশ্লেষকরা।
তুরস্কের দূতাবাসে আরব নিউজের সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যায় তার সর্বশেষ মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের (এমবিএস) ওয়াশিংটন সফরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সালমানের পক্ষ নিয়ে বলেন, ২০১৮ সালে খাশোগি হত্যার বিষয়ে এমবিএস আগে থেকে অবগত ছিলেন না।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়ন একরকম অগ্রাহ্য করে এই মন্তব্য 'স্বৈরশাসকদের' প্রতি তার নমনীয়তার পাশাপাশি মানবাধিকার ইস্যুতে প্রশাসনের নীতিগত অবস্থানের পরিবর্তন স্পষ্ট করে।
ট্রাম্প শুধু সৌদি আরব নয়, হাঙ্গেরি, চীন, এল সালভাদর এবং রাশিয়ার নেতা, যাদের সাধারণত মার্কিন প্রশাসন স্বৈরাচার আখ্যা দিয়ে থাকে, সবার প্রতিই অনেকটা নমনীয়তা প্রদর্শন করে আসছেন। তাদের নিন্দা করার বদলে, সম্পর্কগুলোতে দেনাপাওনার দিকেই মনোযোগ দিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্পের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং অর্থনৈতিক চুক্তিকে বিবেচনায় নিয়ে এখন সব ঢেলে সাজানো হচ্ছে।
বিভিন্ন দেশে মানবাধিকার ও এলজিবিটিকিউদের নিপীড়নে যুক্তরাষ্ট্রের মৌনতার সাফাই গেয়ে ট্রাম্পের উপদেষ্টারা বলছেন, অন্য দেশের সার্বভৌমত্বে হস্তক্ষেপ এড়াতে তারা এই পন্থা অবলম্বন করেছেন।
অথচ এই একই প্রশাসন রোমানিয়া, জার্মানি, ফ্রান্সসহ একাধিক দেশের বিরুদ্ধে ডানপন্থি নেতাদের ওপর 'দমনমূলক' নীতি চাপিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'সেনসরশিপ' নিয়ে সরব হয়েছে এবং ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারোর বিচারকে কেন্দ্র করে বামপন্থি সরকারের ওপরও প্রকাশ্যে চাপ বৃদ্ধি করছে।
বিভিন্ন দেশের ডানপন্থি সরকারের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ, যেমন এল সালভাদরের কারাগারের নির্যাতন নিয়ে ট্রাম্প নীরব থাকলেও, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদকপাচার এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনের অভিযোগ তুলে কঠোর অবস্থান নিচ্ছেন।
ওবামা প্রশাসনের সাবেক পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক উপদেষ্টা এবং বর্তমান গ্লোবাল সিচুয়েশন রুম কনসালটেন্সির প্রধান ব্রেট ব্রুয়েন বলছেন, বিশ্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের প্রথাগত কিছু মূলনীতি উপেক্ষা করছেন ট্রাম্প। তার কারণে স্বৈরশাসকরা যা ইচ্ছা তাই করার সবুজ সংকেত পাচ্ছে।
চলতি সপ্তাহে এমবিএসের সফরে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত অংশীদারত্বে গুরুত্ব এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করেছেন ট্রাম্প। লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে মূলত তিনি সৌদি যুবরাজের বৈশ্বিক ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে সহায়তা করছেন।
বিশ্লেষকদের অভিযোগ, ট্রাম্প স্বার্থের কথা মাথায় রেখে কাউকে নরম সুরে আবার কাউকে শক্ত হাতে সামলাচ্ছেন। কারণ তিনি যেমন একদিকে তুরস্কের রজব তাইয়্যেব এরদোয়ান ও হাঙ্গেরির ভিক্টর ওরবানের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ উপেক্ষা করছেন, অন্যদিকে তিনি ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতি চাপ প্রয়োগ করছেন।
অবশ্য এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র অ্যানা কেলি বলছেন, মানবাধিকার নিয়ে কেউই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেয়ে বেশি আন্তরিক নন। তিনি মার্কিন স্বার্থের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নীতিতে (আমেরিকা ফার্স্ট পলিসি) নির্বাচিত হয়েছেন। প্রেসিডেন্টের সব পররাষ্ট্রনীতি ওই অঙ্গীকারের আলোকেই গৃহীত হচ্ছে।
অবশ্য ট্রাম্পের আগের অনেক প্রেসিডেন্টও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে হাত গুটিয়ে থাকার জন্য সমালোচনার শিকার হয়েছেন। যেমন, সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিরুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে নেতানিয়াহু সরকারকে পর্যাপ্ত চাপ প্রয়োগ না করার জন্য দায়ী করেন মানবাধিকার কর্মীরা।
আর একাধিক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা এবং বিশ্লেষক অভিযোগ করেছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে বছর না ঘুরতেই সে প্রবণতাকে নতুন স্তরে নিয়ে গেছেন ট্রাম্প।
সুলতানা দিনা/